আশ্রয়
... ঋষি
.
দুদিন পর ? ভালোই
তো কাটাচ্ছিস আমাকে ছাড়া। অনন্ত উত্তরে লিখলো ইনবক্সে হচ্ছে না রে ,কিছুতেই প্রিয়ার চোখের বাইরে যেতে
পারছি না ,তুই তো সব জানিস, কিন্তু তোকে বড় মিস করছি। পাওলি উত্তরে লিখলো ইনবক্সে জানি তো তোরা সব পুরুষগুলো একই ,তোরা বাড়িতে বউয়ের আঁচল ধরে থাকিস আর বাইরে আমার
মতো গার্লফ্রেন্ড রাখিস। তারপর আরও লিখলো তুই বল কি আছে আমাদের সম্পর্কে ? এই মাঝে
মাঝে পাঁচমিনিট ফোন কল ,একটু ইনবক্স ,দুমাস ,চারমাসে একবার কোনো হোটেলে শোয়া আর কি
আছে বল ?অনন্ত লিখলো পাওলিকে তোকে ভালোবাসি সঙ্গে একটা ইমজো হৃদয়ের আর তারপর লিখলো বাড়িতে বউ ,বাচ্চা একটা দায়িত্ব তো আছে, তুই কি
পারবি এখন তোর মেয়েকে,বরকে ছেড়ে আমার হাত ধরে
বেড়িয়ে আসতে ,পাওলি লিখলো তুই পারবি আগে সেটা বল ? অনন্ত লিখলো পারবো না যতদিন ছেলেটা
নিজের পায়ে দাঁড়ায় ,তারপর লিখলো সত্যি আমি তোকে ভালোবাসি ,কেন ভালোবাসি জানি না। আমার
মনে হয় প্রত্যেকের বাঁচার জন্য একটা আশ্রয় দরকার হয় ,দরকার হয় একটা আকাশ যেখানে নিজেকে
হাত পা ছড়িয়ে মুক্ত রাখা যায় ,যেখানে কোনো নাটক নেই ,যেখানে কোনো ভাবনা ছাড়া সব শেয়ার
করতে পারিস। আসলে কি জানিস আমরা সকলেই ভীষণ একা জন্ম থেকে ,শুধু সম্পর্কের মোড়কে আমরা
চিরকাল আশ্রয় খুঁজি ,যখন নিজের লোকের কাছে সেই আশ্রয় কম পরে ,তখন আমরা বাইরে ছুটি
,তুই আমার কাছে সেই আশ্রয় পাওলি। তোর সঙ্গে আমার কাটানো মুহূর্তগুলো ভেবে আমার একলা সময় কেটে যায় ,তোর মুখে হাসি থাকলে
,তোর মন ভালো থাকলে আমার দিনগুলো ভালো হয়ে যায়।
.
পাওলির সংসারে বর ,মেয়ে ,শ্বশুর সব আছে,ভরা সংসার বলতে পাওলির তাই। কিন্তু ওই যে অভাব ,যা আজকের প্রত্যেক মানুষের কাছে ভীষণ কমন। এখন প্রত্যেকটা মানুষের একটা আলাদা পৃথিবী আছে ,আছে ভালো লাগা ,খারাপ লাগা ,তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া এই হাতের মোবাইল।এই মোবাইলের ২জি ,৪জিতে ঢুকে হয়তো মানুষের পৃথিবীটা হাতের মুঠোয় ,কিন্তু মানুষগুলোকে আরো বেশি একা করে দিয়েছে। এখন প্রত্যেকটা পরিবার এই শহরে ঠিক যন্ত্রের মতো দিন কাটাচ্ছে ,নারী ,পুরুষ এমনকি ছোট ছোট শৈশবগুলো সকাল থেকে ইঁদুর ,বেড়ালের দৌড় দৌড়োচ্ছে ,দিনের শেষের ক্লান্তিতে ভুলে যাচ্ছে তারা শেয়ার করতে নিজেদের ,তার বদলে তারা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে কোনো মিডিয়াতে ডুবে যাছ্চে ,গান শুনছে ,সিনেমা দেখেছে কিন্তু ভুলে যাচ্ছে পাশের মানুষগুলোর কথা। বাইরের পৃথিবীতে মত্ত হয়ে প্রত্যেকেই ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে এক ছাদের তলায় ,এক বিছানায়। ক্রমশ নিজের কাছের মানুষ গুলো অপরিচিত হচ্ছে আর একসময় হয়ে বোধগম্য না হওয়ায় হয়ে যাচ্ছে অসহ্য। আসলে বর্তমান পৃথিবীতে সকলেই ভুগছে হ্যালুয়েশনে ,ক্রমশ সকলেই একলা থাকতে থাকতে চলে যাচ্ছে অন্য এক রুকথার পৃথিবীতে। আর সেই মুহূর্তে রূপকথার নায়ক ,নায়িকার মতো মানুষের জীবনে প্রবেশ করছে অন্য একজন অনেকটা স্বপ্নের চেহারা নিয়ে। বাস্তব পৃথিবীতে সেই বাইরের মানুষটা ক্রমশ হয়ে পড়ছে স্বপ্নে দেখা সেই মানুষটা যে হয়তো রূপকথতার প্রিন্সেস কিংবা প্রিন্স। পাওলির জীবনেই ঠিক একই রকম প্রবেশ অনন্তের । প্রথমে অনলাইন ফ্রেন্ড ,তারপর ফোন ফ্রেন্ড ,তারপর কখন যেন হৃদয় ,কখন শরীর ,কখন সমস্ত সত্বাটাও সে অনন্তকে দিয়ে দিয়েছে। অনন্তের একটা বিশাল ব্যাপার হলো সে খুব ভালো কথা বলতে পারে ,দিতে পারে সান্ত্বনা পাওলিকে প্রতিটা অভিমানে। পাওলি কখন যেন অনন্তকে ভালোবেসে ফেলেছে,কিন্তু আজকাল কেন জানি শনি ,রবি বার অনন্তের বাড়িতে বউয়ের সাথে কাটায় ,তাকে ফোন না করা তাকে কষ্ট দেয়,ইদানিং পাওলির আরেকটা সমস্যা হচ্ছে সে অনন্তকে অবিশ্বাস করছে কারণ তার মনে হয় অনন্তের তার বউয়ের সাথে সব সম্পর্কই আছে ,এমন কি শারীরিক ,অনন্ত তাকে মিথ্যে কথা বলে।
.
পাওলি ইনবক্স থেকে
চলে গেলো ,অনন্তের মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ঠিক এই সময় প্রিয়া ঘরে ঢুকে বললো কার সাথে
কথা বলছিলে ,তারপর বললো তোমাকে বললে তো মিথ্যে কথা বলবে ,বলবে অফিসের সেক্রেটারির ফোন ,তোমার কি
মনে হয় আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি আমি বুঝি না তোমার কেন আমার ব্যাপারে কোনো ইন্টারেস্ট নেই ,আমাকে ছুঁয়েও
দেখো না তুমি ,বাইরে থেকে সব পেয়ে যাও তাই না। অনন্ত বললো এক কাজ করো কাল থেকে তুমি
অফিস যেও ,উত্তরে প্রিয়া বললো এমন করে একসাথে
থাকার কি মানে ,কেউ যদি থাকে বোলো ,আমি তোমাকে মুক্তি দেব। প্রিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো
আর অনন্ত ডুবে গেলো গভীর ভাবনায় ,এক পাশে তার দায়িত্ব ,তার ছেলে আর অন্যপাশে ভালোবাসা।
আজকাল পাওলিরও কি জানি হয়েছে ,হঠাৎ হঠাৎ এমন আঘাত করে ,পাওলি কি বোঝে না অনন্ত তাকে
কত ভালোবাসে। প্রায় দেড়মাস হয়ে গেলো পাওলির সাথে দেখা হছ্চে না ,এইবার একবার দেখা করতে
হবে পাওলির সাথে। অনন্ত ঘর থেকে চিৎকার করে বললো প্রিয়াকে অফিস বেড়োতে হবে ভাত দেও।
.
আজ অনন্তের সাথে পাওলির দেখা করার দিন। প্রতিবারের
মতো অনন্ত আগে থেকে গেস্টরুম বুক করে অপেক্ষা করছে পাওলির জন্য। অনন্ত ভাবছে আজকে পাওলিকে অনেক আদর করবে সে ,তাকে বোঝানো খুব দরকার
অনন্ত কতটা ভালোবাসে পাওলিকে।এই সময় গেস্টরুমের
ফোনটা বাজলো ,রিসেপশন থেকে বললো একজন মহিলা
তার সাথে দেখা করতে চায় ,অনন্ত বললো পাঠিয়ে দেও।অনন্ত প্রবল আগ্রহে রুমের দরজাটা খুললো ,চমকে উঠলো তার
সামনে প্রিয়া। প্রিয়া এক ঝটকায় তাকে ঠেলে ঘরে ঢুকলো ,তারপর বাথরুম বারান্দা ঘুরে এসে
বললো , কই সে ,কোথায় তোমার মধুভান্ড ? অনেকদিন ধরে তোমার ফোনের ইনবক্স ফলো করে আজ ধরেছি
,আজ একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বো ,কোথায় সে
? অনন্ত বুঝতে পারছিল না কি বলবে ,সেই সময় রুমের ফোনটা আবার বাজলো ,প্রিয়া ফোন তুলে নিলো এক ঝটকায় ,আসতে বলে তাকে , নিজে দরজা খুলে দিল ,পাওলি ঢুকলো। আজ পাওলি অনন্তের পছন্দের নীল শাড়ি পরে এসেছে ,খুব সুন্দর লাগছে পাওলিকে।
প্রিয়া প্রথম কথা বললো আচ্ছা এই সে ,এর জন্য তুমি আমার সাজানো সংসারটা নষ্ট করছো বলে
ঝাঁপিয়ে পড়লো পাওলির উপর।
.
অনন্ত আজ অবধি জীবনে এমন অবস্থায় পরে নি ,সে দুজনকে আলাদা করার চেষ্টা করছিল ,আর চিৎকার করে দুজনকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ সে প্রবল জোরে দুজন মহিলাকে দুদিকে ছুঁড়ে দিল ,তারপর বললো আমি দোষী প্রিয়া তোমার।তারপর বললো প্রিয়া তুমি নিজের দিকে তাকিয়ে বলো আমি কোথায় দাঁড়িয়ে ? তুমি বলো আমার পুরুষত্ব শেষ ,তোমাকে আমি খুশি করতে পারি না কিন্তু সত্যিটা হলো তোমাকে আমার ছুঁতে ইচ্ছে করে ,শুধু বাবুটার জন্য আমি তোমার প্রতি দায়িত্ব পালন করছি। তুমি বলো প্রিয়া আজ অবধি আমি আমার দায়িত্বে কোন কমতি রেখেছি ,তোমার উপর অত্যাচার করেছি। তারপর সে পাওলির দিকে তাকিয়ে বললো তুমি আমার জীবনে ভীষণ স্পেশাল কিন্তু তুমি কখনো আমাকে বোঝার চেষ্টা করলে কেন আমি তোমার কাছে। শুধু কি এই শরীর ,শুধু কি এই কিছুক্ষন তোমাকে ছোঁয়ার জন্য? আমি বিশ্বাস করি মানুষের একটা ভালো বন্ধু ,একটা আশ্রয়ের ভীষণ দরকার বাঁচার জন্য কিন্তু তুমিও আমাকে অবিশ্বাস করো। এই সময় প্রিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিল ,অনন্ত তাকে থামিয়ে বললো হ্যা আমি এমনি ,তুমি আমাকে বদচরিত্র বলতে পারো ,আমাকে ডিভোর্স করতে পারো ,চলে যেতে পারো আমাকে ছেড়ে ছেলেকে নিয়ে কিন্তু একটা কথা জেনে রাখো আমাকে দোষ দেবার আগে নিজের দিকে তাকাও একবার , মনে করো আমার প্রতি তোমার রোজকার ব্যবহারগুলো। আসলে সত্যি কি জানো মানুষের বাঁচতে চাওয়াটা অপরাধ নয় ,মানুষের সমাজ ,মানুষের ভাবনা মানুষকে বেঁধে রাখে গন্ডির মধ্যে। তাই এই সময়ের কাছে মানুষের ভাবনার কোনো দাম নেই,দাম নেই ভালোবাসার, তাই সব মানুষগুলো এই শহরে আমাদের মতো একলা এই সময়।তুমি বা পাওলি কতটা আমাকে ভালোবাসো সেটা আমি জানি না ,কিন্তু তোমাদের আমাকে প্রয়োজন আর আমার তোমাদের কাছে প্রয়োজন শুধু আশ্রয়ের।
No comments:
Post a Comment