Tuesday, June 16, 2020

সমাপ্তি


সমাপ্তি 
.... ঋষি 
.
কিছু ভালো লাগছে না , বহুদিন কোনো কবিতা ,ছোটোগল্প ,উপন্যাস লিখতে ইচ্ছে করছে না অপর্ণার । অপর্ণা সরকার আজকের সাহিত্যের বাজারে বেশ পরিচিত সাহিত্যিক। অপর্ণার বেশ কয়েকটা গল্প আধ খাওয়া হয়ে পরে আছে ,চারটে পত্রিকা লেখা চাইছে ,কিছুই লেখা হছ্চে না, ইচ্ছে করছে না অপর্ণার কিছুই। অপর্ণা কোনো এক সাহিত্যসভায় বলেছিল  ঈশ্বর সৃষ্টি করতে হলে নিজেকে ঈশ্বর করতে হয় ,কিন্তু বেশ কিছুদিন সে সৃষ্টির ঈশ্বর তাকে ছেড়ে চলে গেছে। সারাদিন অপর্ণা বিছানায় শুয়ে  দিন কাটাচ্ছে ,কারোর ফোন ধরতেও ইচ্ছে করছে না তার। পরশু মায়ের ফোন এসেছিল কেমন আছিস প্রশ্নের উত্তরে ,অদ্ভুত ভাবে অপর্ণা উত্তর দিয়েছিল বেঁচে আছি। মা প্রশ্ন করেছিল কি হয়েছে তোর ? স্নিগ্ধের সাথে ঝগড়া করেছিস ?অপর্ণা খুব কঠিন গলায় উত্তর দিয়েছিল মাকে ,এই সব ঝগড়া টগড়া করার আমার সময় নেই ,আমরা ঠিক আছি বলে ফোন রেখে দিয়েছিল সে।  স্নিগ্ধ অপর্ণার স্বামী ,বড়ো একটা সংবাদমাধ্যমের নিউজ এডিটর। মাসের বেশিরভাগ সময় স্নিগ্ধকে কাজের সূত্রে শহরের বাইরে থাকতে হয় ,এই একাকিত্ব থেকেই অপর্ণার সাহিত্যের জগতে প্রবেশ। স্নিগ্ধ যখন বিয়ের পর পর বাইরে যেত অপর্ণার কষ্ট হতো এতো বড়ো বাড়িতে ,তারা সন্তানের চেষ্টা করেছিল কিন্তু সম্ভব ছিল না কারণ অপর্ণার ধারণ ক্ষমতা নেই। অপর্ণা খুব কাঁদতো স্নিগ্ধকে জড়িয়ে ,স্নিগ্ধ তখন তাকে বলেছিল তোমার ভাষার উপর এত দখল ,তুমি লেখো না।অপর্ণার প্রথম লেখা স্বপ্নের বাড়ি গল্পটা স্নিগ্ধই ছাপিয়ে দিয়েছিল তাদের পত্রিকায়। তারপর ধীরে ধীরে তার সাহিত্য জগতে প্রবেশ এবং এই নাম ডাক।     
.
                                                     অপর্ণা আজ জোর করে পড়ার টেবিলে গল্প লিখতে বসেছে।সামনে সাদা পাতায় সে কি লিখবে তাই ভাবছে।  বাইরে বৃষ্টি পড়ছে ,তার বারো  তলার ফ্ল্যাটের জানলা থেকে এই মুহূর্তে শহরটা কেমন জানি রূপকথার মতো মনে হলো তার। সে লিখতে শুরু করলো প্রথমে একটা বৃষ্টির পটভূমি ,তারপর গালে হাত দিয়ে চুপ করে ভাবছিল গল্পের চরিত্রদের কথা।  কি নাম দেবে সে চরিত্রর  ? মানুষের চরিত্র জিনিসটা এই সমাজে একটু অদ্ভুত ,আসলে একটা মানুষকে বাইরে দিয়ে যেমন দেখতে কিংবা তার হাঁটা ,চলা ,কথা বলা সব মানুষের চরিত্র নির্ধারণ করে। চরিত্র জিনিসটা নির্ভর করে সময়ের উপর অর্থাৎ মানুষটা কোন সময়ে বাস করছে তার উপর। যেমন ধরুন যে লোকটা মশা মারে না সে একটা খুন করে খুনি হয়ে গেলো ,যেমন ধরুন যে মেয়েটা রাতে বেশ্যাগিরি করে পয়সা ইনকাম করে সেই আবার বাড়িতে গুছিয়ে মেয়েকে খাওয়াতে খাওয়াতে বলে তোকে অনেক বড়ো হতে হবে কিংবা ডাক্তার হতে হবে। অপর্ণা ক্রমশ লিখছে ভরে  উঠছে তার সাদা পাতা ,বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে।  
.
                        এখন রাত আটটা স্নিগ্ধ পলিকে নামিয়ে এইমাত্র বাড়ির দিকে গাড়িটা ঘোরালো। বাইরে বৃষ্টি খুব ,স্নিগ্ধ খুব আস্তে ড্রাইভ করছে। বৃষ্টি হলেই স্নিগ্ধের মনখারাপ হয় ,কিন্তু কেন  ? স্নিগ্ধের জীবনে কিসের অভাব  ? যথেষ্ট  ইনকাম করে সে ,যে চাকরিটা সে করে তাতে তার নাম  ,যশ সব আছে। বাড়িতে সুন্দরী বউ অপর্ণা ,যার খ্যাতিও কম না। কিসের অভাব তার  ? কিজন্য সে দুচার সপ্তাহ পর পর তার সেক্রেটারি পলিকে নিয়ে হোটেলে ওঠে ,শুধু শরীরের সুখ নাকি পুরুষ মানুষের একধরনের আডভেঞ্চার ,নাকি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজেকে পুরুষ প্রমান করার তাগিদ। স্নিগ্ধের পিছনের জীবনে একটা লুকোনো গল্প আছে যেটা সে কাউকে বলতে পারে নি এমনকি অপর্ণাকেও না। 
.
আজ অপর্ণার খুব আনন্দের দিন ,অপর্ণার একটা লেখার উপর ভিত্তি করে আজ একটা সিনেমা রিলিজ হবে এই শহরে। ডিরেক্টর ভদ্রলোক অপর্ণাকে আর তার স্বামীকে আমন্ত্রিত করছেন ছবির প্রোমোশনের জন্য। স্নিগ্ধও খুব খুশি হয়েছে ,সে আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছে দুটো মিটিং ক্যানসেল করে। যথা সময় স্নিগ্ধ অপর্ণাকে নিয়ে শহরের এক নামকরা অরডিটোরিয়ামে উপস্থিত হয়েছে।বেশ  আপ্যায়ন চলছে তাদের ,চলচিত্রের যিনি ডিরেক্টর তিনি  নিউজ চ্যানেলের বাইটে বলছেন এই সিনামে এই সময়ের অন্যতম বিতর্কিত সিনেমা হতে পারে ,তিনি এর জন্য বারংবার মিসেস অপর্ণা সরকারকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন। 
.
                                     সিনেমা শেষ হয়েছে ,অপর্ণা তার ইন্টাভিউতে টিভি সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বললো ,আসলে এই গল্পটা একটা মানুষের জীবনের গল্প ,যে একসাথে দুটো চরিত্রে অভিনয় করছে ,চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে multi character disorder বলে। ইন্টারভিউ দিতে দিতে অপর্ণা দেখলো তার স্বামী স্নিগ্ধ তাকে ছাড়াই গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে গেলো। 
.
      স্নিগ্ধ  ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজাটা খুললো ,সে আজ প্রচুর নেশা করেছে। ঘরে ঢুকে সে দেখলো অপর্ণা  বসে আছে সোফায় শান্ত হয়ে ,উল্টো দিকে জানলার দিকের সোফায় স্নিগ্ধ বসলো। স্নিগ্ধই প্রথম প্রশ্ন করলো অপর্ণাকে ,তবে তুমি সব জানতে  ? অপর্ণা হাসলো উঠে গিয়ে নিয়ে এলো ডাক্তারের নকল রিপোর্টটা যাতে লেখা আছে অপর্ণা বাচ্চা ধারণ করতে অক্ষম ,তারপর ছুঁড়ে দিল তার দিকে আসল রিপোর্টটা ,তারপর বললো কি দরকার ছিল আমাকে মিথ্যে বলার স্নিগ্ধ। তারপর অপর্ণা এগিয়ে দিলো একটা ওয়াটসআপ ভিডিও স্নিগ্ধের দিকে যেটা বেশ কিছুদিন আগে অপর্ণা পায়। স্নিগ্ধ বললো পলি আমাকে ব্ল্যাকমেল করছে ,তাই তোমাকে পাঠানো। অপর্ণা বললো ভিডিওটা তো মিথ্যে নয় ,তুমি কেন আমাকে বিয়ে করলে ? অপর্ণা আলমারি খুলে ডিভোর্স পেপারটা ছুড়ে দিল স্নিগ্ধের দিকে ,সে বললো কালকে আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।
.
  স্নিগ্ধ এখন সেই ভিডিওর দিকে তাকিয়ে। ভিডিওতে দেখা মেয়েটা যে লিপস্টিক পরে ,শাড়ি পরে অন্য একটা মেয়েকে আষ্টে পিষ্টে জড়াচ্ছে  সেই হলো স্নিগ্ধ ,আজ থেকে না ছোটবেলা থেকে ওর মধ্যে দুটো মানুষ বাস করে একজন পুরুষ   ,একজন নারী । স্নিগ্ধ  যখন অপর্ণার সাথে থাকে তখন সে একটা পুরুষ  আর সে যখন হোটেলে পলিকে নিয়ে যায় ,হোটেল রুমে সে একজন নারী। স্নিগ্ধ পলির কাছে এমন এক নারী  যে কোন এক নারী শরীরকে  ভালোবাসে ,ভালো তো বাসে  সে অপর্ণাকেও পুরুষের মতো । কিন্তু কি এখন কি করবে স্নিগ্ধ  ?      
.

                         অপর্ণা ওই ঘর থেকে একটা ধুপ করে বিকট শব্দ শুনতে পেলো ,ছুটে এলো সে ড্রয়িংরুমে যেখানে স্নিগ্ধ বসে ছিল। অপর্ণার বুকটা কেঁপে উঠলো ছুটে গেলো সে ড্রয়িংরুম লাগোয়া বারান্দার দিকে, নিচে তাকিয়ে দেখলো রক্তে ভেসে যাচ্ছে স্নিগ্ধের শরীর। অপর্ণা কাঁদতে লাগলো সে এর আগে অনেক গল্পের সমাপ্তি লিখেছে ,কিন্তু এই গল্পের সমাপ্তিটা সে এইভাবে চায় নি। অনেক কিছু হওয়ার ছিল ওদের দুজনের জীবনের ,হয়তো তারা আবার কাছে আসতে পারতো ,হয়তো স্নিগ্ধকে মেন্টাল ট্রিটমেন্ট করিয়ে সুস্থ করা যেত ,তারা একটা বাচ্চা অনাথআশ্রম থেকে আডপ্ট করতে পারতো। অপর্ণা হয়তো গল্পটা লিখতে পারতো নতুন করে।  

No comments:

Post a Comment