Wednesday, June 10, 2020

মানুষের বাঁচা


মানুষের বাঁচা 
..... ঋষি 

অরিন্দম মুখার্জি বললেন উপমকে  ওতো সময় দেওয়া যাবে না ,অতো সময় নেই ,তার আগে যে করে হোক চন্দ্রাকে সরাতে হবে।উপম অবাক হয়ে চাইলো একবার অরিন্দমের দিকে ,এই পৃথিবীতে অসম্ভব বলে সত্যি মানুষের কাছে কিছু নেই। সকাল সন্ধ্যে হাজারো মানুষ যেখানে দুটো ভাতের জন্য কুত্তার মতো এই শহরে দৌড়োয় সেখানে অরিন্দমের মতো কিছু হাই প্রোফাইল লোক শুধুমাত্র ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত।আর  উপমের মতো কিছু অসহায় লোক অরিন্দমের মতো লোকের জন্য কাজ করে ,কারণ পৃথিবীটা  বাইরে থেকে যতোই সুন্দর হোক না কেন , এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটা  অতো সহজ নয় সাধারণ মানুষের কাছে। 
          উপম উপাধ্যায় এই শহরের হাজারো মানুষের ভিতর খুব সাধারণ একটা  নাম। যার বেঁচে থাকা আর না থাকাতে পৃথিবীর কিছু আসে যাবে না ঠিক ,কিন্তু অদ্ভুত সে এখনো বেঁচে। উপমের মা ,বাবা মারা গেছেন আজ বহুযুগ ,পিসির কাছে মানুষ সে। বাবার মৃত্যুর পর সাতমাসে ভাড়া বাকি থাকার কারণে তাকে তার পুরোনো ভাড়া বাড়িটা ছেড়ে পিসির হাত ধরে রাস্তায় এসে দাঁড়াতে হয় ,সেই সময় তাকে বেশ কিছুদিন পিসিকে নিয়ে রাস্তার পরে থাকা  ম্যানহোলের ভিতর থাকতে হয়েছে। উপম তাই খুব ভালোভাবে বোঝে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা যতটা  কষ্টকর আরো  কষ্টকর ক্লাস নাইন পাস্ উপমের কাছে  পেটের জন্য একটা কাজ জোগাড় করা।  উপম বর্তমানে এজেন্টের কাজ করে ,না কোনো সংস্থা না ,মানুষের পাপের ভাগিদার হয় সে। 
                                  জানি এজেন্ট বলতে আপনাদের ইনসিওরেন্স এজেন্ট ,টিকিটের এজেন্ট কিংবা মেয়েদের এজেন্টের কথা মনে পড়ে ,কিন্তু উপম হলো অন্যরকম হাই প্রফাইল এজেন্ট  ,আসলে এজেন্ট নামটা তারই রাখা। ধরুন আপনি আপনার প্রেমিকের জন্য স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স চাইছেন কিন্তু কোনো কারণ  পাচ্ছেন না ডিভোর্সের কিংবা ধরুন আপনার বিবাহের অন্যতম কারন হলো মেয়েটার টাকা আছে  ,অথচ এখন আপনি সেই টাকার একলা মালিক হতে চাইছেন সুতরাং মেয়েটাকে সরানো দরকার এমন সব অজস্র কেসের সল্ভ করতে উপমের নামটা  আজকাল হাই প্রোফাইল সোসাইটির অন্দরমহলে ঘুরতে থাকে।উপমের নিজের কাজের একটাই নিয়ম টাকা ,যে বেশি টাকা দেবে কাজ তার।  উপমের নিজের কোনো অফিস নেই আছে ফোন নম্বর আর ভিসিটিং কার্ড যার উপরে লেখা ,উই সল্ভ ইউর প্রব্লেম বিকস প্রব্লেম ইস আওয়ার ফ্রেন্ড। এর জন্য উপমের অবশ্য অন্য কিছু সমাজবিরোধী ,মার্ডারারের সাহায্য নিতে হয়।
                       এই মুহূর্তে উপম অরিন্দম মুখার্জির পাঁচ তলার অফিসে বসে। অরিন্দম মুখার্জি শহরের অন্যতম একজন ব্যবসায়ী। তার জীবনে এই মুহূর্তে বিশেষ প্রব্লেম চন্দ্রা  যে কিনা অরিন্দমের প্রেমিকা। চন্দ্রা প্রেগনেন্ট এখন অরিন্দমের উপর চাপ তাকে বিয়ে করার ,এদিকে অরিন্দমের নিজের সাজানো সংসার ,দুই ছেলেমেয়ে। সুতরাং এখন অরিন্দম মুখার্জির কাছে একটাই সমাধান উপম যে একমাত্র চন্দ্রাকে অরিন্দমের জীবন থেকে সরাতে পারে। অরিন্দম চেকটা কেটে উপমের হাতে দিল ,উপম এসব কাজের জন্য পুরো টাকাটাই কাজের আগেই নেয়। 
                               রাত্রের টিভির  খবরে মাধ্যমে এতক্ষনে সারা শহরের বুকে খবরটা পৌঁছে গেছে  বারাসাতের কাছে  চন্দ্রা বলে এক কলেজ স্টুডেন্টের  ঘরে অরিন্দম মুখার্জি নামে এক কলকাতার বড় ব্যবসায়ের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। চন্দ্রাকেও  গ্রেফতার করা হয়েছে হাবড়ায় তার  মা বাবার কাছ থেকে। আরও চাঞ্চল্যকর খবর হলো চন্দ্রার অন্তস্বত্বায় থাকা সন্তান নাকি অরিন্দম মুখার্জির। পুলিশের জেরার মুখে চন্দ্রার কাছ থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী শহরের  সংবাদ মাধ্যম জানতে পেরেছে গত শনিবার রাত্রে অরিন্দম মুখার্জির  চন্দ্রার ফ্ল্যাটে যান এবং চন্দ্রাকে হত্যা করার চেষ্টা করেন ,কারণ অরিন্দম বহুদিন ধরে বিয়ের লোভ চন্দ্রাকে  দেখিয়ে নিয়মিত ধর্ষণ করেছেন। চন্দ্রার পেটে সন্তান আসার কারণে এইদিন  অরিন্দমের সঙ্গে চন্দ্রার মনোমালিন্য হয়  এবং সম্পূর্ণ মদ্যপ অবস্থায় অরিন্দম চন্দ্রাকে হত্যা করতে উদ্যত হয় এবং সেল্ফ ডিফেন্সে  চন্দ্রা একটা ভারী লোহার রড দিয়ে অরিন্দমের মাথায় আঘাত করে। 
      উপমের আজ খুব আনন্দের দিন ,সে  এখন ডিস্ট্রিক্ট জেলের দরজায় গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে চন্দ্রার অপেক্ষায়  ,চন্দ্রা আজ ছাড়া পাবে ১৫ দিন পর । কোর্টের রায় অনুযায়ী এটা প্রমাণিত যে চন্দ্রা সম্পূর্ণ নির্দোষ ,সেল্ফ ডিফেন্স চন্দ্রা অরিন্দমকে রড দিয়ে মারে ,এটা একটা ঘটনা মাত্র মার্ডার নয়। চন্দ্রা যেহেতু অরিন্দমের সন্তানের মা সেই কারণে চন্দ্রাকে  কোর্ট অরিন্দম মুখার্জির অর্ধেক সম্পত্তির মালিক ঘোষণা করেছে। 
                             আসলে উপম এতদিন এই সব  কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিল ,তাই সে বহুদিন ধরে ভাবছিল এমন একটা কিছু করার যাতে তাকে ভবিষ্যতে আর সাধারণের মতো খিদের জন্য কাঁদতে না হয়। অরিন্দম মুখার্জিকে সে চিনতো অনেকদিন ,লোকটার অনেক টাকা আর  কম বয়সী মেয়েদের প্রতি একটা খুচখুচানি আছে।  চন্দ্রা তার চেনা সেই সব বিশ্বাসী  মেয়েদের একজন যে উপমের  জন্য সব কিছু করতে পারে।উপম চন্দ্রাকে কথা দিয়েছিল এই একটা কাজের পর চন্দ্রাকে আর কারোর সাথে শুতে হবে না ,সে রানী হয়ে যাবে। এই সময় পৃথিবীর নেপথ্যে হাসছেন ঈশ্বর আর উপম ঈশ্বরের মতো হাসছে তার সৃষ্ট শেষ দেড় বছরের একটা গল্পের শেষাংশে দাঁড়িয়ে। কিন্তু বিশ্বাস করুন উপমের জানা ছিল না চন্দ্রাও যে একটা আলাদা নাটক সাজিয়ে রেখেছে উপমের জন্য। আসলে এই পৃথিবীটা  বাইরে থেকে যতোই সুন্দর হোক না কেন , এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটা  অতো সহজ নয় ,
সারাক্ষন একটা হারজিত চলছে মানুষের বাঁচায়।     

No comments:

Post a Comment