সরি
.... ঋষি
অবিরত ঢেউ বুকের উপর ,ক্রমশ চোখ সময়ের গভীরে থাকা হিসেবনিকেশে আর বারংবার মরে ফেরায়।সমস্ত অধিকারের বাইরে কিছু অধিকার আজও অসামাজিক। বড় অস্থির লাগছে স্বর্ণপ্রিয়ার । জানলার বাইরে চায়ের দোকানে সে তাকিয়ে আছে অর্কপ্রভর দিকে যে অপেক্ষায় সানুর অফিসে বেড়োনোর । অর্কপ্রভ মানে আকু আর স্বর্ণপ্রভা সানু দুজনে ছোটবেলার বন্ধু। আকু সেই সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে তুলে নিয়েছে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব নিজের হাতে। আর সানু নরেশ ডাক্তারের মেয়ে এখন ডাক্তারি শেষে একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ,তাছাড়া তার নিজেরও একটা চেম্বার আছে শ্যামবাজারে।
.
আকু অনেক্ষন তাকিয়ে আছে নরেশ ডাক্তারের বাড়ির দিকে একবার সানুকে দেখবে বলে ,তার কারখানার দেরি হয়ে যাচ্ছে। একবার উঁকি মারলো বোধহয়। আকুর মনে আছে বাবার মারা যাবার পর আকুর মা তখন আকুকে নিয়ে প্রায় না খেয়ে রাস্তায়। প্রথম যেদিন মা আকুকে রমেশ জ্যেঠুর চায়ের দোকানে কাজে লাগালো খুব কেঁদেছিল ,বলেছিল আকু সকলের কপাল থাকে না রে পড়াশুনা ,আমি জানি তুই বড় হবি নিজের জোরে একদিন। আকু আজও বোঝে না বড় হওয়ার মানে ,সে কি এখনও বড় হয়েছে ? এই যে এতগুলো বছর সময় সুযোগ মতো সে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেছে নরেশ ডাক্তারের বাড়ির দিকে তাকিয়ে শুধুমাত্র একবার সানুকে দেখবে বলে ,এটা কি বড় হবার পরিচয়। কবেই তো সানু তাকে বলে দিয়েছে সেই ছোটবেলায় ,বাবা বলেছে কোনো চা ওয়ালার সাথে কথা বলতে না , মিশতে না। কিন্তু এতগুলো বছর আকু ছায়ার মতো সানুকে ফলো করেছে রাস্তায় ,স্কুলের সামনে ,কলেজের সামনে ,তার ডাক্তারি চেম্বারের সামনে কিসের জন্য ? সেই যখন সে স্কুলে পড়তো সেই সময় সানুর গলা জড়িয়ে বলা ,তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, সেই জন্য। সে জানেও না সানু জানে কিনা আকু বলে কেউ তাকে দেখতে চায় বারংবার। লোকের বাড়ি ঝিগিরি করে তার মা যে তাকে বড় করেছে ,সেই মায়ের কষ্ট ,চোখের তলায় কালি সব কেন জানি আকুর বড় অকারণ মনে হয় ,আকুর অভিমান হয় সেখান থেকে বিদ্রোহ সে পড়তে পারলো না ,আকু তার মায়ের দিকে ফিরেও তা তাকায় না আজকাল তার অন্যতম কারন হয়তো সানু।
.
সানু বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এখন বাসস্ট্যান্ডে,সে জানে আকু তাকে ফলো করছে ,প্রতিদিন করে। কিন্তু আকুর দিকে তাকালেই সে লুকিয়ে পরে ,সেদিন থেকে যেদিন থেকে বাবার বলায় আকুকে সে সেই কঠিন কথা গুলো বলেছিল । আজ এতগুলো বছর সানু ভেবেছে কেন সে বলেছিল এই কথা আকুকে?এই কারণে সে পুড়েছে হাজারো দিন ,হাজারো রাত নিজের ভিতর। মাঝে ভেবেছিল আকুকে ডেকে সরি বলবে ,বলতে পারে নি হয়তো সেদিনকার বাবার শেখানো সেই সামাজিক শিক্ষা সানুকে বলতে দেয় নি। শুনেছে সানু ,আকু এখন কোন চামড়ার ফ্যাক্টরীতে কাজ করে ,মায়ের সাথে পাশের পাড়ায় থাকে। সানু মাঝে মাঝে লুকিয়ে দেখে আকুকে স্যানগ্লাসের ভিতর দিয়ে ,বেশ হ্যান্ডসাম হয়েছে তার ছোটবেলার বন্ধু। কিন্তু আজও সানু জানে না কেন ছেলেটা তার পিছনে এমন ঘোরে ,কিছু কি বলার আছে তার ? এই কথা ভেবে সানু আজও জেগে থাকে বহুরাত সিলিঙের দিকে চেয়ে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সানু নিজের দিকে তাকিয়ে বেশ মুগ্ধ হয় ,সুন্দরী সে ,এই বয়স অবধি কম তো লাভ প্রপোস সে পেল না ,তবু আকু কেন জানি অদ্ভুত ভাবে ছেয়ে থাকে সানুর মনে।
.
আজ রবিবার তাই সানুর অফিস ছুটি ,এখন রাত্রি ,ও ঘরে বাবা খবর শুনছে। সানু চেয়ে আছে জানলার আড়ালে চায়ের দোকানের দিকে চেয়ে আজ সকাল থেকে সে আকুকে দেখে নি ,ভিতরে একটা ভাবনা হচ্ছে কি হল ছেলেটার ? কাজের লোক এসে ডাকলো দিদি নিচে পাড়ার কিছু ছেলে তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে। সানু ভাবলো চাঁদা ছাড়া কিছু না ,সামনে কালী পুজো। সে নেমে এলো সিঁড়ি বেয়ে ,মোট পাঁচটা ছেলে। একটা হোমড়া মতো ছেলে এগিয়ে বললো দিদি দয়া করে একবার চলুন অর্কপ্রভর মা বড়ো অসুস্থ। অর্কপ্রভ মানে আকু ?
.
সানু এখন অর্কপ্রভর ভাড়া বাড়িতে তার মায়ের সামনে। আকুর মা মারা গেছে। আকু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। স্বর্ণপ্রিয়া পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো ,কি রে মা তোর এতো অসুস্থ ছিল একবার বলতে পারলি না,একবার চেষ্টা করতে পারলাম। আকু একবার ফিরে তাকালো সানুর মুখের দিকে , কিন্তু কিছু বললো না,পিছন ফিরে কাঁদতে লাগলো । তবে সানু ঠিক বুঝে গেলো আকুর চোখের ভাষা , আকু বললো তোর সাথে কথাই তো বলতে চেয়েছিলাম সেই ছোটবেলা থেকে কিন্তু তুই বলতে দিলি কই ?
সানু জড়িয়ে ধরলো আকুকে পিছন থেকে ,মুখ দিয়ে তার বেড়োলো ,সরি !

No comments:
Post a Comment