Wednesday, June 17, 2020

সাদা ভাত


সাদা ভাত 
.... ঋষি 
.
সাইদুল ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরলো ,আজ তাকে বেরোতে হবে মাঝরাতে মাছ ধরতে। সুন্দরবনের জয়মনি ঠোটার জেলে পল্লীতে বেশ কয়েক পরিবার জেলে থাকে ,সাইদুল তাদের মধ্যে একজন। সাইদুলের পাশে শুয়ে তারা নিকা করা বউ ফতেমা। সাইদুল ফাতেমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছিল ,চাঁদের আলো কাঁচা বেড়ার দেওয়াল ভেদ করে পড়ছিল ফাতেমার মুখে। ফতেমা সেই তেরো বছর বয়সে বিয়ে করে এসেছে সাইদুলের বাসায় ,আজ তার দুই ছেলের মা ,বয়স ওই পঁচিশের কাছাকছি। বেশ কালোর মধ্যে উজ্জ্বল দুটো চোখ ,সাইদুল মুগ্ধ তার স্ত্রীর রূপে। ফতেমা চোখ খুলে চাইলো সাইদুলকে বললো ঘুমাও নাই ,সাইদুল বৌকে টেনে নিলো বুকে। ফাতেমার কোমরে হাত রেখেছে বললো ,মাছের পেটি মাইরি। ফতেমা বললো ছাড়ো ,আবার আদিখ্যেতা ,সাইদুল আরো জোরে চেপে ধরলো বুকে। এই জেলে পাড়ায় আজ অবধি সরকার থেকে ক্যারেন্ট আসে নি ,নেই কোনো মিঠে জল ,শুধু ভরসা বলতে নদীর মাছ আর বিনোদন বলতে এই দরিদ্র মানুষগুলো বোঝে সঙ্গম। এখানে কোনো স্কুল নেই ,তবে সকাল হলে বোঝা যায় এখানকার কিচিরমিচির থেকে ছোট বাচ্চাদের সংখ্যা।  একটা হাসপাতাল আছে ওই পাড়ে ওটাই এদের সম্বল। সাইদুল পরম তৃপ্তিতে ফতেমার  ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো ,ফতেমা মুখ সরিয়ে বললো অনেক হয়েছে পীড়িত ,এইবার ওঠো তোমাকে বাইরাতে হবে ,আমাকেও যেতে হবে জল আনতে বাজারের পাশে ।সাইদুল উঠে বসলো ,ফতেমা ডাকতে লাগলো তার দশ বছরের ছেলে নানুকে ,সে আজকাল বাবার সাথে নৌকোয় যায় মাছ ধরতে।
                                          সাইদুল আর নানু  মিষ্টি আলু খাচ্ছিল আর ফতেমা সাইদুলের সারা গায়ে সরষের তেল মালিশ করছিল।এই জেলেপাড়ায় ভাত বিশেষ জোটে না এদের ,আজকাল নদীতে মাছ কমে গেছে ,পরিমান মতো মাছ না পেলে মহাজন নিতে চায় না। যেদিন মাছ কম ধরা পরে সেদিন এদের একমাত্র ভরসা মিষ্টি আলু ,যা ঝোঁপে ঝাড়ে হয় এখানে। ছোট ছেলে কানু ঘুম  থেকে উঠে ফাতেমাকে বললো কি করছিস আম্মি ? ফতেমা বললো তেল মালিশ করছি ,না হলে তোর বাবাকে জল কামড়াবে। কানু বললো জল আবার কামড়ায় নাকি ,ফতেমা বললো তুই যখন দাদার মতো সেয়ানা হবি বুঝবি। 
  .
সাইদুল আর নানু বনবিবিকে প্রণাম করলো ,তারপর উঠে পড়লো তাদের দশহাত লম্বা পুরোনো নৌকোতে।এখানে সকল জেলেরা বনবিবিকে খুব মানে ,এরা  জান বাঁচাতে বনবিবির পুজো করে তাই। বনবিবি মানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ,এখানে বাঘের খুব উপদ্রপ ,মাঝে মাঝে জেলেদের টেনে নিয়ে যায় জঙ্গলে। সাইদুলের বাবাকেও নাকি রয়্যাল বেঙ্গল টেনে নিয়ে গেছিল। এই সময়   জিহাদুল মিঞা সারা রাত মাছ ধরে  ফিরছিল  ,সে সাইদুলকে বললো আজ মাছ সেরকম নাই জলে ,দেখ তুই কি পাস। নানু এখন লম্বা লগি দিয়ে নৌকো ঠেলছে ,আর সাইদুল চিৎ হয়ে নিজের শরীরে সর্ষের তেলগুলো মালিশ করছে। নানু বললো আজ আব্বা আমরা অনেক মাছ পাবো ,বাজার থেকে চাল নিয়ে আসবো। সাইদুল বললো সব আল্লাহার ইচ্ছা ,যদি আল্লাহ খুশি থাকে তবে নিশ্চয় বেটা আজ আমরা ভাত খাবো। নৌকো এখন মাঝ নদীতে ,সাইদুল আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহার নাম করলো ,ছুঁড়ে দিলো মাছ ধরার জালটা মাঝ নদীতে। দু তিনবার জাল টানার পর তেমন মাছ উঠলো না ,সাইদুল বললো নানুকে চল বেটা আরেকটু গভীরে যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে সাইদুল দেখলো আকাশের অবস্থা ভালো না ,ঝড় ,বৃষ্টি আসতেই পারে। 
.
আজ তেমন মাছ উঠছে না  , ঝড়বৃষ্টির শুরু হয়ে গেছে খুব জোরে ,সাইদুল তাই ফিরে যেতে মনস্থির করলো ,নৌকো ঘোরালো । আসার সময় সে বাজারে গেছিল ,মহাজন  এইকয়েকটা  মাছ  প্রথমে নিতে চায় নি ,পরে দুটো কুড়ি টাকার নোট এগিয়ে দিলো মাছগুলো নিয়ে   ,কেমন একটা অদ্ভুত ভাবে চোখ টিপে হাসলো  রহমান মহাজন  ,তারপর বললো তোর আর টাকার কি দরকার ,তোর এমনিতেই পেট ভরা থাকে ,বাড়িতে এমন মাছের মতো বউ।কথাটা শুনতে ভালো লাগলো না সাইদুলের ,তার মনটা ফাতেমার জন্য কেমন করে উঠলো। ফতেমা এখানকার অন্য মেয়েদের থেকে সুন্দরী ,আর রহমানের চোখ ভালো না। বাজারে তার দুর্নাম আছে এই মেয়েদের ব্যাপারে। দু কেজি চাল কিনে সাইদুল নৌকোয় উঠলো ,নানু বললো আজ তবে ভাত হবে। 
.
সাইদুল ঘরে ঢুকলো তখন সন্ধ্যে ,মেজাজ তার এমনিতেই ভালো ছিল না। সে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে পেলো সাদা ভাতের গন্ধ ,কিন্তু বাড়িতে তো এক ফোটা চাল ছিল না ,চাল এলো কোথা থেকে  ? সে সোজা গিয়ে ফাতেমাকে প্রশ্ন করলো   ,ফতেমা মুচকি হাসলো তারপর বললো যাও আগে নেয়ে এসো ,খেতে বসো পরে বলছি। হঠাৎ সাইদুলের মাথাটা গরম হয়ে গেলো, সে এক লাথি মেরে কাঁচা উনুন সহ মাটির ভাতের হাঁড়িটা ভেঙে দিলো তারপর  চেপে ধরলো ফাতেমার চুলের মুঠি ,বললো আমি জানি না চাল কোথা থেকে এলো ,তুই মাগি গেছিলিস রহমানের কাছে ,ও চাল দিয়েছে বল ,কবে থেকে করছিস এই সব  ? ফতেমা কেমন অবাক চোখে দেখলো সাইদুলকে তারপর বললো বেশ করেছি গেছি ,তুই কি করবি কর। সাইদুল এক টানে হেনসুলিটা তুলে নিলো। দশ বছরের নানু এগিয়ে এসে আটকালো বাবাকে ,তিন বছরের কানু কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে বাবাকে জড়ানো ভাষায় যা বললো তার অর্থ হলো ফাতেমার আব্বা এসেছিল যে দিয়ে গেছে । সাইদুল মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো ,ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলো সারা ঘরে ভাত ছড়ানো মাটির মেঝেতে। সে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।   
   .
নদীর জলের উপর আজ আকাশের চাঁদটা আজ বড় সুন্দর ছায়া ফেলেছে। সাইদুল নদীর ধরে বসে দেখছিল আর ভাছিল কি আছে তার জীবনে ? সে কেন বেঁচে ?পেটের খিদে আর ফতেমা। ফতেমা,ফতেমা করে কাঁদতে কাঁদতে সাইদুল মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। আজ সে কি করলো ,কি ভাবে ভাবতে পারলো সে ? কি করবে সাইদুল এইবার ? কোন মুখ নিয়ে ক্ষমা চাইবে সে ফাতেমার কাছে  ? আত্মহত্যা করবে এই নদীতে। এই সময় সাইদুল দেখলো নদীর জলে চাঁদের পাশে একটা নারী শরীর ,সে চমকে পিছনে ফিরে তাকালো ,ফতেমা। ফতেমা বললো বাড়ি চলো বাচ্চারা বসে আছে না খেয়ে। সাইদুল জড়িয়ে ধরলো ফাতেমাকে ,ক্ষমা করো আমাকে। ফতেমা সাইদুলের কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো আমি তোমারি এই জীবনে ,সাইদুল ফাতেমার কোমড়ে হাত রেখে বললো মাছের পেটি মাইরি। 

No comments:

Post a Comment