Thursday, June 25, 2020

নিস্তব্ধতা

নিস্তব্ধতা 
... ঋষি 

গুগুলে সার্চ মারলে সব পাওয়া যায় ,অথচ এমন কিছু ঘটে এই পৃথিবীতে তার কারণ গুগুল বাবাজি উত্তর দিতে পারে না। যেমন ধরুন আপনি গুগুলে সার্চ মেরে বারুদ তৈরির পদ্ধতি জানতে পারেন ,জানতে পারেন কি ভাবে মারণবোমা তৈরী হয়  অথচ ভোলার বাবা প্রতিদিন রাতে তুমুল নেশা করে এসে ঠিক মিত্তির বাড়ির সামনে  ছড়া বলে 
.
 " যেদিন যায় সেদিন ভালো 
ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো "। 
 .
                     এর কারণ কি ? গুগল বাবাজি বলতে পারেন না। ভিতর দিয়ে তনয়ার বিধবা  শ্বাশুড়ি কমলা মিত্তির চিৎকার করেন মরণ ,বুড়ো ঢ্যামনা রাত হলে রস জাগে। তারপর সদ্য একবছর বিয়ে হওয়া ছেলে প্রবীরের বউকে বলে দেখো তো ,যবে থেকে তোমাদের বিয়ে হয়েছে ,তবে থেকে ঢ্যামনাটা বাড়ির সামনে এসে কবিতা বলে। প্রবীর তার অফিসের কম্পিউটারে কাজ করতে করতে ভাবে সত্যি ভোলার বাবার এমন আচরণের কারণ যদি জানা যেত। 
  .
সময় কাটে মিত্তির বাড়ি পুরোনো হয় ,ঋতু বদলায় পল্টুর দোকানের সামনের কুকুরের বাচ্চাগুলো এখন সারা পাড়া জুড়ে রাতের বেলায় চিৎকার করে। ভোলার বাবা মারা গেছেন আজ এক বছর ,তবে লোকটা মরবার আগেরদিন অবধি মিত্তিরদের ভালোবেসে ছড়া শোনাতে ভোলেন নি। শাশুড়ি কমলা মিত্তির এখন প্রায় অসুস্থার কারণে বিছানায় থাকেন আর তনয়া এখন চিৎকার করে প্রবীরের প্রতি আমাকে কি কাজের ঝি পেয়েছো ,তোমার মার্ গুমুত কাঁচাবার জন্য আমাকে বিয়ে করেছিলে ,মুরোদ তো তোমার জানা আছে। প্রবীর মুখ বুজে অফিসের কাজের বাহানায় কম্পিউটারে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে আর ভাবে যদি গুগুল বাবাজি সত্যি কিছু উপায় বলতে পারেন। 
.
তনয়া মিত্তির রূপে ,গুনে অধিকাংশ বাঙালি মহিলার থেকে সুন্দরী ,তার রূপ আর গুনের কাছে প্রবীর কিছু নয়। তুবু তনয়ার বাপের বাড়ির শিক্ষা তাকে প্রশ্ন করতে  শেখায় নি ? শিখিয়েছে সহ্য করতে। তনয়া আজ প্রায় দশ বছর ধরে সহ্য করছে এই মিত্তিরের ফ্যামিলিকে।সদ্য কলেজ পাশ করে এই পৃথিবীতে তনয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল ,তার গানের গলা ভালো ,ভালো আবৃত্তি করতো সে কিন্তু তার সমস্ত স্বপ্ন  চিতায় দিতে হয় তার পরিবারের ইচ্ছেতে তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। তবু তনয়া মেনে নিয়েছে ,এমনি প্রবীর ছেলে হিসেবে খারাপ না ,তবে মায়ের ন্যাওটা। তবুও তনয়া মানিয়ে নিয়েছিল ,কিন্তু বিয়ের সাত বছরের মাথায় তার স্বামীর সাথে চম্পা বলে কোনো মেয়ের সম্পর্কের কথা সে জানতে পারে। প্রথমে হজম করতে পারে নি কিন্তু ক্রমশ শাশুড়ির কাছ থেকে বারংবার  বাজা,পাড়ার লোকেদের কাছ থেকে  আরো অনেক বাজে উক্তি শুনতে শুনতে তনয়ার মাথাটাই বিগড়ে গেলো। আজকাল সে আর কাউকে এই মিত্তির ফ্যামিলির সহ্য করতে পারে না ,অল্পতেই রেগে যায়। 
.
প্রবীরের বাবা মারা যায় ছোটবেলায় ,মায়ের কাছে মানুষ। ছোটবেলা থেকে অনেক কষ্ট করে তার মা তাকে পড়াশুনা করিয়েছে ,এর জন্য প্রবীরকেও কম কষ্ট করতে হয় নি। তারপর তার জীবনে হঠাৎ আলোর মতো তনয়ার প্রবেশ। প্রবীর জানে সে কোনো মতো তনয়ার যোগ্য নয়।  বিয়ের প্রথম রাতে সে ভেবে পাচ্ছিল না কি ভাবে সে তনয়ার মতো সুন্দরী মেয়েকে স্পর্শ করবে। তার আগে কয়েকবার সে চম্পাকে স্পর্শ করেছিল কিন্তু সে কোনো মতেই তনয়ার যোগ্য নয়। চ্ম্পা  পাশের পাড়ার রতন দার বৌ ,তার সমসাময়িক বয়স কিন্তু প্রবীরের জীবনের সে অন্যতম ভুল। প্রবীর বিয়ের পর চম্পার  থেকে সরতে শুরু করেছিল কিন্তু চ্ম্পা সরতে দিতে চাই নি। প্রায় ব্ল্যাকমেল করে বাধ্য করেছে বিয়ের পরে বেশ কিছুবছর তার সাথে থাকতে। যা হওয়ার ছিল প্রবীরের তাই হয়েছে জীবনে ,তনয়া জানতে পেরেছে এবং প্রবীর তনয়াকে মিথ্যা বলতে পারে নি ,তার উপর এতো বছর বিয়ের পর তাদের কোনো সন্তান হয় নি। ডাক্তার রিপোর্টে পাওয়া গেছে প্রবীরের সমস্যা আছে। 
আজকাল তো তনয়া মোটেও প্রবীরকে  সহ্য করতে পারে না ,যখন তখন যা তা বলে তাকে অপমান করে। তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই আর পাশে থাকা টুকুও ফুরিয়ে গেছে। 
.
প্রবীরের মা মারা গেছেন গত সপ্তাহে। বেশ কিছু দিন ধরে তনয়ার শরীর ভালো যাচ্ছে না ,হঠাৎ হঠাৎ বমি বমি পাচ্ছে। তনয়া আসতে চায় নি ,তবুও প্রবীর জোর করে তনয়াকে নিয়ে এসেছে তাদের ফ্যামিলি ডাক্তারের কাছে।মায়ের কাজ আর মনের চাপটা তো তনয়ার উপর দিয়ে কম যাচ্ছে না।  সমস্ত ডাক্তারি পরীক্ষা করার পর  ডাক্তার জানালেন তনয়া প্রেগনেন্ট। এটা শোনার তনয়া লক্ষ্য করলো পরই হঠাৎ করে সেই মুহূর্তে প্রবীরের মুখে  একটা রাগ জন্মাল আর তারপরই কেমন একটা স্বাভাবিক ভাবেই প্রবীর তনয়াকে জড়িয়ে ধরলো।
   .
এখন প্রায় মধ্যরাত, মিত্তির বাড়ির ভিতর থেকে শোনা যাচ্ছে একটা বাচ্চার কান্না।একই সময় মিত্তির বাইর   সামনে দাঁড়িয়ে ভোলা প্রচন্ড মদ খেয়ে তার বাবার মতো  চিৎকার করে ছড়া বলছে 
 " ভাবের ঘরে কাগের বাসা  
ব্যাঙের ঘরে মানিক ,
যেদিন যায় সেদিন ভালো 
ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো "। 
মিত্তির বাড়ির ভিতর থেকে প্রবীর চিৎকার করছে মরতে পারিস না ভোলা ,প্রতিদিন আমার বাড়ির সামনে এসে কেন চিৎকার করিস ? তনয়া একমনে কম্পিউটারে গুগুল সার্চে  ছেলের পেটে ব্যাথার কারণ খুঁজতে খুঁজতে বললো 
মরণ ,তবু যদি তোমার মুরোদ থাকতো। প্রবীর ভাবছে সত্যি যদি গুগুলে সার্চ মেরে জানা যেতএই বাচ্চাটার জন্মের কারণ।
.
 প্রবীর কোলে তুলে নিলো তার ছেলেকে ,আদর করে গালে চুমু খেয়ে বললো তনয়া একটু তাড়াতাড়ি দেখো না ,খুব কাঁদছে বাবু। প্রবীর বাইরে থেকে এইসময় পাড়ার কুকুরগুলো চিৎকারের শব্দ পায় ,তারপর হঠাৎ সময়টার মতো সেও  মেনে নেয় নিস্তব্ধতা,ছেলেটা শান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে এখন। 

Sunday, June 21, 2020

ডিপ্রেশন


ডিপ্রেশন

... ঋষি

                                      

দুমাস ধরে বাড়ি ভাড়া বাকি তুমি বলছো জামা কাপড় ধুই  কিনা ,চাকরিটা থাকলে হয় ,বস  মাদারির বাদর করে নাচাচ্ছে ছুটির দিনগুলোতেও শান্তি নেই ,এখন রাখছি অফিসে যেতে হবে ,এই বলে ফোনটা কেটে দিল অরিত্র ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো .৩০ ইশ দেরি হয়ে গেলো ঈপ্সিতার সাথে কথা বলতে বলতে  ,অরিত্রকে আজ পৌঁছতেই হবে অফিসে .০০ টায়ঈপ্সিতা হলো অরিত্রের বউ ,বাবা মায়ের সাথে মেদিনীপুর থাকে অরিত্র ঘর ভাড়া করে কলকাতায় থাকে চাকরি সূত্রে  ,সে একটা সেলসের অফিসে কাজ করেমেদিনীপুরে অরিত্রের পূর্বপুরুষের বাস ,মা ,বাবা দুজনেই অসুস্থ ,অরিত্র একমাত্র সন্তান তাদের ,বাবা ,মাকে   দেখাশোন করতে ঈপ্সিতা ওখানেই থাকে ,মাসের মধ্যে চারদিন অরিত্র গ্রামে যায় ঈপ্সিতা ওই গ্রামেরই মেয়ে ,সে ওখানে সব সামলে নেয় শুধু অরিত্রের মাঝে মাঝে মন খারাপ করে ,সে মনে মনে ইপ্সিতাকে কলকাতায় এনে রাখতে চায় ,কিন্তু বাবা ,মার্ কথা ভেবে আর হয়ে ওঠে না

.

              অরিত্র অফিস পৌঁছলো কুড়ি মিনিট  লেট্ করে,একে তো নিজের রান্না করা , নিজের টিফিন প্যাক করা থেকে সবটাই তার নিজেকেই করতে হয় ,তার উপর কলকাতার জ্যাম অফিস ঢোকা মাত্র প্রিয়াঙ্কা ডেস্ক থেকে ফোন করে বললো বস ডেকেছে অরিত্র পড়িমরি করে ছুটলো বসের ঘরে ,দরজা টোকা দিতেই  মিস্টার চিন্তন বলতেই প্লিজ কাম ,তারপর নিজের স্বভাবচিত মাড়োয়ারি ভঙ্গিতে বললেন অরিত্র তুমহারা সেলস রিপোর্ট ম্যা দেখা লাস্ট মান্থকা  ,নাথিং ইম্প্রোভ ,আপ এক কম কিজিয়ে ব্যাক অফিসমে শিফট হো যাইয়ে ,অরিত্র উঠে পড়ছিল চেয়ার থেকে ,তিনি আবার যোগ করলেন হ্যা অরিত্র তুম্হারে মাফিক এক কাম  হ্যা, মিস্টার গোলদার  হামলোগোকে মুম্বইকাইকে ক্লাইন্ট ,উনকি  ওয়াফ পার্ক হোটেলমে রুকি হুয়ি হ্যা ,তুম অভি চলে যাও ,উনকে সাথে রহো ,ঊনকো কলকাতা ঘুঘুমানা  হ্যা তুম সাথ রহো অরিত্র আবার চেয়ার থেকে উঠছিল মিস্টার চিন্তন বললেন ওর হ্যা শুনো উনসে জাদা বাত করনেকা জরুরত নেহি হ্যা কিঁউকি ম্যা নেহি চাহাতা মেরি কোম্পানিমে  কোই ইডিয়েট কাম করতা হ্যা উনহে পতা চলে,মিসেস গোলদার জো বলে ওহি শুননা 

.

অরিত্র বেজার মুখে অফিস থেকে বেরিয়ে এলো তার শুধু মনে পড়ছিল বসের মুখটা যখন বস বলছিল  কিঁউকি ম্যা নেহি চাহাতা মেরি কোম্পানিমে  কোই ইডিয়েট কাম করতা হ্যা উনহে পতা চলে,অরিত্রর ইচ্ছা করছিল একটা ঘুরিয়ে ঘুষি মারে বসের মুখে অফিসের চাপে তার মাঝে মাঝে পাগল পাগল লাগে ,আর তার বস তাকে দিয়ে কি না করায় ,পারলে টয়লেটটা তাকে পরিষ্কার করতে বলে কিন্তু কি করবে অরিত্র  ? গ্রামের সংসার ,নিজের খরচ তার  পুরোটাই চলে তার এই চাকরি থেকে সে মাঝে মাঝে ভাবে সে কি ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে আজকালকার প্রজন্মের মানুষের কাছেডিপ্রেশনশব্দটি বহুল প্রচলিত এই ডিপ্রেশনের সঠিক সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা অরিত্রের কাছে  নেই অরিত্র কোথাও পড়েছিল  মনের একটি জটিল স্তরে  ডিপ্রেশন হল একধরনের ইমোশনাল ইম্ব্যালেন্সকোনো ব্যাক্তির স্বাভাবিক অনুভূতি কিংবা মেজাজের অবনতিকেমেজর ডিপ্রেসিভ ইলনেসবলে বর্তমানে বিশ্বে প্রায় তিনশ মিলিয়ন ডিপ্রেশনে আক্রান্ত মানুষ রয়েছেন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি জনের জন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটিতে ভুগছেনএই ডিপ্রেশন থেকে ক্রমশ মানুষের মধ্যে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা তবে ডিপ্রেশনের সঙ্গে আত্মহত্যার যে ক্লিনিক্যাল সম্পর্ক তার বাইরেও কিছু বক্তব্য থেকে যায় অনেকেই মনে করেছেন আত্মহত্যা একটি শিল্প,আমেরিকান কবি সিলভিয়া প্লাথ বলেছিলেন “Dying is an art, like everything else. I do it exceptionally well.” এবং ১৯৬৩ সালে একটি শীতের সকালে, ভোরবেলায় উনি গ্যাস ওভেনে নিজের মাথা ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন এই আত্মহত্যাকে কি আমরা শুধুই ডিপ্রেশন বলতে পারি..? আমরা এডলফ হিটলারের জীবন ঘাঁটলেও দেখতে পাই যে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ইভা ব্রাউনকে তিনি বিয়ে করে, তার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই ফিউরার বাংকারে সস্ত্রীক আত্মহত্যা করেনএছাড়াও সিগমন্ড ফ্রয়েড, যাঁকে আমরা সাইকো-অ্যানালেসিসের জনক বলি, তিনি নিজেই ম্যাক্স স্কার কন্যা আনা ফ্রয়েডের সঙ্গে যৌথ পরামর্শ করে অধিক মরফিন গ্রহণের মাধ্যমে স্বেচ্ছামৃত্যু হিসেবে আত্মহত্যা করে মৃত্যুবরণ করেনঅরিত্র ভাছিল  এই মৃত্যু গুলোকে কি মানুষের শুধুমাত্র চূড়ান্ত ডিপ্রেশনের  উদাহরণ হঠাৎ পার্ক হোটেলের সামনের রাস্তা ক্রস করতে করতে অরিত্রর পায়ের সামনে একটা গাড়ি খুব জোরে  ব্রেক মারে ,ভিতর থেকে ড্রাইভার চিৎকার করে অরিত্রকে গালাগাল দেয় ,মরবার জন্য কি আমার গাড়িটাই ছিল সারা শহরে 

.

রিসেপশনে খোঁজ নিয়ে অরিত্র লিফট বেয়ে এখন পার্ক হোটেলের চতুর্থ ফ্লোরের  ৪০৪ নম্বর রুমের কলিংবেল টিপলো একজন মধ্যবয়স্কা  গোলাগাল বাঙালি ভদ্রমহিলা দরজা খুললেন অরিত্র বললো মিস্টার চিন্তন পাঠিয়েছেন ,ভদ্রমহিলা বললেন ইয়েস চিন্তন কল করেছিল,কাম ইন অরিত্র ঘরে ঢুকে বুঝলো  তার মতো সাধারণ  কেরানির কাছে এই হোটেল রুম চিরকাল স্বপ্ন মিসেস গোলদার অরিত্রকে বাইরে ড্রইংরুমে  বসতে বললেন ,প্রশ্ন করলেন উড ইউ লাইক ওয়ান অর শ্যাম্পেন ? অরিত্র মাথা নাড়লো ,ভদ্রমহিলা অরিত্রকে বসতে বলে অন্য ঘরে চলে গেলেন অরিত্র মাথা ঘুরিয়ে দেখছিল ড্রইংরুমটা ,তার মনে পড়ছিল ঈপ্সিতার সাথে বিয়ের পর হানিমুনের পুরীর হোটেলটার কথা ,অরিত্রর মনে হচ্ছিল সত্যি এই জীবনে তার কিছুই করা হলো না মিসেস গোলদার ফিরে এলেন ,হাতে মদের গ্লাস ,বিদেশী একটা মিউজিক চালিয়ে ড্রইংরুমে  দুলতে লাগলেন ,অরিত্র অবাক হচ্ছিল দেখে এখন মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা কি করে একজন পুরুষের সামনে শরীর দেখানো পাতলা  পোশাক পরে এমন করে নাচতে পারে মিসেস গোলদার আবার বললেন কাম ড্যান্স উইথ মি ,অরিত্র বসের কথা মনে করে এগিয়ে গেলো মিসেস গোলদার অরিত্রকে জাপ্টে ধরলেন যেমন করে একটা সিংহ মানুষের উপর চেপে বসে,মিসেস গোলদার বললেন কাম ওন হ্যাগ মি অরিত্র কলের পুতুলের মতো হাত রাখলো মিসেস গোলদারের দুপাশে কোমরে মিসেস গোলদার ক্রমশ মূখ ঘষতে লাগলো অরিত্রর বুকে ,অরিত্র ঈপ্সিতার কথা মনে পড়ছিল ,একসময় মিসেস গোলদার অরিত্রকে টেনে নিয়ে এলো একটা সাজানো বেডরুমে ,উনি জোর করছিলেন অরিত্রের প্যান্টটা খোলার চেষ্টা করছিলেন  অরিত্র চোখ বন্ধ করে চেষ্টা করছিল সহ্য করার ,ধুমসি মহিলাকে হাত দিয়ে ঠেলবার চেষ্টা করছিল মিসেস গোলদার বললেন আই ডোন্ট থিঙ্ক ডিস্ ইস ইউর ফাস্ট টাইম ,লজ্জা পাচ্ছো কেন  ? তারপর যোগ করলেন চিন্তন কি লোক খুঁজে পায় না ,তোমার মতো একজন বোকা সিট কে পাঠিয়েছে হঠাৎ করে অরিত্রর মাথাটা গরম হয়ে গেলো সে ওই মহিলার চুলির মুঠি ধরে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দিলো ,তারপর চড়ে বসলো তার বুকে তারপর গায়ের জোরে ঘুষি মারতে লাগলো ভদ্রমহিলার মুখে,চিৎকার করতে লাগলো আই এম নট আ সিট্ ,আই এম নট আ ইডিয়ট , সেই  মুহূর্তে অরিত্র মিসেস গোলদারের মুখ আর মিস্টার চিন্তনের মুখ দুটো একসাথে দেখছিলপ্রথমে মিসেস গোলদার চিৎকার করছিলেন ,তারপর রক্তাক্ত ,তারপর কখন যেন স্থির হয়ে গেলেন,কিন্তু অরিত্র তখনও এলোপাহাড়ি ঘুষি চালাচ্ছিল মিসেস গোলদারের মুখে  ,চিৎকার করছিল সে          


Friday, June 19, 2020

কেদারা

 

   

কেদারা

... ঋষি

.

 দীনেশ মল্লিক এককালীন সরকারি রিটায়ার্ড অফিসার  পুরোনো কলকাতার ,এন্টালির বাসিন্দা  মল্লিকদের  বাড়ি এই পাড়ার সবচেয়ে পুরোনো বাড়িগুলোর একটা শোনা যায় ব্রিটিশরা যখন দেশে   রাজত্ব করতো তখন মল্লিকদের পিতৃপুরুষদের সঙ্গে বেশ কিছু এই শহরের  ব্রিটিশ অফিসারের ওঠাবসা ছিল ,সেই কারণে আজও পুরনো মল্লিকবাড়ির প্রতিটা দেওয়াল ,প্রতিটা ব্যালকনি থেকে পুরোনো আভিজাত্য ঝরে পরে  দীনেশ মল্লিকের যখন উর্ত্তী বয়স কিংবা তার বাবার আমলেও  এই বাড়িতে নিয়মিত প্রতি সন্ধ্যাতে পার্টি হতো সেই পার্টিতে বিদেশী মদ ,হাজারো পদের খাবার আয়োজন হতো ,এই শহরের প্রচুর নামি লোক,গুণী শিল্পী এই পার্টিতে যোগ দিতেন    দীনেশ মল্লিক রক্তের পরম্পরায় স্বভাবে রাশভারী  গম্ভীর মানুষ  ,পিতৃপুরুষের থেকে পাওয়া আভিজাত্য,নিয়ম রীতি সারা জীবন ধরে পালন করার চেষ্টা করেছেনএখন তার আধিপত্য কিছুটা কমেছে বটে ,কারণ ভাঁড়ার ঘরে টান পড়েছে তিনি সারাজীবন বুকফুলিয়ে ভীষণ সৎ থেকে চাকরিটা করেছেন ,তার স্ত্রী সন্ধ্যা দেবী এই নিয়ে মাঝে মাঝে তাকে বোঝাতে আসলে ,তিনি ধমক দিয়ে তাকে চুপ করিয়েছেন সন্ধ্যা দেবীরও বয়স হয়েছে ,তিনি একসময়  একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন মল্লিক বাবুর একমাত্র ছেলে মৃন্ময়  যার রিয়্যাল স্টেটের নিজস্ব ব্যবসা আছে এই বাড়িতে আরেকজন আছেন যিনি বয়সে সবচেয়ে কনিষ্ঠ আর মল্লিকবাবু জীবন সে হলো চিন্ময় ,তার নাতি মোটের উপর মল্লিক বাবুর বউ,ছেলে ,পুত্রবধূ আর নাতি নিয়ে বেশ ভালোই দিন কাটছে

.

               অনুপমা এখনও বিছানা থেকে ওঠে নি ,আজ তার  মন ভালো নেই ,আজ তার ছোটবেলার বন্ধুদের একটা গ্যাদারিং পার্টি আছে ,কিন্তু মৃন্ময় তাকে যেতে দেয় নিঅনুপমার মা একজন ফিরিঙ্গি আর বাবা বাঙালি ,সে মানুষ হয়েছে বিদেশী কায়দায়  ,সে ছোটবেলা থেকে তার মাকে দেখেছে ,সে দেখেছে মেয়েদের স্বাধীনতা তার মা প্রায় চাকরি থেকে ,কিংবা পার্টি থেকে একা  নেশা করে অনেক রাতে  বাড়ি ফিরেছেন ,তিনি সংসার করেছেন ,মেয়ে মানুষ করেছেন ,স্বামীকে ভালোবেসেছেন কিন্তু কখনো সেই ব্যাপারে অনুপমার বাবা হস্তক্ষেপ করেন নি  মেয়েদের স্বাধীনতা দেখে অভ্যস্ত অনুপমার এই বাড়িতে দমবন্ধ লাগে মল্লিকবাড়ির অন্দরমহলে মেয়েরা সেই প্রাচীন অন্ধকারে পরে যেখানে আলো ঢোকে না অনুপমা ভালোবেসে মৃন্ময়কে বিয়ে করে  কিন্তু সে আগে বোঝে নি এসব ,বিয়ের পরও  না যখন চিন্ময়ের সাত মাস বয়স সে প্রথমবার বিয়েরপর বাপের বাড়ি যেতে চায়  কিন্তু যেতে পারে নি কারণ এই বাড়ির মেয়েরা বাচ্চা হবার পর একবছর অবধি বাইরে বেড়োয় না তারপর থেকে ক্রমাগত না ,না শুনতে শুনতে অনুপমা ক্লান্ত হয়ে গেছে ,হয়তো মৃন্ময়ের সাথে সম্পর্কটাও তার ভেঙে যেত কিন্তু চিন্ময় জন্য আর কিছু সম্ভব নয় মৃন্ময় তার বাবাকে ভীষণ মান্য করে ,কিন্তু অনুপমা বোঝে সন্মান করা মানে শিরদাঁড়া হীনতা নয়  অনুপমা চিরকাল তার বাবা মাকে সন্মান করেছে ,কিন্তু প্রয়োজনে সত্যিটাও বলেছে এই যে মৃন্ময়ের সাথে বিয়েটা তো অনুপমার মা মানতে চাই নি ,কিন্তু তাই বলে সে কি মৃন্ময়কে বিয়ে করে নি অথচ মৃন্ময়  তার বাবা দীনেশ মল্লিকের সামনে সত্যিটাও বলে না ,দীনেশ মল্লিকের ইচ্ছে এই বাড়ির লোকেরা আদেশের মতো মেনে চলে অনুপমা মাঝে মাঝে ভাবে সে কোন যুগে বাস করে ,মাঝে মাঝে তার অসহ্য লাগে তবু চঞ্চলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে সব মেনে নেয় কিন্তু আজ সকালে যখন অনুপমা  মৃন্ময়কে বলেছিল সে আজ বিকেলে ক্লাবটাউনে যাবে ,তার পুরোনো বন্ধুদের গ্যাদারিংএ ,মৃন্ময় সটান বলে দেয় বাবা পছন্দ করেন না বাড়ির মেয়েরা পাড়া  ঢলিয়ে বেড়ায় কথাটা শুনে অনুপমার মাথায় আগুন লাগে ,সে বলে মৃন্ময় তুমি নাকি ভদ্র বাড়ির ছেলে  ,ভদ্র বাড়ির ছেলেরা বুঝি বৌয়ের সাথে এমন করে কথা বলে মৃন্ময় উত্তরে বলে কথা বলা তোমার কাছ থেকে শিখতে হবে যার মা সারারাত ঢলিয়ে বাড়ি ফিরত অনুপমার আর হয় হয় না সে সটাং এক থাপ্পড় মারে মৃন্ময় ঘুরে দাঁড়িয়ে অনুপমাকে ঠেলে ফেলে দেয় বিছানায় অনুপমা চিৎকার করে বলে

আজ তোমাকে ঠিক করতে হবে তুমি কার সাথে থাকবে আমার আর বাবুর সাথে ,নাকি তোমার বাবা মার সাথে যদি বাবা ,মার্ সাথে থাকো আমাকে বলে দেও আমি বাবুকে নিয়ে চলে যাচ্ছি ,আর যদি আমাদের সাথে তোমাকে থাকতে হয় তবে চলো আমরা আলাদা হয়ে যায় বাইরে থেকে সন্ধ্যা দেবীর গলা পাওয়া যায়,তিনি বলছেন  তোরা সকাল থেকে শুরু করেছিস আজ ,তোর বাবা শুনলে একটা ভীষণ কান্ড হবে ,চুপ কর একটু বোঝ লোকটারও তো বয়স হয়েছে

.

  পাঁচ বছরের  চিন্ময় ছুঁটে গেলো দাদুর কাছে ,দাদু কোলে তুলে নিলো চিন্ময়কে চিন্ময় বললো জানো দাদু মা ,বাবাকে চড় মারলো , বাবা মাকে  ঠেলা মারলো ,খুব ঝগড়া হচ্ছে বুঝলে ,মা বলছে আমাকে নিয়ে চলে যাবে তুমি বলো দাদু মা যদি আমাকে নিয়ে যায়,কে তবে আমাকে গল্প বলবে ,তুমি যাবে তো আমাদের সাথে দীনেশ মল্লিক বসে ছিলেন পৈতৃক দত্ত বাড়ির দালানে একটা পুরোনো চেয়ারে চেয়ার শব্দটা ইংরেজি শব্দ ,বাংলায় কেদারা ,এটা সেই কেদারায় বটে কালচে পালিশ করা এই সেগুন কাঠের  কেদারা এই বাড়িতে কতদিন আছে তা দীনেশ বাবুও জানেন নাদীনেশ বাবুর  বাবা মৃত্যুর সময় এই কেদারাটা সম্বন্ধে আলাদা করে বলেছিলেন  , ওটাকে সামলে যত্নে  রাখিস ,এটা আমাদের বংশ  পরম্পরার প্রতীক,আজ থেকে তুই বসবি ,যখন তোর ছেলে লায়েক হবে তাকে দিবি  বসতে দীনেশ বাবু ,চিন্ময়কে কোলে নিয়ে ভাবছিলেন তিনি ছেলেটাকে মানুষ করতে পারলেন না ,পুরুষ মানুষ কখনো মেয়েদের কাছে চড় খায়তিনি তার কেদারার সুন্দর কাজ করা হাতলে হাত বোলাতে বোলাতে ভাবলেন কে বসবে তারপর এই কেদারায় ,মৃন্ময় কি আদৌ যোগ্য ?    

.

মল্লিক বাড়ি ভাঙা হবে   পাঁচ মাস আগে দীনেশ মল্লিক মারা গেছেন আর তার শোকে এক সপ্তাহের মধ্যে তার স্ত্রী সন্ধ্যা দেবী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান অনুপমা আর থাকতে  চায় নি এই পুরোনো ভূতের বাড়িতে ,বিশেষত তার চাপেই মৃন্ময় এই বাড়ির জমিটা প্রোমোটিংয়ে দিয়েছে পুরোনো বাড়ি ,প্রচুর পুরোনো আসবাব ,অনুপমা চায় না তাদের নতুন বাড়িতে কোনো পুরোনো কিছু থাকে তাই আজ নিলাম হতে চলেছে পুরোনো মল্লিক বাড়ির সমস্ত আসবাব ,একে একে দড় হাঁকা হচ্ছে ,ক্রেতা দাম তুলছে ,বিক্রি হয়ে যাচ্ছে একের পর এক মল্লিক বাড়ির আভিজাত্য চিন্ময় বসে আছেপৈতৃক দত্ত বাড়ির দালানে  দাদুর কেদারায়  ,মনে মনে সে কি বিড়বিড় করছে অনুপমা এসে ডাকলো বাবু নেমে এসো ,কেদারাটা নিয়ে যাবে যে ,চিন্ময় সবাইকে চমকে দিয়ে তার মাকে উত্তরে বললো বৌমা এই চেয়ার বিক্রি করা যাবে না ,এটা আমাদের পিতৃপুরুষের ঐতিহ্য ,আমি মনে করি না মৃন্ময় এই চেয়ারের যোগ্য ,তবে আমার দাদুভাই নিশ্চয় এই চেয়ারে বসবে তারপর চিন্ময় কেঁদে উঠলো মা এটা আমার চেয়ার