অশুভ বৃষ্টি
.... ঋষি
আজ সকাল থেকে তুমুল বৃষ্টি শহরে। ছোটবেলায় মাকে বৃষ্টি পড়লে প্রশ্ন করতাম বৃষ্টি কি ? কোথা থেকে আসে ?মা বলতো ঠাকুর নাকি আমাদের বাঁচাতে জল দেয়, যেমন হাওয়া,যেমন গাছ । মা আরো বলতো বুঝলি বৃষ্টি ঠাকুর আমাদের বেঁচে থাকতে যা যা দরকার সব দেয় এই পৃথিবীতে।আমার জন্ম ভরা শ্রাবনে ,তাই বোধহয় মা ,বাবা ভালোবেসে তাদের একমাত্র কন্যার নাম রেখেছে বৃষ্টি। কিন্তু একটা প্রশ্ন মাকে প্রশ্ন আগেই আমার দশ বছর বয়সে মা মারা গেলেন। বাবাকেও প্রশ্নটা আজ আঠাশ বছরে দাঁড়িয়েও করতে পারলাম কই ,বৃষ্টি হলে কেন মন খারাপ হয় ? আমি বাবাকেও দেখেছি মা মারা যাবার পর বহুবার এমনি অনেক বৃষ্টির দিনে জানলার পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে ,আমি তখনি বুঝেছিলাম বৃষ্টি হলে এই শহরের অনেকেরই মন খারাপ হয়। কিন্তু কেন হয় ? আমি বুঝি নি আজ অবধি।
আজ রবিবার বৃষ্টির আজ ছুটি আছে তাই পরিতোষ বাবু সকাল সকাল বাজার করে ফিরেছেন। পরিতোষ বাবু রিটায়ার করেছেন প্রায় তিন বছর ,আর তার নিজের বলতে এই এক মা মরা মেয়ে বৃষ্টি। পরিতোষ বাবুর স্ত্রী চুমকি হঠাৎ এক ভীষণ জ্বরে মারা গেল ,সেদিনও বৃষ্টি পড়ছিল ,বৃষ্টির তখন চার বছর ,তারপর থেকে অনেক যত্নে মানুষ করেছেন তিনি বৃষ্টিকে ,বুকে আগলে রেখেছেন আজ অবধি। সত্যি বলতে পরিতোষ বাবু আজ অবধি বেঁচে আছেন ওই বৃষ্টির মুখের দিকে তাকিয়ে। পরিতোষ বাবুর পরিবারের সঙ্গে বৃষ্টির জলের সম্পর্ক সুখে ,দুঃখে জড়িত। পরিতোষের বাবাও যেদিন মারা গেছিলেন সেদিন ও বৃষ্টি হচ্ছিল ,যেদিন বৃষ্টি পৃথিবীতে আসে সেদিন বৃষ্টি হচ্চিল। বৃষ্টির নামকরণ করতে গিয়ে চুমকি এই নামটা দিতে চাইছিল না কারণ বৃষ্টি নামটা নাকি অশুভ ,কিন্তু পরিতোষ বাবু বলেছিলাম মেয়ের জন্ম ভরা শ্রাবনে আর এই মেয়ের জীবন মোটেও মেঘলা নয় ,সবুজ দিনের অঙ্গীকার।বাস্তবিক পরিতোষের এই মেয়ে আসার পর হঠাৎ বহুদিন ধরে যে পদোন্নতি অফিসে আটকে ছিল ,সেটা হঠাৎ হয়ে যায়। আর আজ অবধি চুমকির মারা যাওয়া ছাড়া মোটের উপর পরিতোষের আর কোনো দুঃখ আসে নি।
বৃষ্টি দাঁড়িয়েছিল জানলার পাশে ,তার আজ অফিস ছুটি ,আজ সকাল থেকে মুশল ধারে বৃষ্টি ,তার মনে হচ্ছে আজ কিছু অশুভ ঘটতে চলেছে। তার অন্যমনস্ক ভাবনাটা হঠাৎ ভেঙে দিয়ে মোবাইলটা রিংটোন বেজে উঠলো অনুপমের গলায় এই মেঘলা দিনে একলা ,ঘরে থাকে না তো মন।এই গানটা বৃষ্টির ভীষণ পছন্দের ,কেন জানি বৃষ্টিকে নিয়ে তৈরী প্রতিটা সৃষ্টি বৃষ্টির খুব কাছের। বৃষ্টির ফোনের স্ক্রিনে আকাশের নাম ফুটে উঠলো ,আকাশ বৃষ্টির বয় ফ্রেন্ড। ফোনটা তুললো ওপাশ থেকে শোনা গেলো কি ম্যাডাম আজ কি প্ল্যান ? বৃষ্টি বললো বাইরে বৃষ্টি ,আজ বাবার সাথে লাঞ্চে খিচুড়ি ,তারপর ঘুম ,বিকেলে জানি না এখনো। আকাশ বললো জানি তো আজ বৃষ্টি পড়ছে বাইরে ,আর তোর ভিতরে। বৃষ্টি বললে তুই এতো শয়তান হয়েছিস কেন বলতো ? আকাশ বললো ম্যাডাম এই বৃষ্টি তো কয়েকমাস বা দিনের ,আসল বৃষ্টি তো নিয়মিত প্রতি মাসে তোর ভিতর। বৃষ্টি বললো তোর সাথে দেখা হোক পেটাবো। আকাশ বললো যে জন্য ফোন করা ম্যাডাম , একটা ভালো ইংরেজি সিনেমা এসেছে প্যারাসাইট নামে ,তুই বিকেলে রেডি হয়ে থাকিস পাঁচটায় ,আমি গাড়ি নিয়ে যাবো। ওপাশে দিয়ে বৃষ্টি শুনতে পেলো বাবা ডাকছে ,সে বললো ফোনে বাবা ডাকছে পরে কল করছি। আকাশ বললো কাবাব মে হাড্ডি ,হাড্ডিকে বলিস রাত্রে ডিনার করে ফিরবি।
এখন রাত্রি প্রায় দশটা বাইপাস দিয়ে গাড়িটা ছুটছে ,ভিতরে আকাশ আর বৃষ্টি কথা বলছে আজ সারা সন্ধ্যের কাটানো বিভিন্ন সময় নিয়ে। বাইরে তুমুল বৃষ্টি ,গাড়ি চলছে খুব ধীরেই ,কারণ বারংবার গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন চললেও রাস্তা দেখা যাচ্ছে না।
ডাইনিং টেবিলে মেয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন যেন পরিতোষ বাবুর চোখ লেগে গেছিল। ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙলো পরিতোষবাবুর ,রিসিভার তুলে বললেন হ্যালো ! কে বলছেন ?ওপাশ থেকে গম্ভীর স্বরে কেউ বললো.... লাল বাজার থেকে বলছি ,বৃষ্টি মন্ডল আপনার মেয়ে ,কেন কি হয়েছে বৃষ্টির ? প্লিজ একবার আপনি বাইপাসের ধরে লাইফলাইন হসপিটালে চলে আসুন।
এই মুহূর্তে পরিতোষ বাবু বসে আছেন আকাশের বাবা ,মার্ কাছে একই হসপিটালের করিডোরে। আকাশ আর নেই ,আকাশের মা মিসেস পরিমল ভীষণ কাঁদছেন ,উনি পরিতোষ বাবুকে বললেন আমাদের অন্যায় হয়েছে এমন বৃষ্টি নামের মেয়ের সাথে আমাদের ছেলের সম্বন্ধ করায় ,যে মেয়ে ছোটবেলায় নিজের মাকে খেতে পারে ,সে যে আমার ছেলে আকাশকে ছাড়বে না আমাদের আগেই ভাবা উচিত ছিল ,বৃষ্টি নামের মেয়েরা সব অশুভ হয়। পরিতোষ বাবু উঠে এলেন ওখান থেকে বৃষ্টির ফিমেল ওয়ার্ডের দিকে ,ডাক্তার এসে বলে গেছেন অনেক্ষন পেশেন্ট ঠিক আছে ,বিশেষ চোট নেই তার মেয়ের শুধু হাতে একটু চোট ছাড়া।
বাবাকে দেখেই বৃষ্টি জানতে চাইলো আকাশ কেমন আছে বাবা ? পরিতোষ বাবু বললেন আকাশ আর নেই। বৃষ্টি ভয়ানক কান্নায় ভেঙে পড়লো ,পরিতোষ বাবু বললে শক্ত হ মা ,আমি তো আছি। কিছুক্ষন বাবার বুকে মাথা রেখে কাঁদবার পর বৃষ্টি আবার বললো তুমি কথা বলেছো আকাশের বাবা ,মার্ সাথে ? এইবার পরিতোষ বাবু কান্নায় ভেঙে পড়লেন বললেন ওনারা বললেন তুই অশুভ বৃষ্টি। বৃষ্টি হঠাৎ কেমন শান্ত হয়ে চেয়ে থাকলো ফিমেল ওয়ার্ডের জানলার বাইরে ,বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে খুব জোরে । এই সময় পরিতোষ বাবু ভাবলেন চুমকি ঠিক বলেছিল বৃষ্টি অশুভ আর একই সময় বৃষ্টি নিজের মনে ভাবলো একই কথা " বৃষ্টি অশুভ " ।
No comments:
Post a Comment