বেজন্মা !
.......ঋষি
ফিরে আসা সময় থেকে সাদা পাতায় জীবন অবিরত ক্ষয় ছাড়া কিছু নয়। সময় হয়তো মানুষের দরজায় দাঁড়িয়ে একটার পর একটা দরজা বন্ধ করে, হয়তো কিছু খোলে। পবিত্র অন্ধকার বিছানায় ভাবছিল এই কথা। মানুষের সমুদ্রে পবিত্র নামক ছেলেটা ভাসতে থাকা একটা ডিঙি নৌকো ,সাধারণ মানুষের যেমন হয়। খুব কমন একটা বাঁচা স্বামী ,স্ত্রী আর সাথে ছ বছরের ছেলে। জীবন হয়তো সুখের হতে পারতো কিন্তু হয় নি ,পবিত্র ভয় পাই নি বারংবার লড়ে গেছে জীবনের সাথে।
.
সে তো আজ থেকে লড়ছে না ,সেই ছোটবেলা থেকে। মায়ের মুখ তার মনে পরে না ,বোঝার বয়স হওয়ার পর সে বুঝেছে যাকে সে তার বাবা মা বলে চেনে তারা আসলে তাকে পালন করেছে ,দত্তক নিয়েছিল তাকে কোন অনাথ আশ্রম থেকে। তার সেই বাবা ,মাও আর নেই তবে সে কৃতজ্ঞ তাদের কাছে কারণ সে একটা পরিচয় তো পেয়েছে। পবিত্র নিজে একটা বেসরকারি অফিসে কাজ করে ,যা পায় তাতে সে, অমৃতা আর ছ বছরের বুবুন ভালো ভাবে চলে যায় ,মাথার উপর দত্তক ছাদও আছে ,সুতরাং মোটের উপর পবিত্রের তো ভালো থাকার কথা ছিল।
.
পবিত্র ভাবছিল সে কেন ভালো নেই ? কারণ কি অমৃতা। অমৃতা বাবা মায়ের এক সন্তান ,অবস্থা তেমন ভালো ছিল না ওদের ,পবিত্র তাকে পড়াতো ক্লাস টুয়েলভ থেকে ,তারপর হঠাৎ প্রেম তারপর বিয়ে। বিয়ের আগের অমৃতা আর আজকের অমৃতার ভিতর ভীষণ তফাৎ। বিয়ের একমাস পরে প্রথম যেদিন অমৃতার সাথে সাংসারিক ঝগড়ায় অমৃতা যেদিন তাকে বেজন্মা বলে গালাগাল দেয় ,পবিত্র ভেঙে পড়েছিল কিন্তু আজ বিয়ের ষোলো বছর পর অভ্যাস হয়ে গেছে এই কথা শুনতে শুনতে। প্রথম প্রথম সে প্রতিবাদ করতো বলতো তুমি তো সব জানতে, তোমার বাবা ,মাও জানতো তবে কেন বিয়ে করলে আমায় ? এখন আর কিছু বলে না শুধু বেজন্মা শব্দটা শুনলে সে স্তব্ধ হয়ে যায়। অমৃতা প্রায়ই সুযোগ সময় বুঝে তাকে বিভিন্ন কারণে আঘাত করে,প্রায়ই কথা বন্ধ থাকে তাদের আর শারীরিক ভাবে কেউ একে অপরকে আকৃষ্ট করে না আর। অমৃতার মনে হয় সে ভীষণ অসুখী ,পবিত্রকে বিয়ে করে তার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে,সুতরাং এক ছাদের তলায় থেকে তারা দুইগ্রহে বাস করা ভিন্ন মানুষ। ওদের দুজনের চাওয়া পাওয়া গুলো আলাদা সম্পর্ণ ,পবিত্র বই পড়তে ভালোবাসে ,ভালোবাসে ভালো গান শুনতে ,ঘুরতে আর অমৃতার কাছে এগুলো আদিখ্যেতা ছাড়া কিছু নয়। আজকে বোধহয় তাদের এই সম্পর্কটা টিকে থাকার অন্যতম কারণ বোধহয় বুবুন আর কিছুটা পবিত্র ,পবিত্র কিছুতেই বুবুনকে আরেকটা পবিত্র তৈরী হতে দেবে না। .
.
সময় দরজা বন্ধ করে কিছু দরজা খোলে অবশ্য ,পবিত্রের জীবনে একটা ফ্যান্টাসি আছে ,আছে একটা গোপন প্রেম সুমনা। সুমনার সাথে পরিচয় সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ,প্রথমে ফোন নম্বর আদানপ্রদান তারপর হঠাৎ ভালো লাগা ,কাছে আসা। সুমনা বিবাহিত তার এক ছেলে আছে ,স্বামী তার ভালো না ,কোথাও বাইরে একটা সম্পর্ক আছে কারো সাথে। সুমনা একটু জেদি ,সে কাঁদে নি এই নিয়ে কোনোদিন পবিত্রর কাছে ,শুধু তাকে ভালবাসে নিঃস্বার্থ। আজকের দুনিয়া যেখানে কারণ ছাড়া কিছু হয় না সেখানে সুমনা অদ্ভুত একটা মেয়ে। তাদের এই পাঁচ বছরের সম্পর্কটা পৃথিবীর কাছে
বেআইনি হলেও ,নিজেদের কাছে বাঁচার নিশ্বাস। দুজনেই বেঁচে আছে কারণ
তাদের সন্তান আর দুজনেই নিজেদের দায়িত্বের প্রতি তারা একনিষ্ট। বেশ কাটছিল জীবন পবিত্রের একদিকে দায়িত্ব অন্যদিকে সুমনা। হয়তো দু মাসে তাদের একবার দেখা হয় ,কথা হয় প্রতিদিন ,কিন্তু বেশ কাটছিল জীবন তাদের । আসলে পৃথিবীতে বায়ুশূন্য বলে কিছু নেই ,সেখানে মানুষের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একইরকম।
.
এর মধ্যে এক ঘটনা ঘটলো যা পবিত্রর জীবনটা হঠাৎ দুমড়েমুচড়ে ভেঙে দিল। আজ দু মাস সে বাড়িতেই আছে ,চাকরিটাও গেছে কারণ তার একটা পা কাটা গেছে বাইক একসিডেন্টে,ডাক্তার আরো দুমাস তাকে ঘরে থাকতে বলেছে। আজকাল আর সুমনার সাথে বিশেষ তার কথা হয় না ,আসলে অমৃতা সবসময় কান পেতে থাকে। সুমনা বোঝে ব্যাপারটা কিন্তু সেও কষ্ট পায়। এখন অমৃতার কথা বলার ধরণ পবিত্র অসহ্য লাগে ,কথায় কথায় এমন একটা ব্যাপার করে তাকে বোঝায় যে সে অকর্মন্য আর তার জীবনটা নষ্ট হলো ,কারণ অকারণে তাকে বুঝিয়ে দেয় সো বেজন্মা।
পবিত্রর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে ,মনে হয় মৃত্যু ভালো এর থেকে তবুও নিজেকে বোঝায় বুবুন আর সুমনার কথা ভেবে।
.
আজ সকালে অমৃতা যখন বাথরুমে সুমনার সাথে কথা হলো। খবরটা পেয়ে সে চমকে উঠো সুমনা প্রেগনেন্ট। পবিত্র জানে এটা তার অসর্কতার কারণে ,কি করবে সে। সারাদিন ভেবেছে ,ভেবেছে সুমনার মুখ ,সুমনার কান্নার শব্দ। সে চাই তাদের এই ভালোবাসার সন্তান পৃথিবীর মুখ দেখুক , কিন্তু কিভাবে ? কিভাবে এই সমাজে তাদের এই সন্তানের পরিচয় দেবে ? পবিত্রর মাথা ভার হয়ে আসছে ,খিদে তেষ্টা কিছু নেই তার। এখন সে সারারাত জেগে আসছে বিছানায় ,পাশে তার বিয়ে করা স্ত্রী অমৃতা ,বুবুন ঘুমিয়ে। কি করবে সে ? আজকে যেন পবিত্রর অন্ধকারটা আরও গভীর মনে হচ্ছে ,অন্ধকার চেয়ে থাকা চোখে সে স্বপ্ন দেখেছে সুমনা আর সন্তানের।
.
ঘুমটা ভাঙলো তার রাতজাগা বিরক্তি নিয়ে অমৃতার ডাকে। অমৃতা বলছে এই যে লাটের বাট উঠুন এবার ,আপনার আর কি বিছানা তুলতে হবে ,বাজার যেতে হবে ,রান্না করতে হবে ,অনেক কাজ বাকি ,আপনার মতো চিতিয়ে থাকলে জীবন কাটবে না। সেই মুহূর্তে পবিত্রর একটা চড় মারতে ইচ্ছে করছিল অমৃতাকে ,তার পয়সায় খেয়ে ,তার পয়সায় বেঁচে এতো সাহস কিন্তু কিছু করলো না সে। জানলার দিকে তাকিয়ে তার সুমনার কথা মনে হলো ,কি করছে সুমনা ? কাঁদছে ? পবিত্র অপেক্ষা করছিল কখন অমৃতা বাজার যাবে।
.
অমৃতা বাইরে তালা বন্ধ করা মাত্র পবিত্র ফোন করলো সুমনাকে। হ্যালো ,হ্যালো ! সুমনা হাসছে ,বললো গতকাল সে এবোসান করছে আর কোনো চিন্তা নেই তাদের। বললো এই বাচ্চা নাকি নষ্ট করারি ছিল ,না হলে একটা বেজন্মার জন্ম হতো, সোনা তুমি পরের বার থেকে কন্ডোম ব্যবহার করো। পবিত্রর হাত থেকে মোবাইলটা খসে পড়লো ,চোখ থেকে ঝরলো দু এক ফোঁটা জল ,সে উচ্চারণ করলো বেজন্মা !

No comments:
Post a Comment