Friday, July 3, 2020

আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ

আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ
....ঋষি 
.
এই ত পায়ে চলার পথ। 
.
 এসেছে সময়ের   মধ্যে দিয়ে , আকাশের  মধ্যে দিয়ে নদীর ধার ঘেঁষে , খেয়া-ঘাটের পাশে বটগাছ-তলায়। তার পরে ওপারের ভাঙা ঘাট থেকে বেঁকে চলে গেছে গ্রামের মধ্যে; তার পরে ধানের  ক্ষেতের ধার দিয়ে, আমবাগানের ছায়া দিয়ে,রথতলার পাশ দিয়ে কোন্ গাঁয়ে গিয়ে পৌঁছেচে জানি না ।অজস্র প্রশ্ন উত্তর এই জীবনে ,অজস্র পথচলা ,অজস্র গভীর কোলাহল ,অজস্র যোগ বিয়োগ।  মানুষের চলার পথের ,হাজারো পথ চলা ,হাজারো স্মৃতি এই সব ভাবছিল এই গল্পের নায়ক এবং পেশাদার পত্রিকার রিপোর্টার  প্রশান্ত।তার মনে পড়ছিল তার স্ত্রী অনুরাধার কথা ,যার সাথে তার ডিভোর্স প্রায় পাকাপাকি , অনুরাধা এখন  প্রশান্তর  এক বন্ধু অনুরাগের সাথে  লিভ ইন এ আছে । প্রশান্ত অনুরাধাকে দোষ দিতে পারে না তাদের সম্পর্কের কারণে ,প্রশান্ত তার এই রিপোর্টারের চাকরির জন্য মোটেও সময় দিতে পারতো না অনুরাধাকে ,তারপর কি করে যেন তার অনুপস্থিতিতে অনুরাধার সম্পর্কটা তৈরী হয় অনুরাগের সাথে। তবে অনুরাধা কোন রাখা ঢাকা করে নি ,যাবার দিন শুধু প্রশান্তকে একটা ফোন করে বলেছিল তুমি মানুষ খারাপ না কিন্তু তোমার সাথে কোনো মেয়ে বিয়ে করে সংসার করতে পারবে না ,ভালো থেকো ,আমাকে ফেরাবার চেষ্টা কোরো না।
.
 প্রশান্তকে একটা প্রতিবেদন লিখতে হবে তার পত্রিকার ভারত ও বাংলাদেশের আন্তর্দেশীয় সম্পর্ক নিয়ে।সে কারণে সে আজ কিছুদিন ধরে চৈতালি বলে  গ্রামটায় এসে উঠছে। গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে পদ্মা নদী নিজের  খেয়ালে  ,বর্ষার নদী তাই পদ্মার রূপ এই সময় দেখার মতো। প্রশান্ত সারা দিন পাশের বর্ডার সিকিউরিটির অফিসে ঘোরাঘুরি করে ,খোঁজ খবর জোগাড় করে ,রাতে এই পদ্মার পাশে একটা গর্ভমেন্ট অফিসের গেস্ট হাউসে থাকে ,তার কাজ প্রায় শেষের দিকে।  প্রশান্তর এই মুহূর্তে যেন পদ্মার জলের দিকে  তাকিয়ে হারিয়ে যাচ্ছিল স্মৃতিতে ,বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল খুব জোরে ,হঠাৎ ঘোর ভাঙলো ঝিমলির গলার স্বরে ,ঝিমলি বলছে বাবু বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে খুব  জোরে ,বিছানা পত্তর ভিজে যাওয়ার জোগাড় ভিতরে আসুন। এই অঞ্চলে এখনো তেমন করে ক্যারেন্ট আসে নি ,তাই প্রশান্তর ঘরে লণ্ঠন জ্বলছে। প্রশান্তর ঘরে ঢুকলো ,ঝিমলি বললো  এমা জামাটা পুরো ভিজে গেছে ,বলে দৌড়ে কথা থেকে তোয়ালে নিয়ে এলো ,তারপর ভীষণ তাড়াহুড়োতে অন্ধকারে  হোঁচট খেয়ে গিয়ে পড়লো প্রশান্তর গায়ের উপর। বাইরে তখন ভীষণ শব্দ করে একটা বাজে পড়লো ,ঝিমলি ভয় পেয়ে ঢুকে গেলো প্রশান্তর বুকে। 
.
এই গেস্ট হাউসে লোকজন কেউ নেই ,একমাত্র প্রশান্ত হলো একমাত্র আবাসিক।এখানে আসার পর প্রশান্ত জেনেছে বর্ষাকালে এই গেস্টহাউসে কেউ আসে না ,শীতকালে কিছু গর্ভমেন্ট অফিসার আসেন।লোক বলতে এই গেস্ট হাউসে  একটা বিহারি দারোয়ান গেটে, এক রান্নার বুড়ো প্রসন্ন দা আর ঝিমলি প্রসন্ন বুড়োর বউ। ঝিমলি মেদিনীপুরের মেয়ে ,গরীবের সন্তান তাই বাধ্য হয়ে তার বাবা মা তাকে ঝুলিয়ে দিয়েছে প্রসন্নদার গলায়। ঝিমলির বয়স মোটামুটি বাইশ ,চব্বিশের মতো ,গেস্টহাউসে কেউ এলে তার ফাইফরমাশ খাটে ,আর ভীষণ কথা বলে। প্রশান্ত ঝিমলির মুখ থেকেই জেনেছে প্রসন্ন দা নাকি দারুন রান্না করে ,ঝিমলিকে ভালোবাসে কিন্তু ঝিমলির ভালো  লাগে না এখানে ,তার শহর দেখার খুব ইচ্ছে,সে নাকি স্বপ্নে দেখেছে কলকাতায় মোটরগাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। 
.
প্রশান্ত সরাতে চেষ্টা করছিল ঝিমলিকে ,আবার একটা বাজ পড়লো ,ঝিমলি জড়িয়ে ধরলো প্রশান্তকে। প্রশান্ত ভিজে গায়ে প্রায় লেপ্টে ছিল ঝিমলি ,সে প্রশান্তকে বলছিল শান্তি ,বাবু শান্তি আর কিছু না আমাকে সরাবেন না ,আমাকে নিয়ে নিন আপনি ,যা খুশি করুন ,আমি যে আর পারছি না। প্রশান্ত কি করবে বুঝতে পারছিল না ,আজ প্রায় আট মাস অভুক্ত সে,অনুরাধা কি ভেবেছে তার কথা কোনোদিন,তাকে ছেড়ে তো বেশ মস্তি করছে সে রাস্কেল অনুরাগের সাথে। প্রশান্ত হঠাৎ চেপে ধরলো ঝিমলির চুলের মুঠি ,বিছানায় ফেলে পাগলের মতো সে আদর করছিল ঝিমলিকে ,ঝিমলির মুখে সেই সময় শুধু শোনা যাচ্ছিল শুধু একটা শব্দ " শান্তি "। ক্রমশ তুমুল ঝড় ওঠার পর প্রকৃতি যেমন করে শান্ত হয় ,ঠিক তেমন করে প্রশান্ত একসময় লুটিয়ে পড়লো ঝিমলির খোলা বুকে। ঝিমলি বললো বাবু কি শান্তি ,কতদিন পর কেউ আমাকে ছুঁলো। প্রশান্ত চমকে উঠে ঝিমলির মুখের দিকে তাকালো আর ঠিক এই সময় প্রায় দরজার কাছে শোনা গেলো প্রসন্ন দার গলা এই ঝিমলি কি রে মাগি কই তুই ,ঠিক জানি নিশ্চয় মাড়াতে  গেছিস ,যদি মাড়ানো হয়ে গিয়ে থাকে ঘরে চল ,ভাত যে খোলা পরে আছে। ঝিমলি এক ঝটকায় প্রশান্তকে  সরিয়ে  গায়ের শাড়িটা টেনে নিল। 
.
আজ প্রশান্ত  ফিরে চলেছে কলকাতায় ,কাল রাতের ঘটনার পর সে আর মুখোমুখি হতে চাই নি ঝিমলির।কাল রাতে ওই ঘটনার পর অনুরাধাকে প্রশান্ত  ফোন করে জানিয়েছিল সব কথা ,অনুরাধা তাকে বললো তুমি এতো ভেঙে পড়ছো কেন ,তুমি না পুরুষ মানুষ আর পুরুষ মানুষের তো আলাদা একটা খিদে থেকেই যায় ,এ আর নতুন কি ,তারপর বলেছিল ঝিমলিকে কিছু টাকা দিয়ে আসতে। প্রশান্ত ব্যাপারটা মানতে পারে নি তাই সকাল হওয়ার আগেই সে গেস্টহাউস থেকে চেক আউট করেছে সে আর রুমের বিছানায় অনুরাধার   কথা মতো  কিছু টাকা আর একটা চিঠি রেখে এসেছে ঝিমলির নামে ,যাতে লেখা 
.
ঝিমলি ,
.
আমি জানি না তোমার কাছে কি করে ক্ষমা চাইবো কালকের ঘটনার জন্য। তোমাকে আমি ভালোবাসি না ,ভালোবাসি আমার স্ত্রী অনুরাধাকে।আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে আমার বন্ধুর সাথে।  কাল রাতে কি হয়েছিল আমার জানি না অনুরাধার উপর রাগ করে আমি তোমার শরীরটা ছিঁড়ে খুঁড়ে দিতে চেয়েছিলাম। ঝিমলি আমি জানি তুমি ভালো মেয়ে ,জানি আমাকে ক্ষমা  করবে তুমি। সঙ্গে কিছু টাকা রাখা আছে তুমি প্রসন্নদাকে সঙ্গে নিয়ে একবার কলকাতা ঘুরে এসো। জানি না দেখা হবে কিনা আবার ,ভালো থেকো। 
.
ইতি 
প্রশান্ত 
.
এই মুহূর্তে প্রশান্তর  ভ্যানটা এগিয়ে চলেছে পদ্মার পার ঘেঁষে মাটির রাস্তা ধরে। রাস্তাটা চলে গেছে যদি পাড় ধরে বহুদূর। প্রশান্ত  ভাবছিল মানুষের জীবন মানুষেকে কখন কোথায় নিয়ে যায় ,কোন রাস্তায় মানুষের  কে দাঁড়িয়ে থাকে ,সবটাই অনিশ্চিত। প্রশান্ত ভাবছিল মুহূর্তরা চিরকাল এমনি স্মৃতি হয়ে থাকে প্রতিটা মানুষের কাছে। প্রশান্তর মনে পড়ছিল ঝিমলির মুখটা ,আর ঝিমলির চরম সুখের মুহূর্তের শব্দটা " শান্তি "। বড়ো অদ্ভুত মানুষ প্রসন্ন দা ,ঝিমলি ,অনুরাধা সকলেই কত স্বচ্ছ  ,কত সহজে সত্যিগুলো বলতে পারে ,আর প্রশান্ত ভাবছিল নিজের কথা। হঠাৎ এক মুঠো পদ্মার নোনা  হাওয়া প্রশান্তর মুখে লাগলো ,প্রশান্ত গেয়ে উঠলো 
.
" আমার এই   পথ-চাওয়াতেই   আনন্দ।
খেলে যায়   রৌদ্র ছায়া,   বর্ষা আসে   বসন্ত ॥"

No comments:

Post a Comment