বিনয় মজুমদার
... ঋষি
.
সকাল থেকে খুব ঘুম পাচ্ছে বিনয়ের অফিসে বসেও ,রাত জাগা চোখে সময়ের উত্থান আর পতন বিনয়ের ,সময় আছড়ে পড়েছে সারারাত সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আবার ফিরে গেছে ,রেখে গেছে ভিজে চিন্হ বিছনার চাদরে নোনতা ঘামে । বিনয় মজুমদার না কবি নয় ,একজন বেসরকারি অফিসের একজিকিউটিভ, বয়স আঠাশ বছর,গ্রামের বাড়িতে মা ,বাবা ,বোন সকলে আছে। বিনয়ের কলকাতায় নিজের ফ্ল্যাট ,এই কিছুদিন হলো একটা নতুন গাড়ি ও কিনেছে সে তবে সবটাই ই এম আইতে। গতরাতে বিনয় শুধু একলা জেগে ছিল না,তার চোখের পাশে কাল সারারাত বিনয়ের সাথে জেগে ছিল একটা রাষ্ট্র ,অবশ্যই সেই রাষ্ট্রটার নাম ভারতবর্ষ। কাল মধ্যরাতে বিনয় সে অফিস থেকে হঠাৎ একটা মেইল পায় ,যেখানে ভারতবর্ষের বিস্তারিত অর্থনীতি আলোচনা করা হয় এই করোনা সময়ে ,তারপর শেষে দিকে এক দু লাইনে যা লেখা ছিল তার গোদা বাংলা পরের দুমাস তাকে কোনো বেতনছাড়া বাড়িতে বসতে হবে।
.
এখন প্রশ্ন হলো একটা আঠাশ বছরের ছেলে ,মাথার উপর বাবা ,মা,বাড়িতে অবিবাহিত বোনের দায়িত্ব ,তারপর এতগুলো ই এম আই ,কি করে সম্ভব ?এই কথা ভেবে কাল সারারাত বিনয় এ সি চালিয়ে ঘেমে ভাসিয়ে দিয়েছে বিছানার চাদর। আজ সকাল থেকে তার মাথা ধরে আছে ,আজ তার আপাতত শেষ দিন অফিসে। সে শুধু নয় তার মতো আরো অনেকে আছে এই সেলস ডিপার্টমেন্টে যারা একইরকম মেইল পেয়েছে কাল রাতে।এই মাত্র চক্রবর্তী মশাই মজা করে বললেন বুঝলে বিনয় এই দুমাস সময়ে কবিতা লেখা শিখে নেও ,যাই হোক তোমার নামের তো একটা স্বার্থকতা দরকার। এই ধরণের মস্করা সেই কলেজের সময় থেকে তাকে শুনতে হয়েছে তার বিনয় নামের কারণে ,কিন্তু কোনোদিন সে বিরক্ত হয় নি ,আজ বিরক্ত হলো বিনয় উত্তরে বললো বুঝলেন চক্রবর্তী বাবু কবিতা লিখে কি আর পেটের ভাত হয়,হয় মনের শান্তি ?
.
আজ দুদিন হলো বিনয় তার কলকতার ফ্ল্যাটে ,সে বাড়িতে জানাতে পারে নি ,নিজেই বাড়িতে গুমরে মরেছে। কিছু ভালো লাগছে না তার। বাড়ি থেকে মা ফোন করেছিল তোলে নি ,তমালিও ফোন করেছে আজ সকাল থেকে দু তিনবার না তোলে নি বিনয়। তমালি বিনয়ের প্রেমিকা ,অবশ্যই এই একলা শহরে বিনয়ের একমাত্র কাছের জন ও বন্ধু। তমালি বাংলা নিয়ে মাস্টার্ড করছে ,থাকে তমালের একই কমপ্লেক্সে। দুই বাড়িতে জানে সকলে বিনয় আর তমালির সম্পর্ক ,অসুবিধা কিছুই নেই। কিন্তু আজ কেন জানি তমালির গলা শুনতে ইচ্ছে করছে না বিনয়ের।
.
কলিংবেলটা বাজলো ,বিনয় খুব বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে দেখে তমালি দাঁড়িয়ে। মুখে মাস্ক ,হাতে গ্লাভস ,তমালি বললো ফোন তুলছো না কেন কাল রাত থেকে ,চিন্তা হয় না। তারপর ঠেলে সরিয়ে ঘরে ঢুকে এলো বললো কি অবস্থা ঘরের ,এইভাবে কেউ থাকতে পারে। তারপর নিজের মনে আওড়াচ্ছিল
" আমরা দুজনে মিলে জিতে গেছি বহুদিন হলো ।
তোমার গায়ের রঙ এখনো আগের মতো , তবে
তুমি আর হিন্দু নেই , খৃষ্টান হয়েছো । "
বিনয় বললো কার লেখা ,তমালি হাসলো বললো তোমার গো। আমার ,হ্যা বাবুমশাই এটা বিনয় মজুমদারের কবিতা,তুমি আমার জন্য একটা কবিতা লিখবে প্লিস।
.
আজ দুদিন বিনয় মজুমদারের কবিতা পড়ছে বিনয়। কবিতার বইগুলো তমালি দিয়ে গেছে ,বিনয়ের বেশ সময় কাটছে বাড়িতে বসে। ব্যাংকে মেইল করে রিপ্লাই পেয়েছে বিনয় ,ই এম আই গুলো বাম্পস করলে ক্ষতি নেই। বিনয়ের ব্যাংকে যে টাকা জমানো আছে তাতে তার দুমাস ভালো করেই কেটে যাবে। বহুদিন ধরে কাজের চাপে বিনয় একটা ব্রেক চাইছিল ,এই অফিস থেকে দুমাসের ছুটিটাকে সে সেই সেই ব্রেক হিসেবে দেখছে। এই সুযোগে সে সত্যি বিনয় মজুমদার পড়ছে ,বেশ উৎসাহ পাচ্ছে। আজ সে একটা পুরোনো ডাইরি আর কলম টেনে বসলো তমালির জন্য একটা ভালোবাসার কবিতা লিখবে বলে। সামনে খবর চলছে। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রে করোনা আক্রান্ত বারো লাখ ,মারা গেছে প্রায় তেতাল্লিশ হাজার। রাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে ,কালখিদের জ্বালায় পশ্চিম মেদিনীপুরের এক চাষি না খেয়ে মরেছে। টুপ্ করে এক ফোঁটা জল ঝরে পড়লো বিনয়ের ডাইরির পাতায়। বিনয় ভুলে গেলো লিখতে তমালির জন্য ভালোবাসার কবিতা ,লিখতে শুরু করলো সময়। কবি বিনয় মজুমদার কোথাও আড়াল থেকে হাসলেন, লিখলেন
.
কবিতা বুঝিনি আমি ; অন্ধকারে একটি জোনাকি
যত্সামান্য আলো দেয়, নিরুত্তাপ, কোমল আলোক ।
এই অন্ধকারে এই দৃষ্টিগম্য আকাশের পারে
অধিক নীলাভ সেই প্রকৃত আকাশ প’ড়ে আছে—
এই বোধ সুগভীরে কখন আকৃষ্ট ক’রে নিয়ে
যুগ যুগ আমাদের অগ্রসর হয়ে যেতে বলে,
তারকা, জোনাকি—সব ; লম্বিত গভীরহয়ে গেলে
না-দেখা গহ্বর যেন অন্ধকার হৃদয় অবধি
পথ ক’রে দিতে পারে ; প্রচেষ্টায় প্রচেষ্টায় ; যেন
অমল আয়ত্তাধীন অবশেষে ক’রে দিতে পারে
অধরা জ্যোত্স্নাকে ; তাকে উদগ্রীব মুষ্টিতে ধ’রে নিয়ে
বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশের, অন্তরের সার পেতে পারি ।
এই অজ্ঞানতা এই কবিতায়, রক্তে মিশে আছে
মৃদু লবণের মতো, প্রশান্তির আহ্বানের মতো ।
No comments:
Post a Comment