হাতের পুতুল
.... ঋষি
জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানে যেটা থাকে সেটা সময়ের হাতে থাকা কিছুক্ষন। সময় যেখানে ঈশ্বর আমরা ,সকলে সেই ঈশ্বরের হাতের পুতুল ,উত্থান ,পতন ,মানুষের রিপু,মানুষের সম্পর্ক সব যেন সুতোয় বাঁধা কোনো ছেলেখেলা সময় নামক ঈশ্বরের। মানুষের ভালো লাগা ,মানুষের ভালোথাকা ,মন্দ থাকা এই জন্ম মৃত্যুর মাঝখান কিছুক্ষন মানুষের বেঁচে থাকা। মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী জীব অথচ সময়ের কাছে মানুষ বড়ো অসহায় । পারুল ভাবছিল এই সব কথা ,পারুল ভাবে এই সব মাঝের মধ্যে। পারুলের স্বপ্নেও মাঝে মাঝে এমন কিছু অবাস্তব আছে ,যা ভেবে পারুল পরে হাসতে থাকে। পারুলের পুরো নাম প্রীতিলতা ,ডাকনাম পারুল আর সঞ্জয় মানে পারুলের স্বামী আদর করে পারুলকে পারু বলে ডাকে,আরেকজন ডাকতো তাকে এই নামে । পারুল যখন ভাবের বশে সঞ্জয়কে এই কথাগুলো বলে ,সঞ্জয় বলে তুমি আর অরুর মধ্যে কোনো তফাৎ নেই ,অরু হলো পারুলের সাত বছরের মেয়ে।
.
পারুল মাঝে মাঝে ভাবে সে এই পৃথিবীতে ঠিক সে কতটা খুশি ? পারুল ভালোই তো আছে ছোটবেলার থেকে ,বাবা ,মার্ একমাত্র সে ,স্বামী সঞ্জয়ও তাকে ভালো রেখেছে। তার স্বামী সঞ্জয় বনেদি পরিবারের একমাত্র সন্তান ,যে বাড়িটাই থাকে ওরা বাড়িটাও সঞ্জয়ের পৈতৃক । সঞ্জয়ের বাবা ,মা গত হওয়ার পরে পারুলের সংসারে তেমন কোনো অভাব নেই ,অরু মাঝে মাঝে দুস্টুমি করে ,সে তো বাচ্চারা করেই থাকে।মোটের উপর পারু তো ভালোই আছে ,তবে কেন তার মাঝে মাঝে গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে ,সেটা কি একাকিত্ব ? সঞ্জয়কে কাজের সূত্রে মাসের কিছুদিন বাইরে থাকতে হয় ,তার ইম্পোর্ট এক্সপোর্টের চামড়ার বিজনেস।সঞ্জয় যখন বাইরে থাকে সে কদিন পারুল একাই থাকে মেয়েকে নিয়ে ,নিজের বাড়ি ,নিচে দারোয়ান রামসিং আজ বহুদিনের ,কিছু আনতে হলে বাজার থেকে সেই এনে দেয়। পারুলের সকাল আর বিকেলে কাজের মাসি আছে ,আছে রান্নার লোক যারা নিয়মিত এসে সংসারের বাকি কাজ করে দেয়। তাই সমস্ত সংসার সামলে ,মেয়েকে সামলেও পারুলের অনেকটা সময় বেঁচে যায় ,সেই সময় তার বই পড়তে ইচ্ছে করে না ,অন্য বাড়ির বৌদের মতো সে টিভি দেখে সময় কাটাতে পারে না ,সেই সময় পারুল ডুবে যায় তার অদ্ভুতুড়ে ভাবনায় ,তার ভাবতে ভালো লাগে এই সব।
.
দেওয়াল ঘড়িতে রাত বারোটা ,পারুলের খাটটা হাওয়ায় ভাসছে ,সে একলা শুয়ে হাওয়ায় ভাসতে থাকা খাটে। ওপর থেকে নিচের দিকে তাকাচ্ছে দেখছে সমস্ত নীল মেঘ ,সমস্ত অধিকার পেরিয়ে নিচে গোল পৃথিবীটা ঘুরছে, আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে নীল সমুদ্র আর সবুজ মাটিকে। হঠাৎ এক বালতি লাল রক্ত কে পৃথিবীর উপর ঢেলে দিলো ,পৃথিবীর সব জল লাল হয়ে গেলো মুহূর্তে। সাদা জমির উপর ছিটকে পড়লো কয়েক ফোঁটা রক্ত ,পারুল শুনতে পারছিল মানুষের চিৎকার ,মানুষের কান্নার শব্দ।হঠাৎ ঘুম ভেঙে আঁতকে উঠে বসলো পারুল ,পাশে মেয়ের দিকে তাকালো সে ঘুমিয়ে ,তার পাশে সঞ্জয় মুখ হা করে ঘুমোচ্ছে। পারুল অনুভব করলো তার পেটে অদ্ভুত যন্ত্রনা ,তারপর সে অনুভব করলো পায়ের ফাঁক থেকে তার গড়িয়ে নামছে রক্ত। পারুল অবাক হলো এখন তার পিরিয়ডের ডেট নয় ,সে ছুটে গেলো বাথরুমে।
.
সঞ্জয় আজ দিল্লী চলে গেছে সকালে। পারুলের এই মাসে পিরিয়ডটা একটু বেড়েছে ,ক্রমাগত রক্ত বেরোচ্ছে ,কমবার নাম নেই ,আজ প্রায় সাতদিন হয়ে গেলো ,অন্যবারে তো তিনদিনেই মিটে যায় ঝামেলা। এখন দুপুরবেলা পারুল শুয়ে আছে খাটে ,মেয়ে গেছে স্কুলে। পারুলের আবছা নিদ্রায় ফিরে এলো সে স্বপ্নটা এইবার পারুল দেখেছে পৃথিবী থেকে একটা কৃমির মতো কিছু ক্রমাগত এগিয়ে আসছে তার দিকে ,কৃমিটার সারা শরীরে রক্ত ,ক্রমশ পারুলের খুব কাছে কৃমিটা। পারুল চমকে উঠলো সেটা কোনো কৃমি নয় ,একটা ভ্রুন মানুষের। ভ্রূনটা পারুলকে মা বলে ডেকে উঠলো আর ঠিক একই সময় পবিত্রের গলা ,চিনতে পারছিস পারু আমাদের ভালোবাসা,চল পালাই ।পারুল ঘুম থেকে আবার চমকে উঠলো ,পবিত্র ! সেই পবিত্র যে কলেজে তার প্রথম প্রেম এবং তার প্রেমের সেই ফলটা তাকে বাবা,মার্ চাপে এবসন করতে হয় ,তারপর তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয় সঞ্জয়ের সাথে। পবিত্র যখন শুনেছিল পারুলের পেটে ওদের ভালোবাসা ,পবিত্র বলেছিল চল পালাই ,পারুল পারে নি সেদিন।আজ এতদিনে কোনোদিন পারুলের পবিত্রর কথা মনে হয় নি কিন্তু এতদিন পর হঠাৎ পবিত্র এলো কোথা থেকে। এই সময় পারুল অনুভব করলো তার পিরিয়ডের রক্ত নদীর মতো গড়িয়ে নামছে তার দু উরু বেয়ে। নিচ থেকে পারুল শুনতে শুনতে পেলো অরুর গলায় মা ডাক ,অরু স্কুল থেকে ফিরেছে।
.
সঞ্জয় এখন বসে আছে গাইনোলজির ডাক্তারের চেম্বারে ,পারুলের চেকআপ হয়েছে ,পারুলের মারাত্বক ব্রিডিংয়ের কারণে সে খুব উইক।ডাক্তার মৈত্র সাদা পর্দা সরিয়ে বেড়িয়ে এলেন গ্লাভস খুলতে খুলতে এবং এসে বসলেন চেয়ারে। পারুল এসে বসলো ,সঞ্জয়ের পাশে। সঞ্জয় ডাক্তার মৈত্রের গম্ভীর মুখ দেখে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলো পারুলের সম্পর্কে। ডাক্তার মৈত্র বললেন আপনাদের কাছে লোকবার কিছু নেই ,আমি সাসপেক্ট করছি পারুল দেবীর অবডোমেনে একটা টিউমার আছে.যেটা অনেকটা বড়ো হয়ে গেছে ,অপারেশন করে কেটে বাদ দিতে হবে ,আমি আজি পারুল দেবীর রক্ত বায়োপ্সিতে পাঠাচ্ছি। সঞ্জয় বাবু আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন আপনার স্ত্রীকে আমাদের এখানে ভর্তি করে দিন।
.
কাল পারুলের অপারেশন,সমস্ত রিপোর্টে এটা পরিষ্কার তার লোয়ার অবডোমেনে একটা টিউমার আছে । পারুলকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। পারুল এখন স্বপ্ন দেখছে পবিত্র হাসছে ,তাকে বলছে কি রে তবে তুই বাচ্চাটাকে রাখবি না ,বাচ্চাটাকে মেরে ফেলবি। পারুল চমকে উঠলো কাঁদতে কাঁদতে ঘুম থেকে। নার্সরা দৌড়ে এলো ,তারা শুনলো পারুল বলছে আমি চাই নি রে ,আমি চাই না ,কিন্তু পবিত্র তুই যে কিছু কাজ করিস না ,আমাকে খাওয়াবি কি ,কি খাওয়াবি বাচ্চাটাকে।পারুল অর্ধেক ঘুমে দেখতে পেলো পৃথিবীর জলের মতো সাদা দেখতে পাওয়া স্থলভাগগুলোও ভরে যাচ্ছে রক্তে।

No comments:
Post a Comment