Tuesday, July 7, 2020

মেঘে ঢাকা মানুষ

মেঘে ঢাকা মানুষ

….. ঋষি 

হ্যালো ,হ্যা ভালো আছি ,হ্যা আমার ফিরতে আরো দুদিন। তুমি কেমন আছো ? তিতির ঘুম থেকে উঠেছে ?  মিস্টার মিত্ৰ ফোনটা রাখলেন। অনিমেষ মিত্র

একটি বড় রিয়েলষ্টেট কোম্পানির পদে আছেন ,তার কাজ সারা ভারতবর্ষ ঘুরে বিভিন্ন হোটেল কিংবা রিসোর্টের জন্য জমি দেখা। এইবার সেই উদ্দেশ্যে অনিমেষ  এসেছে মুন্সিয়ারি ,সমতল থেকে এই জায়গাটা প্রায় ২৪০০ মিটার উপরে,মুন্সিয়ারিকে কুমায়ুন পাহড়ের রানি বললে অত্যুক্তি হবে না।তার সাথে উপল বলে একজন অফিসে নতুন জয়েন্ট করা ছেলে এসেছে। এই জায়গাটা আসার পর অনিমেষের এই  প্রথম বার মনে হচ্ছে সে ঈশ্বরের কাছাকছি আছে। চারপাশে এতো নিস্তব্ধ ,এই পরিষ্কার আকাশ ,ঠান্ডাটা কলকাতার লোকেদের জন্য মারাত্নক রকম বেশি হলেও অনিমেষের বেশ ভালো লাগছে। অফিস থেকে থাকার জন্য সামনেই একটা ছোট বাংলো বুক করে দেওয়া হয়েছে অনিমেষ আর উপলের জন্য। রাতে সেই বাংলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ের এই পৃথিবীটাকে মনে হয় আকাশের জ্বলতে থাকা তারা গুলোর খুব কাছে।

 .

অনিমেষ আর উপলের হোটেলে আলাদা ঘর থাকা সত্বেও অনিমেষের জোড়াজুড়িতে উপল অনিমেষের ঘরেই আছে। আসলে কি এই নিস্তব্ধ জায়গায় একলা থাকাটা অনিমেষের জন্য খুব মারাত্নক ,যত সব একলা চিন্তাগুলো চেপে ধরে ,যেগুলো থেকে অনিমেষ চিরকাল পালাচ্ছে।অনিমেষের কতগুলো বিচ্ছিরি স্বভাবের মধ্যে একটা হলো সে অতিরিক্ত সিগারেট খায় এবং ড্রিংক করে কিন্তু উপলের আবার সিগারেট আর মদ্য পান দুটোতেই অরুচি। অনিমিষে রাম ঘেঁষা বারান্দা থেকে এসে  তার তিন নম্বর পেগ্টা বানাতে বানাতে দেখলো উপম ফোনটা নিয়ে কাকে যেন বারংবার ট্রাই করছে,একটু টেনস্ট মনে হলো তাকে ।

.

অনিমেষ বললো তোমাদের জেনারেশনের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা কি জানো ,তোমরা ফোনটাকে জীবন মনে করো,মনে করো সম্পর্কগুলো সব ফোনের ভিতর।

.

উপল  খুব বিরক্ত হয়ে বললো আপনি কি সব জানেন মশাই ,আমি কাকে ফোন করছি আপনি  জানেন।

 অনিমেষ বললো না বললে জানবো কি করে  ? হাওড়া স্টেশন ছাড়ার পর থেকে দেখছি তুমি ফোনের ভিতর ,তারপর অনিমেষ মদের গ্লাস দেখিয়ে বললো ,আজ একটু খাও বুঝলে ,মন হালকা হবে। অনিমেষ একটা পেগ বানিয়ে দিল উপলকে। দুজনে বাংলোর বারান্দায় গিয়ে বসলো মুখোমুখি।

অনিমেষ একটা সিগারেট ধরিয়ে উপলকে বললো কেন এতো ব্যস্ত হচ্ছো ,আর তো দুদিনের কাজ,আর প্রেম তো ,বিয়েটা  করে নেও ,মিটে যাবে সমস্যা। 

উপল  বললো স্যার তাকে একলা ফেলে এসেছি কলকাতায় ,গ্রামের মেয়ে ছন্দা ,বাড়ির অমতে বিয়ে ,ওতো কলকাতায় কিছু চেনে না।  আসলে ছন্দা এখন সন্তান  সম্ভবা , তিনমাস পরে ওর ডেলিভারি।  ।নতুন চাকরি ,কোনো রকম এক্সকিউস  দেখাতে চাই নি ,চলে এলাম আপনার সঙ্গে ,   খুব চিন্তা হচ্ছে জানেন। অনিমেষ লক্ষ্য করলো ছন্দার সম্বন্ধে বলা কালীন উপলের চোখমুখ কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। অনিমেষে দেখছিল  উপলের স্ত্রী সন্তান সম্ভবা ,এই কারণে উপলের ভিতরে একটা শংকা আর আগামীর সন্তানের জন্য আনন্দ দুটোই  কেমন এই মুহূর্তে ঝলকে উঠছে উপলের চোখেমুখে।

.

তারপর উপল  বললো আপনার কথা বলুন কিছু ,বৌদি ,ছেলে মেয়ে ?

অনিমেষ আরেকটা পেগ বানাতে বানাতে অন্ধকারে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে বললো আমি যখন তোমার মতো বয়সে চাকরিতে যোগ দিলাম তোমার মতো বিয়ে করেছিলাম তিতিরকে ,কলেজে আমার থেকে দুবছরের ছোট। বিয়ের পর বেশ চলছিল বুঝলে তারপর তিতির প্রেগনেন্ট হলো ,আমরা খুব চেষ্টা করেছিলাম ,কিন্তু নষ্ট হয়ে গেলো বাচ্চাটা ,ডক্টর বললো তিতির আর মা হতে পারবে না,আর সেদিন থেকে তিতির বদলে গেলো। হাজারো সাইক্রিয়াটিস্ট দেখলাম ,কিছু হলো না ,তিতির নিজের মেজাজ ধরে রাখতে পারে না ,অল্পতে রেগে গিয়ে হাতের কাছে যা থাকে ছুঁড়ে মারে। তবু আমি পালাই নি ,চেষ্টা করেছি সংসারটা ধরে রাখতে। আমি আজ ত্রিশ বছর চাকরি করে যা জমিয়েছি তাতে এই  ছাপান্ন বছর বয়সে চাকরি না করলেও হয় ,কিন্তু আমি চাকরিটা ছাড়ি নি কেন জানো। আমিও যে মানুষ ,আমার মাঝে মাঝে পালাতে ইচ্ছে হয় ,যেমন এই যে এইখানে আমি তো পালিয়েই আছি কয়েকদিন নিজের সাথে।বাড়িতে লোক বলতে আমি ,তিতির আর আমার এক বৃদ্ধা আত্নীয় কনক দি ,অনেকদিন আছে আমাদের সাথে। তার কাছে তিতিরকে রেখেই আমি পালাই এমনি একটু নিশ্বাস নিতে। কথা বলতে বলতে অনিমেষ আরেকটা পেগ বানাচ্ছিল,উপম বললো আর না স্যার ,অনিমেষ প্লিজ একটা লাস্ট পেগ।

 .

                    আজ সকালটা খুব সুন্দর  ,নীল আকাশটা পুরোপুরি মেঘে ঢাকা ,অথচ হিমালয়ের উপর একটা অদ্ভুত রৌদ্র পড়েছে ,খুব সুন্দর লাগছে এখন প্রকৃতিটা।   আজ সকাল সকাল তারা বেড়িয়ে পড়েছে মানসুরি বাজারের কাছে একটা প্লট দেখতে।বেশ কিছু প্লট তাদের দেখা হয়ে গেছে ,এইবার শুধু কাল তাদের ফাইনাল করতে হবে ,কোন জায়গাটা তাদের রিসোর্টের জন্য আদর্শ। উপল এক মনে ছবি তুলে যাচ্ছে ,গাড়ি চলছে পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে এঁকেবেঁকে সাপের মতো। প্রায় দুঘন্টা চলার পর তারা তাদের দেখতে আসা প্লটটায় পৌঁছল। পাহাড়ের ধরে হিমালয়ের পঞ্চচুল্লিকে সামনে রেখে এই জায়গাটা। দেখেই অনিমেষ বুঝলো তার দেখা জায়গা গুলোর মধ্যে এটাই বেস্ট।উপল এক মনে ছবি তুলছিল পাহাড়ের একদম ধারে দাঁড়িয়ে ,সে হয়তো এই হিমালয় পাহাড়টাকে নিয়ে যেতে চাইছিল ক্যামেরা বন্দি করে তার সন্তানসম্ভবা  স্ত্রী ছন্দার জন্য।

.

অনিমেষ এই মাত্র হাওড়ায় এসে পৌঁছল ,সঙ্গে করে সে নিয়ে এসেছে উপলের নিথর শরীরটা কফিনের বন্দি করে। অনিমেষ আগে থেকে ফোন করে দিয়েছিল অফিসে ,অফিসের সব কলিগরা স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল আর দাঁড়িয়ে ছিল উপলের  পরিবার। স্টেশনে নামা মাত্র সবার আগে এগিয়ে এলো একটা প্রেগনেন্ট  নেপালি মেয়ে ,অনিমেষ বুঝলো এই মেয়েটি ছন্দা ,আর কারণটাও বুঝলো কেন উপলের বিয়েটা ওর পরিবার কেন  মেনে নেয় নি। অনিমেষ ছন্দাকে বললো বাঁচাতে পারলাম না ,চোখের সামনে জলজ্যান্ত ছেলেটা পাহাড়ের খাদ থেকে পরে গেলো।

.

অনিমেষ এই মুহূর্তে অফিসের এসি  গাড়িতে চেপে বাড়ি ফিরছেএতক্ষন ট্রেন জার্নির   ক্লান্তিতে  অনিমেষের চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল  অনিমেষ চোখ বন্ধ করে তলিয়ে যাচ্ছিল  গভীর ভাবনায়,তার চোখের সামনে চলে আসছে সেই দৃশ্যটা ,  উপল দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের ঢালে ,তার হাতে ক্যামেরা,একমনে ছবি তুলছে ছেলেটা,একটা ছোট্ট ধাক্কা শরীরটা তলিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ে ,পাহাড়ের খাদের পাশে উপরে দাঁড়িয়ে অনিমেষ হাসছে পাগলের মতো একটা ব্রেক মেরে গাড়িটা ট্রাফিকে দাঁড়িয়ে পড়লো ,ঘুমটা আচমকা ভেঙে গেলো অনিমেষের অনিমেষের মনে পড়ছিল তিতিরের মুখটা ,আর সেই কান্নাটা যখন তিতির জেনেছিল সে আর মা হতে পারবে না কখন যেন আনমনে অনিমেষের চোখের সামনেটা ঝাপসা হয়ে যাচ্চিল 


No comments:

Post a Comment