নিস্তব্ধতা
... ঋষি
গুগুলে সার্চ মারলে সব পাওয়া যায় ,অথচ এমন কিছু ঘটে এই পৃথিবীতে তার কারণ গুগুল বাবাজি উত্তর দিতে পারে না। যেমন ধরুন আপনি গুগুলে সার্চ মেরে বারুদ তৈরির পদ্ধতি জানতে পারেন ,জানতে পারেন কি ভাবে মারণবোমা তৈরী হয় অথচ ভোলার বাবা প্রতিদিন রাতে তুমুল নেশা করে এসে ঠিক মিত্তির বাড়ির সামনে ছড়া বলে
.
" যেদিন যায় সেদিন ভালো
ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো "।
.
এর কারণ কি ? গুগল বাবাজি বলতে পারেন না। ভিতর দিয়ে তনয়ার বিধবা শ্বাশুড়ি কমলা মিত্তির চিৎকার করেন মরণ ,বুড়ো ঢ্যামনা রাত হলে রস জাগে। তারপর সদ্য একবছর বিয়ে হওয়া ছেলে প্রবীরের বউকে বলে দেখো তো ,যবে থেকে তোমাদের বিয়ে হয়েছে ,তবে থেকে ঢ্যামনাটা বাড়ির সামনে এসে কবিতা বলে। প্রবীর তার অফিসের কম্পিউটারে কাজ করতে করতে ভাবে সত্যি ভোলার বাবার এমন আচরণের কারণ যদি জানা যেত।
.
সময় কাটে মিত্তির বাড়ি পুরোনো হয় ,ঋতু বদলায় পল্টুর দোকানের সামনের কুকুরের বাচ্চাগুলো এখন সারা পাড়া জুড়ে রাতের বেলায় চিৎকার করে। ভোলার বাবা মারা গেছেন আজ এক বছর ,তবে লোকটা মরবার আগেরদিন অবধি মিত্তিরদের ভালোবেসে ছড়া শোনাতে ভোলেন নি। শাশুড়ি কমলা মিত্তির এখন প্রায় অসুস্থার কারণে বিছানায় থাকেন আর তনয়া এখন চিৎকার করে প্রবীরের প্রতি আমাকে কি কাজের ঝি পেয়েছো ,তোমার মার্ গুমুত কাঁচাবার জন্য আমাকে বিয়ে করেছিলে ,মুরোদ তো তোমার জানা আছে। প্রবীর মুখ বুজে অফিসের কাজের বাহানায় কম্পিউটারে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে আর ভাবে যদি গুগুল বাবাজি সত্যি কিছু উপায় বলতে পারেন।
.
তনয়া মিত্তির রূপে ,গুনে অধিকাংশ বাঙালি মহিলার থেকে সুন্দরী ,তার রূপ আর গুনের কাছে প্রবীর কিছু নয়। তুবু তনয়ার বাপের বাড়ির শিক্ষা তাকে প্রশ্ন করতে শেখায় নি ? শিখিয়েছে সহ্য করতে। তনয়া আজ প্রায় দশ বছর ধরে সহ্য করছে এই মিত্তিরের ফ্যামিলিকে।সদ্য কলেজ পাশ করে এই পৃথিবীতে তনয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল ,তার গানের গলা ভালো ,ভালো আবৃত্তি করতো সে কিন্তু তার সমস্ত স্বপ্ন চিতায় দিতে হয় তার পরিবারের ইচ্ছেতে তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। তবু তনয়া মেনে নিয়েছে ,এমনি প্রবীর ছেলে হিসেবে খারাপ না ,তবে মায়ের ন্যাওটা। তবুও তনয়া মানিয়ে নিয়েছিল ,কিন্তু বিয়ের সাত বছরের মাথায় তার স্বামীর সাথে চম্পা বলে কোনো মেয়ের সম্পর্কের কথা সে জানতে পারে। প্রথমে হজম করতে পারে নি কিন্তু ক্রমশ শাশুড়ির কাছ থেকে বারংবার বাজা,পাড়ার লোকেদের কাছ থেকে আরো অনেক বাজে উক্তি শুনতে শুনতে তনয়ার মাথাটাই বিগড়ে গেলো। আজকাল সে আর কাউকে এই মিত্তির ফ্যামিলির সহ্য করতে পারে না ,অল্পতেই রেগে যায়।
.
প্রবীরের বাবা মারা যায় ছোটবেলায় ,মায়ের কাছে মানুষ। ছোটবেলা থেকে অনেক কষ্ট করে তার মা তাকে পড়াশুনা করিয়েছে ,এর জন্য প্রবীরকেও কম কষ্ট করতে হয় নি। তারপর তার জীবনে হঠাৎ আলোর মতো তনয়ার প্রবেশ। প্রবীর জানে সে কোনো মতো তনয়ার যোগ্য নয়। বিয়ের প্রথম রাতে সে ভেবে পাচ্ছিল না কি ভাবে সে তনয়ার মতো সুন্দরী মেয়েকে স্পর্শ করবে। তার আগে কয়েকবার সে চম্পাকে স্পর্শ করেছিল কিন্তু সে কোনো মতেই তনয়ার যোগ্য নয়। চ্ম্পা পাশের পাড়ার রতন দার বৌ ,তার সমসাময়িক বয়স কিন্তু প্রবীরের জীবনের সে অন্যতম ভুল। প্রবীর বিয়ের পর চম্পার থেকে সরতে শুরু করেছিল কিন্তু চ্ম্পা সরতে দিতে চাই নি। প্রায় ব্ল্যাকমেল করে বাধ্য করেছে বিয়ের পরে বেশ কিছুবছর তার সাথে থাকতে। যা হওয়ার ছিল প্রবীরের তাই হয়েছে জীবনে ,তনয়া জানতে পেরেছে এবং প্রবীর তনয়াকে মিথ্যা বলতে পারে নি ,তার উপর এতো বছর বিয়ের পর তাদের কোনো সন্তান হয় নি। ডাক্তার রিপোর্টে পাওয়া গেছে প্রবীরের সমস্যা আছে।
আজকাল তো তনয়া মোটেও প্রবীরকে সহ্য করতে পারে না ,যখন তখন যা তা বলে তাকে অপমান করে। তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই আর পাশে থাকা টুকুও ফুরিয়ে গেছে।
.
প্রবীরের মা মারা গেছেন গত সপ্তাহে। বেশ কিছু দিন ধরে তনয়ার শরীর ভালো যাচ্ছে না ,হঠাৎ হঠাৎ বমি বমি পাচ্ছে। তনয়া আসতে চায় নি ,তবুও প্রবীর জোর করে তনয়াকে নিয়ে এসেছে তাদের ফ্যামিলি ডাক্তারের কাছে।মায়ের কাজ আর মনের চাপটা তো তনয়ার উপর দিয়ে কম যাচ্ছে না। সমস্ত ডাক্তারি পরীক্ষা করার পর ডাক্তার জানালেন তনয়া প্রেগনেন্ট। এটা শোনার তনয়া লক্ষ্য করলো পরই হঠাৎ করে সেই মুহূর্তে প্রবীরের মুখে একটা রাগ জন্মাল আর তারপরই কেমন একটা স্বাভাবিক ভাবেই প্রবীর তনয়াকে জড়িয়ে ধরলো।
.
এখন প্রায় মধ্যরাত, মিত্তির বাড়ির ভিতর থেকে শোনা যাচ্ছে একটা বাচ্চার কান্না।একই সময় মিত্তির বাইর সামনে দাঁড়িয়ে ভোলা প্রচন্ড মদ খেয়ে তার বাবার মতো চিৎকার করে ছড়া বলছে
" ভাবের ঘরে কাগের বাসা
ব্যাঙের ঘরে মানিক ,
যেদিন যায় সেদিন ভালো
ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো "।
মিত্তির বাড়ির ভিতর থেকে প্রবীর চিৎকার করছে মরতে পারিস না ভোলা ,প্রতিদিন আমার বাড়ির সামনে এসে কেন চিৎকার করিস ? তনয়া একমনে কম্পিউটারে গুগুল সার্চে ছেলের পেটে ব্যাথার কারণ খুঁজতে খুঁজতে বললো
মরণ ,তবু যদি তোমার মুরোদ থাকতো। প্রবীর ভাবছে সত্যি যদি গুগুলে সার্চ মেরে জানা যেতএই বাচ্চাটার জন্মের কারণ।
.
প্রবীর কোলে তুলে নিলো তার ছেলেকে ,আদর করে গালে চুমু খেয়ে বললো তনয়া একটু তাড়াতাড়ি দেখো না ,খুব কাঁদছে বাবু। প্রবীর বাইরে থেকে এইসময় পাড়ার কুকুরগুলো চিৎকারের শব্দ পায় ,তারপর হঠাৎ সময়টার মতো সেও মেনে নেয় নিস্তব্ধতা,ছেলেটা শান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে এখন।
No comments:
Post a Comment