কেদারা
... ঋষি
.
দীনেশ মল্লিক এককালীন সরকারি রিটায়ার্ড অফিসার পুরোনো কলকাতার ,এন্টালির বাসিন্দা ।মল্লিকদের বাড়ি এই পাড়ার সবচেয়ে পুরোনো বাড়িগুলোর একটা। শোনা যায় ব্রিটিশরা যখন এ দেশে রাজত্ব করতো তখন মল্লিকদের পিতৃপুরুষদের সঙ্গে বেশ কিছু এই শহরের ব্রিটিশ অফিসারের ওঠাবসা ছিল ,সেই কারণে আজও পুরনো মল্লিকবাড়ির প্রতিটা দেওয়াল ,প্রতিটা ব্যালকনি থেকে পুরোনো আভিজাত্য ঝরে পরে। দীনেশ মল্লিকের যখন উর্ত্তী বয়স কিংবা তার বাবার আমলেও এই বাড়িতে নিয়মিত প্রতি সন্ধ্যাতে পার্টি হতো। সেই পার্টিতে বিদেশী মদ ,হাজারো পদের খাবার আয়োজন হতো ,এই শহরের প্রচুর নামি লোক,গুণী শিল্পী এই পার্টিতে যোগ দিতেন । দীনেশ মল্লিক রক্তের পরম্পরায় স্বভাবে রাশভারী গম্ভীর মানুষ ,পিতৃপুরুষের থেকে পাওয়া আভিজাত্য,নিয়ম রীতি সারা জীবন ধরে পালন করার চেষ্টা করেছেন।এখন তার আধিপত্য কিছুটা কমেছে বটে ,কারণ ভাঁড়ার ঘরে টান পড়েছে। তিনি সারাজীবন বুকফুলিয়ে ভীষণ সৎ থেকে চাকরিটা করেছেন ,তার স্ত্রী সন্ধ্যা দেবী এই নিয়ে মাঝে মাঝে তাকে বোঝাতে আসলে ,তিনি ধমক দিয়ে তাকে চুপ করিয়েছেন। সন্ধ্যা দেবীরও বয়স হয়েছে ,তিনি একসময় একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন । মল্লিক বাবুর একমাত্র ছেলে মৃন্ময় যার রিয়্যাল স্টেটের নিজস্ব ব্যবসা আছে। এই বাড়িতে আরেকজন আছেন যিনি বয়সে সবচেয়ে কনিষ্ঠ আর মল্লিকবাবু জীবন সে হলো চিন্ময় ,তার নাতি। মোটের উপর মল্লিক বাবুর বউ,ছেলে ,পুত্রবধূ আর নাতি নিয়ে বেশ ভালোই দিন কাটছে।
.
অনুপমা এখনও বিছানা থেকে ওঠে নি ,আজ তার মন ভালো নেই ,আজ তার ছোটবেলার বন্ধুদের একটা গ্যাদারিং পার্টি আছে ,কিন্তু মৃন্ময় তাকে যেতে দেয় নি।অনুপমার মা একজন ফিরিঙ্গি আর বাবা বাঙালি ,সে মানুষ হয়েছে বিদেশী কায়দায় ,সে ছোটবেলা থেকে তার মাকে দেখেছে ,সে দেখেছে মেয়েদের স্বাধীনতা। তার মা প্রায় চাকরি থেকে ,কিংবা পার্টি থেকে একা নেশা করে অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছেন ,তিনি সংসার করেছেন ,মেয়ে মানুষ করেছেন ,স্বামীকে ভালোবেসেছেন কিন্তু কখনো সেই ব্যাপারে অনুপমার বাবা হস্তক্ষেপ করেন নি। মেয়েদের স্বাধীনতা দেখে অভ্যস্ত অনুপমার এই বাড়িতে দমবন্ধ লাগে। মল্লিকবাড়ির অন্দরমহলে মেয়েরা সেই প্রাচীন অন্ধকারে পরে যেখানে আলো ঢোকে না। অনুপমা ভালোবেসে মৃন্ময়কে বিয়ে করে কিন্তু সে আগে বোঝে নি এসব ,বিয়ের পরও না। যখন চিন্ময়ের সাত মাস বয়স সে প্রথমবার বিয়েরপর বাপের বাড়ি যেতে চায় কিন্তু যেতে পারে নি কারণ এই বাড়ির মেয়েরা বাচ্চা হবার পর একবছর অবধি বাইরে বেড়োয় না। তারপর থেকে ক্রমাগত না ,না শুনতে শুনতে অনুপমা ক্লান্ত হয়ে গেছে ,হয়তো মৃন্ময়ের সাথে সম্পর্কটাও তার ভেঙে যেত কিন্তু চিন্ময় জন্য আর কিছু সম্ভব নয়। মৃন্ময় তার বাবাকে ভীষণ মান্য করে ,কিন্তু অনুপমা বোঝে সন্মান করা মানে শিরদাঁড়া হীনতা নয়। অনুপমা চিরকাল তার বাবা মাকে সন্মান করেছে ,কিন্তু প্রয়োজনে সত্যিটাও বলেছে। এই যে মৃন্ময়ের সাথে বিয়েটা তো অনুপমার মা মানতে চাই নি ,কিন্তু তাই বলে সে কি মৃন্ময়কে বিয়ে করে নি। অথচ মৃন্ময় তার বাবা দীনেশ মল্লিকের সামনে সত্যিটাও বলে না ,দীনেশ মল্লিকের ইচ্ছে এই বাড়ির লোকেরা আদেশের মতো মেনে চলে। অনুপমা মাঝে মাঝে ভাবে সে কোন যুগে বাস করে ,মাঝে মাঝে তার অসহ্য লাগে তবু চঞ্চলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে সব মেনে নেয়। কিন্তু আজ সকালে যখন অনুপমা মৃন্ময়কে বলেছিল সে আজ বিকেলে ক্লাবটাউনে যাবে ,তার পুরোনো বন্ধুদের গ্যাদারিংএ ,মৃন্ময় সটান বলে দেয় বাবা পছন্দ করেন না বাড়ির মেয়েরা পাড়া ঢলিয়ে বেড়ায়। কথাটা শুনে অনুপমার মাথায় আগুন লাগে ,সে বলে মৃন্ময় তুমি নাকি ভদ্র বাড়ির ছেলে ,ভদ্র বাড়ির ছেলেরা বুঝি বৌয়ের সাথে এমন করে কথা বলে। মৃন্ময় উত্তরে বলে কথা বলা তোমার কাছ থেকে শিখতে হবে যার মা সারারাত ঢলিয়ে বাড়ি ফিরত। অনুপমার আর হয় হয় না সে সটাং এক থাপ্পড় মারে মৃন্ময় ঘুরে দাঁড়িয়ে অনুপমাকে ঠেলে ফেলে দেয় বিছানায় । অনুপমা চিৎকার করে বলে
আজ তোমাকে ঠিক করতে হবে তুমি কার সাথে থাকবে আমার আর বাবুর সাথে ,নাকি তোমার বাবা মার সাথে। যদি বাবা ,মার্ সাথে থাকো আমাকে বলে দেও আমি বাবুকে নিয়ে চলে যাচ্ছি ,আর যদি আমাদের সাথে তোমাকে থাকতে হয় তবে চলো আমরা আলাদা হয়ে যায়। বাইরে থেকে সন্ধ্যা দেবীর গলা পাওয়া যায়,তিনি বলছেন তোরা সকাল থেকে শুরু করেছিস আজ ,তোর বাবা শুনলে একটা ভীষণ কান্ড হবে ,চুপ কর একটু বোঝ লোকটারও তো বয়স হয়েছে।
.
পাঁচ বছরের চিন্ময় ছুঁটে গেলো দাদুর কাছে ,দাদু কোলে তুলে নিলো চিন্ময়কে। চিন্ময় বললো জানো দাদু মা ,বাবাকে চড় মারলো , বাবা মাকে ঠেলা মারলো ,খুব ঝগড়া হচ্ছে বুঝলে ,মা বলছে আমাকে নিয়ে চলে যাবে। তুমি বলো দাদু মা যদি আমাকে নিয়ে যায়,কে তবে আমাকে গল্প বলবে ,তুমি যাবে তো আমাদের সাথে। দীনেশ মল্লিক বসে ছিলেন পৈতৃক দত্ত বাড়ির দালানে একটা পুরোনো চেয়ারে। চেয়ার শব্দটা ইংরেজি শব্দ ,বাংলায় কেদারা ,এটা সেই কেদারায় বটে। কালচে পালিশ করা এই সেগুন কাঠের কেদারা এই বাড়িতে কতদিন আছে তা দীনেশ বাবুও জানেন না।দীনেশ বাবুর বাবা মৃত্যুর সময় এই কেদারাটা সম্বন্ধে আলাদা করে বলেছিলেন , ওটাকে সামলে যত্নে রাখিস ,এটা আমাদের বংশ পরম্পরার প্রতীক,আজ থেকে তুই বসবি ,যখন তোর ছেলে লায়েক হবে তাকে দিবি বসতে। দীনেশ বাবু ,চিন্ময়কে কোলে নিয়ে ভাবছিলেন তিনি ছেলেটাকে মানুষ করতে পারলেন না ,পুরুষ মানুষ কখনো মেয়েদের কাছে চড় খায়।তিনি তার কেদারার সুন্দর কাজ করা হাতলে হাত বোলাতে বোলাতে ভাবলেন কে বসবে তারপর এই কেদারায় ,মৃন্ময় কি আদৌ যোগ্য ?
.
মল্লিক বাড়ি ভাঙা হবে । পাঁচ মাস আগে দীনেশ মল্লিক মারা গেছেন আর তার শোকে এক সপ্তাহের মধ্যে তার স্ত্রী সন্ধ্যা দেবী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অনুপমা আর থাকতে চায় নি এই পুরোনো ভূতের বাড়িতে ,বিশেষত তার চাপেই মৃন্ময় এই বাড়ির জমিটা প্রোমোটিংয়ে দিয়েছে। পুরোনো বাড়ি ,প্রচুর পুরোনো আসবাব ,অনুপমা চায় না তাদের নতুন বাড়িতে কোনো পুরোনো কিছু থাকে। তাই আজ নিলাম হতে চলেছে পুরোনো মল্লিক বাড়ির সমস্ত আসবাব ,একে একে দড় হাঁকা হচ্ছে ,ক্রেতা দাম তুলছে ,বিক্রি হয়ে যাচ্ছে একের পর এক মল্লিক বাড়ির আভিজাত্য। চিন্ময় বসে আছেপৈতৃক দত্ত বাড়ির দালানে দাদুর কেদারায় ,মনে মনে সে কি বিড়বিড় করছে। অনুপমা এসে ডাকলো বাবু নেমে এসো ,কেদারাটা নিয়ে যাবে যে ,চিন্ময় সবাইকে চমকে দিয়ে তার মাকে উত্তরে বললো বৌমা এই চেয়ার বিক্রি করা যাবে না ,এটা আমাদের পিতৃপুরুষের ঐতিহ্য ,আমি মনে করি না মৃন্ময় এই চেয়ারের যোগ্য ,তবে আমার দাদুভাই নিশ্চয় এই চেয়ারে বসবে তারপর চিন্ময় কেঁদে উঠলো মা এটা আমার চেয়ার।

No comments:
Post a Comment