মধ্যবিত্ত পুরুষ
... ঋষি
মিথ্যে বলতে পারি না ,সত্যি বলতে যে সহ্য ক্ষমতা দরকার তাও আমার নেই। সাধারণ মধ্যবিত্ত কোনো ভীরু বাঙালির কাছ থেকে তুমি কি আশা করো ? যে লোকটার বাড়িতে স্ত্রী ,বাচ্চা ,কর্মক্ষত্র মানে যুদ্ধ তার কাছ থেকে তুমি কি পেতে পারো ? যাকে মাসের শেষ কটা দিন সংসার চলবে কি করে ভাবতে হয় ,যাকে মাসের শুরুতে ই এম আই ,সন্তানের স্কুলের ফ্রী ,স্ত্রীর কোলেস্টোরলের ওষুধ এই সব ভাবতে হয় ,তুমি কি মনে করো সে খুব সুখী ? আসলে সাধারণ মধ্যবিত্তের কাছে সুখ মানে একটা করে দিন কেটে যাওয়া কিংবা কাটানো আর দুঃখ মানে আকাশের চাঁদ ভাবা যেমন বৌকে জন্মদিনে একটা সোনার হার ,সন্তানকে ইংরেজি স্কুলে পড়ানো,মার্ হাতে মাসের শেষে মাইনে পেয়ে হাতখরচ দেওয়া ,সবাই মিলে একটু সিঙ্গাপুর ঘুরে আসা। সকলে সংসারে হাসছে ,সকলে ভালো আছে এটাই আসলে সাধারণ মধ্যবিত্ত পুরুষের স্বপ্ন ,কিন্তু তুমি লক্ষ্য করো এই স্বপ্নগুলোর মধ্যে কোথাও কিন্তু আমি নেই ,শুধু আমরা। তবুও যেন রোজ দিনের শেষে বৌয়ের কাছে শুনতে হয় তোমাকে বিয়ে করার থেকে মরে যাওয়া ভালো ছিল ,সন্তানের কাছে শুনতে হয় তুমি ওই সাইকেলটা আনলে না ,প্রমিস করেছিলে আমায় ,আমার বন্ধু সায়ন্তনের বাবা তাকে ওই সাইকেলটা কিনে দিয়েছে ,মার্ কাছে শুনতে হয় যে সন্তান নিজের মায়ের কথা ভাবে না ,বৌয়ে ইশারায় নাচে সে মোটেও ভালো নয়।
এখন তুমি বোলো তমালি ,আমি ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে। আসলে সাধারণ মধ্যবিত্ত পুরুষ কোথাও দাঁড়িয়ে থাকে না শুধু ফুটবলের মতো সংসারের সকলের পায়ে পায়ে ঘুরতে থাকে।
আজ রবিবার ,আমি বাড়িতে তমালি ,সকালে স্ত্রীর চিৎকারে ঘুম ভাঙলো ,স্ত্রী বলছে অন্যদিন ঢ্যাং ঢ্যাং করে অফিসের নাম করে সকালে বেরিয়ে যায় ,সারাদিন টিকিটাও পাওয়া যায় না ,আজ ছুটি শুধু কুম্ভকর্মের মতো ঘুমোবে ,আমার ঘরে খাটতে খাটতে হাড় ক্ষয়ে যাচ্ছে ,এবার কি দোকান ,সদাই সব কি আমাকে করতে হবে। তুমি বলো তমালি সারা সপ্তাহের খাটনির পর ছুটির দিন একটু বেলা অবধি ঘুমোনোটা কি অন্যায়। ভালো করে বললেই তো হয় আমাকে, যার যা সামর্থ মানুষ তো তাই খায় ,আমি বাজার থেকে কতগুলো জ্যান্ত ট্যাংরা নিয়ে এলাম ,স্ত্রী দেখে বললো আবার সেই এক মাছ ,নিজে ভালোবাসে তাই নিয়ে আসে, মা বললো ছোট মাছ আমার রোচে না খোকা ,তুমি বোলো তমালি আমি কি করবো ? কি করে বোঝাবো এই বাজারে এক কেজি ভালো কাতলা মাছ প্রিয় সাড়ে চারশো টাকা আর আমার সারা সপ্তাহের সবজি আর মাছের বাজেট আটশো টাকা। কি করবো বলো তমালি ,মধ্যবিত্ত একজন পুরুষ তাকে বাজেট করে মাইনের টাকায় সংসার চালাতে হয়। বাচ্চার ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে ,পরিবারের সুরক্ষার জন্য মেডিক্লেম করতে হ ,তারপর ওষুধ ,আত্মীয়ের অনুষ্ঠানের গিফট এই সব করতে তো একজন মধ্যবিত্ত পুরুষকে বাজেট করেই চলতে হয়। জানো তমালি মাঝে মাঝে আমার এই বাজেটটা দেওয়ালে প্লাস্টার করার মতো মনে হয় ,একদিকে প্লাস্টার করে ঢাকলে অন্য দিকটা খসে যায় আবার সেদিকটা ঢাকলে আগের জায়গা খসে যায়।
সপ্তাহের অন্যদিন সকাল থেকে দাঁড়ি কেটে অফিসে দৌড়োতে হয় ,
একটু লেট্ করলে মাইনে কাটা যায় ,অফিসের বস কিছুতেই বুঝতে চায় না এই শহরের বাস ট্রামের গ্যাঁড়াকল ,তারপর ফোন ,খাতার জাবেদা ,চারটেয় লাঞ্চ ,আটটায় ছুটির পর নিয়মিত বাড়ি ফেরা। বাড়ি ফিরতে ফিরতে যদি কোনোদিন কোনো বন্ধুর সাথে একটু আড্ডা মেরে যদি বাড়ি ফিরি স্ত্রী বলে
ভালোই ফুর্তি করে এলে বোলো ,আমি সারাদিন ঘরে নাড়ি কুঁপেছি ,ভালোই আছে। রাত্রেও ঘুম থাকে না বুঝলে তমালি আগামী দিনের অফিসের কাজ ,বৌয়ের অনাবশ্যক সাংসারিক ঝামেলা ,তাকে কে কি বোল্লো ,আমার মা কি করলো এই সব শুনে আর ভেবে। তারপর তুমিও কি বলবে তমালি আমি ভালো আছি।
তমালি খুব হাসছে ,আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে সব ঠিক হয়ে যাবে সোনা ,একটু সবুর করো। সত্যি বলতে কি সব ঠিক হয়ে যাবে এই কথাটা মধ্যবিত্ত সংসারে প্রতিটা বিপদে ,প্রতিটা মনখারাপের দিনে সান্তনার নামে কেউ না কেউ বলে থাকে। আমি বললাম তমালি আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না ,তমালি গালে একটা চুমু খেয়ে বললো আমি আছি তো। আমি অভিমানে বললাম কোথায় তুমি ,আমি তো তোমাকে আমার কষ্টের দিনে পাশে পাই না ,আমার যখন মনখারাপ তখন পাই না শুধু স্বপ্নে তুমি আসো। তমালি হাসলো বললো মধ্যবিত্ত পুরুষের স্বপ্ন ছাড়া আর আছে কি ? আমি যদি সত্যি থাকতাম তুমি পারতে আমার হাত ধরতে ,আমার পাশে দাঁড়াতে,তোমার স্ত্রী ছাড়া আমাকেও আগলে রাখতে ? ভালো করে ভেবে দেখো মধ্যবিত্ত পুরুষ তুমি তোমার স্ত্রীর নামে এতো বদনাম করলে ,পারতে তুমি আমাকে বুঝতে নিজের করে ,পারতে সহ্য করতে ? কি হলো ভয় পেলে ? মধ্যবিত্ত জাতটা চিরকাল স্বার্থপর ,ভীতু ,মাথা নিচু করে কেঁচোর মতো বাঁচা একটা ঘ্যানঘ্যানে জাত।
আমি বললাম তুমি তমালি বলে দিলে আসল সত্যিগুলো। ঘুম ভেঙে গেলো সেই মুহূর্তে আমার ,আর হুড়মুড় করে চোখ ফেটে জল বেড়িয়ে এলো ,পাশে আমার ঘুমন্ত স্ত্রী আর সন্তান। মুখ বুজে কাঁদতে হলো পাচ্ছে আমার স্ত্রীর ঘুম না ভাঙে।

No comments:
Post a Comment