Monday, May 30, 2022

অনুযোগ

 অনুযোগ 

... ঋষি 

অনুযোগ খুব শান্ত ভাবে তাকিয়ে আছে   মৃত্তিকার দিকে ,ভোরের শেষ আলো যেন আলগা বেশে গড়িয়ে নামছে মৃত্তিকার সারা শরীর বেয়ে ,মুগ্ধ অনুযোগের হোটেলের এই রুমটাকে কেন যেন স্বর্গ মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। অনুযোগ সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে সমুদ্রের ধারে জানালাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ,ডুবে যায় ভাবনায়। 

                     অনুযোগ ব্যানার্জি পেশায় সফটওয়ার ইঞ্জিয়ার ,ভালো চাকরি ,নিউটাউনের নিজের ফ্ল্যাট ,বিবাহিত ,শ্রীপর্ণা অনুযোগের স্ত্রী ,বড়োলোকের মেয়ে। তার স্ত্রী চাকরি করে কোনো এক কর্পোরেটে এইচ আরের ভূমিকায়। অনুযোগ আর শ্রীপর্ণার সুখে থাকার কথা ছিল ,অনুযোগ বাড়ির কথার বিরুদ্ধে ভালোবেসে শ্রীপর্ণাকে বিয়ে করে,বিয়ের শুরুর দিকে পাঁচ বছর বেশ ভালোই ছিল তারা। তারপর পর্ণা হলো ,কেমন যেন অনুযোগের পৃথিবীটা আটকে গেলো দশটা পাঁচটার চাকরি আর সংসার এই দুয়ের ফাঁকে। শ্রীপর্ণা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ছিল তাদের মেয়ে আর তার নিজের চাকরি নিয়ে। কখন অনুযোগের মনে হতে শুরু হয়েছিল পৃথিবীটা বোধহয় এইভাবেই চলছে সবকিছু মেনে নিতে হয়। ক্রমশ কথা বলা কমছিল স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ,শুরু হয়ে গেছিল ভুল বোঝাবুঝি।  মেয়ের স্কুল ,বাজার হাট ,গাড়ির ,ফ্লাটের ই এম আই ,অনুযোগ হাঁপিয়ে উঠছিল ,হাঁপিয়ে উঠছিল জীবন থেকে ,ঠিক সেই সময় মৃত্তিকা যেন দেবীর মতো অনুযোগের সামনে এসে দাঁড়ায়। 

মৃত্তিকা গ্রামের মেয়ে ,তার স্বামী মারা গেছে বহুদিন হলো ,নিজের বলতে তার এক ছেলে থ্রিতে পড়ে আর তার মা। কোনো এক অদ্ভুত সকালে মৃত্তিকার সাথে জীবন থেকে  হেরে যাওয়া অনুযোগের দেখা হয় যেখানে অনুযোগ সকালে জগিং করতো। প্রথম মৃত্তিকাকে  দেখেই কেন যে অনুযোগের ভীষণ কাছের মনে হয়েছিল ,মেয়েটা খুব সুন্দর হাসে আর সুন্দর কথা বলে। ক্রমশ প্রতিদিন দেখা হতে হতে অনুযোগ  প্রায় ভালো লাগা থেকে একদিন বিকেলে মৃত্তিকার সাথে দেখা করতে চায় ,সেই বিকেলের দেখা প্রথম বন্ধুত্বের ছিল তারপর কখন যেন গভীর থেকে গভীর হতে হতে হৃদয়ের হয়ে গেলো। এখন নিয়ম করে অনুযোগ সংসারের ফাঁকে ,সময়ের ফাঁকে দেখা করে মৃত্তিকার সাথে। মৃত্তিকা মেয়েটা ভালো সে কখনও কিছু চাই অনুযোগের থেকে ,শুধু গভীর মুহূর্তে অনুযোগকে বলে আমার কিছু চায় না ,শুধু সাথে থেকো। অনুযোগ  আজকাল কেন জানি মুক্তি খোঁজে সংসার থেকে কিন্তু প্রতিবারই আটকে যায় তার মেয়ের পর্ণার জন্য। 

                      বেশ কিছু দিন হলো অনুযোগ হাঁপিয়ে উঠছে ,ক্রমশ সে যে মৃত্তিকার খুব কাছের কেউ হয়ে গেছে। কিছুতেই তার মন বসে না মৃত্তিকা ছাড়া ,অফিসের কাজের ভুল হয় ,কথা বলতে ভুলে যায় কি বলবে ,ক্লাইন্ট মিটিং এ প্রায়ই তাকে অপ্রস্তুত হতে হচ্ছে এর জন্য। বাড়িতে তার মন টেকে না কিছুতেই ,কিছুতেই নিজের আয়নার মুখোমুখি হতে পারে না অনুযোগ ,শ্রীপর্ণার সাথে প্রায়শই কথাকাটাকাটি হয় ,বিবাহিত এই সম্পর্কটা যেন তলানিতে এসে থেকেছে তার। অনুযোগ মৃত্তিকা সব বলে ,মৃত্তিকা বলে আমি আছি তো ,পালাচ্ছি না আর শোনো অনুযোগ আমরা তো আর কলেজে পড়ি না ,ধৈর্য ধরো সময় একটা রাস্তা বের করবে ঠিক। 

            দেখতে দেখতে সময় কাটে ,অনুযোগ আর মৃত্তিকা রাস্তা হারিয়ে রাস্তা খুঁজতে থাকে ,খুঁজতে থাকে নিশ্বাস একসাথে বাঁচবে বলে। আজ দু বছর হলো মৃত্তিকার মাও মারা গেছে এরমধ্যে ,মৃত্তিকার ছেলে আকাশ এখন চাকরি করে ব্যাংকে  ,অনুযোগের মেয়ে পর্ণার এবছর শেষ সেমিস্টার। অনুযোগের স্ত্রী শ্রীপর্ণা এখন নিজের অফিসের বস প্রায়ই তাকে দেশের বাইরে যেতে হয়। অনুযোগের চারিপাশে সবাই বেশ ভালো আছে একমাত্র অনুযোগ আর মৃত্তিকা ছাড়া। অনুযোগ  সেদিন মৃত্তিকাকে বলছিল এইবার সময় হলো কি বলো আমাদের একসাথে থাকার আর একসাথে বাঁচার ,মৃত্তিকা হেসেছিল একইরকম বলেছিল আমি তো আছি তাড়াহুড়ো তো কিছু নেই। 

          অনুযোগ সাঁতার জানে না তবুও সে এগিয়ে চলেছে সমুদ্রের দিকে ,সে এগিয়ে চলছে বাঁচার জন্য ,নিঃশ্বাসের জন্য  । গত দুদিন অনুযোগ ভালো ছিল দিঘার এই হোটেলে মৃত্তিকার সাথে ,সময় হয়তো ভাবছে শুধু শরীর আসলে তা না ,অনুযোগ তার মানুষটাকে নিয়ে ভালো ছিল। অনুযোগ তার স্ত্রীকে সবকথা সত্যি বলেছিল ,মৃত্তিকাও বলেছিল তার ছেলেকে ,আকাশ অনেকটা অবাক হয়ে তার মার দিকে দেখেছিল কারণ মৃত্তিকা ধরেছিল একজন পঞ্চাশ উর্ধ মানুষের হাত। আসলে এইবার অনুযোগের সব স্বপ্ন গুলো সত্যি হওয়ার ছিল কিন্তু বাদ সাধলেন বিধাতা ,মৃত্তিকার গতকাল রাতে হার্ট এট্যাক হয় ,ডাক্তার এসে ঘোষণা করে সব শেষ। তবু সারারাত্রি অনুযোগ বুকের কাছে আগলে ধরে শুয়ে ছিল মৃত্তিকার ঠান্ডা শরীরটা ,একটুও কাঁদে নি সে শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সে মৃত্তিকার মুখ ,জীবনের ,মুখ। ভোররাতে কলকাতা থেকে ছুটে এসেছিল আকাশ ,অনেক কথা শুনিয়েছিল সে  অনুযোগকে কিন্তু সে কিছুই উত্তর দেয়  নি ,শুধু বোকার মতো চেয়ে ছিল আকাশের মুখে।  সমস্ত কাজ শেষ হওয়ার পর অনুযোগ ডুকরে কেঁদে ওঠে ,আকাশ অনুযোগের কাঁধে হাত রেখে বলে এইবার কি করবে কাকু ?

-কলকাতা ফিরবে ,আমার সাথে গাড়ি আছে ?

-অনুযোগ হাসে , আকাশকে বলে এইবার বাঁচবো ,তুমি ভালো থেকো বাবা। 


এই মুহূর্তে অনুযোগ প্রায় সমুদ্রের অনেকটা গভীরে আরেকটা পা বারবার আছে তার বাঁচবার জন্য। অনুযোগ এখন জলের তলায় বুঝতে পারছে তার কষ্ট হচ্ছে ,সে তবু বালিতে পা দিয়ে এগোচ্ছে ,যেন সে এগোচ্ছে মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা শেষ মুহূর্তে বলেছিল ভয় পেয়ো না আমি তো আছে ,হ্যা মৃত্তিকা আছে ,অনুযোগের শরীরটা জলে ভাসছে যেন মৃত্তিকার নরম বুকে ,অনুযোগ চোখ বুজছে।   

Thursday, January 27, 2022

গোমড়া

গোমড়া 

... ঋষি  

আজীবন দৃশ্যের কল্পনায় যে লোকটা ছবি এঁকে গেছে তাকে যদি প্রশ্ন করো ছবি কাকে বলে ? সে হাসবে খানিক পাগলের মতো তারপর খুব অনায়াসে জীবন আর ছবির মাঝে তফাৎ কি ? আসলে মানুষের ঈশ্বরগুলো মানুষের গভীরে একটা  ছবি এঁকে রাখে ,তাকে কেউ জীবন বলে ,কেউ বলে ভালো লাগা ,কেউ বলে স্পন্দন। অনুরণন বহুক্ষন ধরে তাকিয়ে আছে দূরে মাঠের ওপারে সেই ছবিটার দিকে ,যে ছবিটা হয়তো তার ঈশ্বর এঁকে দিয়েছিল সেই ছোট্টবেলায় তার গভীরে ,

মা বলতো তুই যত গম্ভীররে নিশ্চয় স্কুল টিচার হবি ,বাবা বলতো এখনকার যুগের বাচ্চা এমনি হয় ,পড়শিরা যত বড়ো হলো অনুরণনকে  তার একটা নতুন  নাম দিয়ে দিলো " গোমড়া"। অবশ্য অনুরণন এই বিষয়ে আপত্তি ছিল না ,কারণ তার গোমড়া ডাকনামটা তাকে সুযোগ করে দিতে একটু আলাদা ভাবে নিজের ভিতর থাকতে। 

অনুরণন বন্দোপাধ্যায়কে আপনি গুগলে সার্চ মেরে পাবেন না ,সে এই শহরের কোনো এক স্কুলে বাংলার টিচার ,অতি সাধারণ ছাপোষা বাঙালি যে বাবার পদবীকে আশ্রয় করে তার পৈতৃক বাড়িতে একলাই থাকে। বাবা ,মা গত হয়েছে আজ প্রায় পাঁচ বছর ,চাকরিটাও বাবার সূত্র ধরে পাওয়া তার । সুতরাং এমন একটা মানুষ যার  আজকের যুগে কোনো ইমেইলআইডি নেই ,ফেসবুক একাউন্ট নেই ,কোনো বন্ধু নেই তাকে গুগুলে কেন ,এই পৃথিবীতেই একটু বেশি বলে মনে হবে। কেউ যদি ভুল করে তার ঠিকানা পাড়ার লোকেদের জিজ্ঞসা করে পাড়ার লোকেরা বলে কে ওই মাস্টারমশাইয়ের গোমড়া ছেলেটা তো ,যে বাবার স্কুলে মাস্টারি করে তাকে খুঁজছেন ?

অনুরণনেই আত্মীয় বলতে এক মাসি আছে যে অনুরণের মাঝে মাঝে খোঁজ করে ,ফোন করে খবর নেয় ,তাকে বলে এইবার বাবা একটা বিয়ে কর বিয়ের বয়স তো পার হয়ে যাবে ,বাস্তবিক অনুরণন এখন চল্লিশের কোঠায় ,কিন্তু সে মাসিকে বলে জানো তো আমি কেমন কে করবে আমাকে বিয়ে। অনুরণন মাঝে মাঝে বাবার  পুরনো টিভিটা চালায় ,শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে অবাক হয় ভাবে ছেলেগুলো কি করে মেয়েগুলোর সাথে এমন ন্যাকামি করতে পারে ,বিরক্ত হয়ে টিভি বন্ধ করে দেয়। তবে এমনতর অনুরণন একটা অদ্ভুত শখ আছে বিভৎস্য সব মুখোশ তৈরী করা ,যা ভারতবর্ষের কোথাও আপনি দেখতে পাবেন না।

 ২

                        মিস্টার তাপস পোদ্দার কলকাতার ইন্টালিজিয়েন্ট পুলিশ দপ্তরের একজন বড়ো অফিসার ,বেশ কিছুদিন ধরে নাজেহাল হয়ে এক খুনিকে খুঁজছেন ,কিন্তু কিছুতেই খুঁজে বের করতে পারছেন না খুনির  খুনের মোটিভ। শেষ তিন বছর ধরে এই শহরে বেশ কিছু মানুষ অথাৎ নারী ও পুরুষের খুন  হয়েছে কিন্তু তাদের  ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে  মৃত্যুর কারণ  মারাত্নক আতংক যার ফলে হার্টএটাক অথচ প্রত্যেকের শরীর থেকে ভীষণ প্রচ্ছন্ন ভাবে হার্টটাকে খুলে বের করে নেওয়া হয়েছে । অনেকেরই ধারণা খুনিরা  বোধহয় শরীরের অঙ্গ পাচারকারী কোনো দল  কিন্তু তাপস বাবুর মনে হয় খুনিএকজন কারণ প্রত্যেকটা খুন একইভাবে করা হয়েছে খুব নির্মম ভাবে এবং খুনের পর মৃতদেহ ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে গঙ্গার ধারে একই গাছের তলায়।  তাপসবাবুর মতে খুনি কোনো মানসিক রোগের স্বীকার কারণ প্রত্যেটি মৃতদেহের মুখে মৃত্যুর সময় লেগে ছিল মারাত্নক আতংক,প্রত্যেককে ভীষণ কষ্ট দিয়ে মারা হয়েছে ।                     


                       অনুরণন দোতলা বাড়ির উপরের তলাটা পুরো খালি করে ষ্টুডিও বানিয়েছে নিজের মতো করে ,সেই ঘরে গেলে আপনি দেখতে পাবেন স্তূপাকৃত মাটি ,ঘাস ,বিভিন্ন প্রাণীর লোম আর অসংখ্য মুখোশ। মুখোশগুলো বেশিরভাগই কোনো মানুষ কিংবা প্রাণীর অথচ মিলটা হলো প্রত্যেকটা মুখোশে মারাত্নক এক আতংক ,কেমন যেন অপমৃত্যুর আগের জীবের যে বাঁচার আকুতি তার প্রতিচ্ছবি।

অনুরণন এখন দাঁড়িয়ে ছিল দেওয়ালের গায়ে টাঙানো তার বাবা আর মায়ের মুখের আকৃতির মুখোশটার দিকে ,হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠলো গোমড়া আমি গোমড়া ,তারপর ছুটে গেলো পাশের ঘরে একটা আলমারির সামনে।এক টানে খুলে ফেললো আলমারি। সারা আলমারি ময় কাঁচের বয়াম আর বয়ামে কিছু একটা তরলে রাখা মানুষের হৃদয়। অনুরণন  বের করে টেবিলে রাখলো  তার  বাবা ,মার নাম  লেখা বয়ামদুটো ,তারপর সেগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে প্রায় চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল " আমি গোমড়া ,আমি গোমড়া ,আর কোনোদিন বলতে পারবে না " । 


অনুরণন বহুদিন হোস্টেলে ছিল ,সেখানে তাকে প্রায় সকলেই খ্যাপাতো গোমড়া গোমড়া বলে। হোস্টেলে তার কোনো বন্ধু ছিল না ,তার একমাত্র এক বান্ধবী ছিল অন্তরা ,যে পাশের গার্লস হোস্টেলে থেকে ডাক্তারি পড়তো।অন্তরার স্বভাব অনেকটা তার মতো ছিল ,অন্তরা অধিকাংশ সময় একলা থাকতো আর একদম হাসতো  না ভীষণ গম্ভীর ছিল সে। অনুরণনের সাথে তার বন্ধুত্ব কলেজের ফেস্টে ,অনুরণন দেখেছিল মেয়েটা একটা দাঁড়িয়ে আছে এক কোনে ,তার সকল বন্ধু তাকে বারংবার তাদের সাথে আনন্দ করতে বলছে কিন্তু সে যাচ্ছে না। সেদিন প্রথম কথা বলে অনুরণন অন্তরার সঙ্গে তারপর স্বভাবের মিলের কারণে ক্রমশ তারা ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে। অন্তরার কাছ দিয়ে শুনে শুনে অনুভব সেই সময় অনেক কিছু জানতে পেরেছিল মানুষের শরীর সম্বন্ধে ,শরীরে রাখা হৃদয় সম্বন্ধে। এমনকি অন্তরার সাথে সে চুরি করে একবার এক মৃতদেহের শরীরের কাঁটা ছেঁড়া করেছিল ,তারপর সেলাই করেছিল সেই শরীরটা। 

                   অন্তরার সাথে বন্ধুত্বটা কখন যে সময়ের সাথে অনুরণের জন্য ভালোবাসা হয়ে গেছিল অনুরণন বুঝতে পারে নি। সেটা ছিল কলেজের শেষ বছর  অন্তরা একদিন অনুরণকে ডেকে  পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল অমলের সাথে ,যার সাথে অন্তরার বহুদিনকার সম্পর্ক এবং তাদের বাড়ি থেকে অমলের সাথে অন্তরার বিয়ে অবধি ঠিক হয়ে ছিল।  অনুরণন সেদিন খুব ভেঙে পড়েছিল ,পরের দিন তাই ছুটি নিয়ে সে ছুটে এসেছিল বাড়িতে বাবা মায়ের কাছে।  অনুরণের বাবা ,মা  জানতেন ছেলে তাদের একটু অন্যরকম ,একালসের। সেদিন সন্ধ্যেতে মা হঠাৎ অনুরণকে বলেন তুই যতদিন যাচ্ছে তত গোমড়া হচ্ছিস ,হঠাৎ অনুরণন কি যেন হয়ে যায় ,পাশের পিতলের ফ্লাওয়ার ভাসটা তুলে মায়ের মাথায় মারে ,মা অবাক হন তার থেকে চমকে ওঠেন ছেলের কান্ড দেখে। ছেলে মায়ের গলায় পা দিয়ে নিজের মোবাইলে ছবি তুলছে আর চিৎকার করছে জন্তুর মতো আমি গোমড়া ,আমি গোমড়া। মা মারা যান সেদিন ,মায়ের মৃত্যুকে ঢাকতে সেদিন অনুরণন একইভাবে  আরেকটা খুন করে তার বাবার এবং তারপর তাদের শরীর থেকে আলাদা করে বের করে অনুরণন মা ,বাবার হৃদয়। খুব সুপরিকল্পিত ভাবে অন্তরার এক বন্ধুর  সাহায্যে সে বের করে বাবা মায়ের মৃত্যুর সার্টিফিকেট  এবং একটা খুনকে প্রমান করে হার্ট এটাক হিসাবে।   যেদিন শ্মশানে সে তার বাবা মায়ের মুখে আগুন দিচ্ছিল তখন অনুরণনের মনে পড়ছিল গঙ্গার ধারে সেই গাছটার পাশের সপরিবারের  ছবিটা যেটা আজও টাঙানো তাদের দালান ঘরে। সেই ছবিটা তোলার আগে অনুরণন মা তার বাবাকে বলেছিল ছেলেকে সবসময় গোমড়া বলে ডেকো না তো এমন করে ,দেখো ও বদলে যাবে। সত্যি অনুরণন তখন ভাবছিল সে কতটা বদলেছে।   

পুলিশঅফিসার তাপস বাবু এই মাত্র একটা সূত্র খুঁজে বের করলেন খুনি আর খুনের মাঝে। প্রতিটা খুন মাসের ২৪ তারিখ হয়েছে  আর খুনের সময় ওই দিন ৩ টের আসে পাশে ,আর বডি পাওয়া গেছে পরের দিন সকালে গঙ্গার ধারে একই গাছের ধারে। এই সূত্র থেকে পরিষ্কার খুনির সাথে ২৪ তারিখ এবং গাছের সাথে। তাপসবাবু একটু ধাতস্থ হলেন যে মাসের ২৪ তারিখগুলো সতর্ক থাকতে হবে এবং কাকতালীয় ভাবে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন আজ মাসের ২৪ তারিখ। 

রাত তখন ১২ টা খানিকটা   হবে ,তাপসবাবু এবং তার টিম গঙ্গার ধারে একটা গাছের  পাশে একটা ঝোঁপে  ওৎ পেতে বসে আছেন খুনিকের ধরবেন বলে। ঝোপের মধ্যে মশা এক একটা ডাইনোসোরস সাইজের ,উফ করে একটা মারলেন ,সিগারেটটা ধরালেন ,দেখলেন দূর থেকে একটা গাড়ির হেডলাইট এগিয়ে আসছে ,গাছের ধারে এসে গাড়িটা থেমে গেলো। কিছুক্ষন পরে কেউ একজন আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে  নামলো গাড়ির থেকে,এগিয়ে গেলো গাড়ির ডিকির দিকে। তাপসবাবু এই সময় বাঁশি বাজালেন ,চারিদিকে জ্বলে উঠলো টর্চ ,এতদিনে খুনি ধরা  পড়লো খুনের প্রমান সমেত। 

                    অনুরণন তখন চিৎকার করছিল আমি গোমড়া না ,আমি গোমড়া না বিশ্বাস করুন ,বাবা প্রতিদিন রাতে মাকে নেশা করে এসে মারতো ,জানেন তো আমার খুব রাগ হতো ,আমি কাউকে কিছু বলতে পারতাম না,খুন করতে ইচ্ছে করতো বাবাকে কিন্তু পারতাম না ,চুপ করে থাকতাম ,লোকে আমাকে গোমড়া বলতো ,বাবা ,মা দুজনেই বলতো ,আমার রাগ হতো। তাপসবাবু বললেন তাই বলে নিজের বাবা ,মাকে খুন ,এমনকি প্রেমিকা কে ,কি যে বেশ নাম অন্তরা,অন্তরা কি দোষ করেছিল ? অন্তরা আমাকে ঢুকিয়েছে আমি ওকে ভালোবাসতাম কিন্তু ও অমরকে আর আমি ওকে খুন করি নি বিশ্বাস করুন আজকেও আমার আলমারিতে ওর হৃদয়টা খুব যত্নে আছে। তাপসবাবু প্রশ্ন করলেন বুঝলাম তুই রাগ থেকে সকলকে খুন করতিস কিন্তু ওদের হার্টগুলো কেটে   নিতিশ কেন ? অনুরণন বললো সবসময় রাগ থেকে খুন করেছি তা সত্যি নয় আসলে আমি আমার চারপাশের মানুষগুলো হৃদয়গুলো জমা করতাম কখনো রাগে ,কখনো ভালোবেসে ,আসলে চিৎকার করে ওদের বারংবার বলতে চাইতাম আমি গোমড়া নই ,কিন্তু যারা বুঝতো না আমাকে ভালোবেসে কিংবা এমনি আমাকে গোমড়া বলে ডাকতো আমি প্রত্যেককে খুন করতে চাইতাম। যাদের খুন কোনো পারতাম তাদের খুন করার   পর  বডিগুলো ফেলে আসতাম আমার ঈশ্বরের দরজায়,জানেন তো ওখানে ওই গাছটার তলায় ঈশ্বরের বাস।  আমি  ওদের হৃদয়গুলোর সাথে নিজের অবসরে কথা বলতাম ,বোঝাতে চেষ্টা করতাম আমি গোমড়া নই। তাপসবাবু বুঝলেন অনুরণন মানসিক রোগী ,তিনি তাই একজন মানসিক ডাক্তার ডেকে পাঠালেন। 

                              সমস্ত গল্পটা পরে সিনেমার ডিরেক্টার আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন তারপর বললেন সাবাস ,এটা দিয়ে একটা দারুন ওয়েবসিরিজ হবে। আমি উঠে দাঁড়ালাম বেরিয়ে আসার সময় একবার নিজের মনে হাসলাম কারণ আমি জানি জীবন আর ছবির মাঝখানে তফাৎ কি ? সত্যি এই ডিরেক্টরও জানতে চাইলেন না ওই মুখোশগুলোর মানে কি।   

Friday, May 21, 2021

বৃষ্টিরঞ্জন আর প্রাগলভ

 

বৃষ্টিরঞ্জন আর প্রাগলভ

... ঋষি

সমস্ত সময়ের থেকে ফিরে আসা মানুষগুলো আজ বৃষ্টিরঞ্জনের কাছে এক আবিষ্কার ।হোমি বৃষ্টিরঞ্জনের রোবট স্ত্রী , ক্যানিস বৃষ্টিরঞ্জনের কুকুর আর বৃষ্টিরঞ্জনের একমাত্র সন্তান মাহি যা এই পৃথিবীর কাছে এক রহস্য,এও সম্ভব মেসিন ও মানুষের স্ঙ্গমে তিরী এক্ মানুষ ।মাহির বয়স এখন চার তবে মানুষের কন্যা হিসেবে মাহির ব্রেনের গতিবিধি অনেক এগিয়ে ,বৃষ্টিরঞ্জন পরীক্ষা করে দেখেছে মাহির ব্রেইন প্রায় তার সমানুপাত বুদ্ধিধারী ।মাহি এই বয়সে বৃষ্টিরঞ্জনকে তার বিভিন্ন সাইন্টিফিক পরীক্ষায় সাহায্য করে ,বস্তুত মাহি তার সমস্ত পাঠ বোধহয় হোমির পেট থেকেই শিখে এসেছে ।হোমি এখন একলাই বৃষ্টিরঞ্জনের পিতৃপুরুষের  ব্যাবসা সামলায় ,মাহি বাড়িতে থেকে বৃষ্টিরঞ্জনের নানা সাইন্টিফিক এক্সপেরিমেন্টে সাহায্য করে ।হোমি দুপুরে একবার বাড়িতে ফিরে রান্না করে বাপ ,বেটিকে খাইয়ে কাঠের গডাউনে ফিরে যায় তারপর সন্ধ্যে করে বাড়ি ফেরে ।বেশ আছে কোচবিহারে নিরিবিলিতে বৃষ্টিরঞ্জন তরফদার ,তার এক্সপেরিমেন্ট ,তার পড়াশুনা আর জীবন নিয়ে ।

                                                শেষ মাসে বৃষ্টিরঞ্জনের দুটি আবিষ্কার ক্যালিফোর্নিয়ার সাইন্স দিবসে বেশ জনপ্রিয় হইয়েছে ।প্রথম আবিষ্কারটি হলো একটা টর্চ যার নাম বৃষ্টি রঞ্জন ডিসটর্চ রেখেছে ,এই টর্চের  দুটি সুইচ যার একটা সুইচ অন করে  এই বায়ুমণ্ডলে দিন কিংবা রাত্রি সবকিছু ভ্যানিস করা যায় এবং দ্বিতীয় সুইচ অন করে টর্চের আলো যতদুর যায় ততদূর অবধি সুক্ষ থেকে সুক্ষ যা কিছু মানুষে র খালি চোখে দেখতে পাওয়া যায়। উদাহরন হিসেবে ধরুন কোন রোগির ব্লাড টেস্ট না করে এই টর্চ জ্বালিয়ে রক্তে কি জীবানু আছে বলতে পারবেন ,বলতে পারবেন পৃথিবীর কোন স্তরে জল আছে ,কোথায় খনিজ আছে ।

দ্বিতীয় আবিষ্কারটি একটি ম্যাজিক হিয়ারিং নট অ্যান্ড বেল্ট ।এর সাহায্যে আপনি যে কোন জীব সে পাখি ,কুকুর ,মাছ সবার সাথে কথপোকথন করতে পারবেন ।আপনি ম্যাজিক হিয়ারিং নটটা আপনার কানে লাগালেন ,যার সাথে কথপোকথন করতে চান বেল্টটা তার গলায় জড়িয়ে দিলেন ,আপনি এবার সামনের জনের ভাষা পরিষ্কার বুঝতে পারবেন ।এই ভাবে বৃষ্টিরঞ্জন ক্যানিসের সাথে কথপোকথন করে দেখেছেন ।

বৃষ্টিরঞ্জনের এই দুটি আবিষ্কার সম্বন্ধে  ক্যালিফোর্নিয়ার সাইন্স জার্নালে এবং ওখানকার নিউস পেপারে বেশ ফলাও করে আলচিত হইয়েছে ,এর জন্য সারা পৃথিবী ব্যাপি বৃষ্টিরঞ্জনের নতুন নাম হইয়েছে ফাদার অফ ইনভেন্টার ।

মাহি অদ্ভুত শক্তির অধিকারী হইয়েছে ,মেয়েটার শরীরে ঘুম বলে কোন বস্তু নেই ,এর জন্য অথচ বৃষ্টিরঞ্জন চিন্তিত নয় কারন বৃষ্টিরঞ্জন মাহির ব্লাডসেল পরীক্ষা করে দেখেছে ,ওর রক্তে একটা বিশেষ সেল আছে যা মাহিকে ইন্সট্যান্ট এনার্জি দেয় ।মাহির কার্যক্ষমতা ,বুদ্ধিতে যে আগামীদিনে বৃষ্টিরঞ্জনকে ছাড়িয়ে যাবে এবং সাইন্টিস্ট হিসেবে তার মেয়ে যে বৃষ্টিরঞ্জনের থেকে বিখ্যাত হবে এ বিষয়ে বৃষ্টিরঞ্জনের সন্দেহ নেই ।রাত বারোটা  বাজে বৃষ্টিরঞ্জন আর মাহি এই মুহুর্তে একটি স্পেস্ক্রাফটের ছোট আদল তৈরী করার চেষ্টা করছে ।আগামী দিনে বৃষ্টিরঞ্জনের ইচ্ছে আছে তার এই স্পেস্ক্রাফটে করে হোমি আর সে অন্য গ্রহে  গিয়ে দেখবে তা মানুষের বাসযোগ্য কিনা ।এই বিষয়ে হোমির সাথে তার কথা হইয়েছে ,তারা যাবে আর মাহি থাকবে পৃথিবীতে ,তাদের যদি কিছু হয়ে যায় মাহি এই আবিষ্কারটা আগে নিয়ে যাবে ।

বৃষ্টিরঞ্জনের এবার ক্লান্ত লাগছিল সে মাহিকে বললো তুই দেখ মা ,আমি একটু ঘুমিয়ে নি । বৃষ্টিরঞ্জন বেড রুমে যেতে যেতে দেখলো হোমি নিজেকে স্ট্যান্ডবাই মুডে চার্জে রেখেছে । বৃষ্টিরঞ্জন ভাবছিল কি অদ্ভুত তার সংসার মানুষ ,মেসিন মিলেমিশে এক অদ্ভুত চিরিয়াখানা।মাহির যেদিন ডেলিভারি হলো সেদিন বৃষ্টিরঞ্জন চমকে উঠেছিল সদ্য জন্মানো মাহিকে কোলে নিয়ে ,পেট থেকে বেড়িয়েই মাহি বলেছিল ইফ আই ম নট রং ,ইউ আর মাই ফাদার ?মাহির বেড়ে ওঠার একএকটা দিন অন্য বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এক এক বছরের সমান ।মাহির বয়স এখন চার বছর বটে তবে সে এই তো ছ মাস আগে অল ইণ্ডিয়া পুনে সাইন্স সেমিনারে স্টেজে দাঁড়িয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ।এই মেয়ে একদিন বৃষ্টিরঞ্জনের থেকে বড় সাইন্টিস্ট হবে ।

তখন বোধহয় রাত্রি দুটো মাহির গলার শব্দ শুনে বৃষ্টিরঞ্জনের ঘুম ভেঙে গেলো ।মাহি বলছে ওয়াট ইস দ্যাট থিং মম ,আই ম সিওর দ্যাটস নট আ স্টার ,হোমির গলা পাওয়া গেলো সে বলছে বাবা ঘুমোচ্ছে আস্তে ,মাহি বলছে আমি বাবাকে ডেকে আনি ওটা আসলে কি আমাদের দেখতে হবে । বৃষ্টিরঞ্জন

বিছানা ছেড়ে এগিয়ে গেলো তার রিসার্চ রুমের দিকে । বৃষ্টিরঞ্জন গিয়ে দেখলো মাহি তার ডিসটর্চটা একটা দুরবীনের সামনে লাগিয়ে আকাশের দিকে চোখ করে তাকিয়ে আছে । বৃষ্টিরঞ্জনকে দেখে মাহি বললো বাবা দেখো ওটা ইউ এফ ও নিশ্চয় ,মা বলছে তারা । বৃষ্টিরঞ্জন দুরবীন দিয়ে দেখলো একটা নিটল চোঙের মতো কিছু উজ্জ্বল হয়ে আকাশে ভাসছে ,হ্যাঁ ওটা তারা বা কোন স্যেটালাইট নয় । বৃষ্টিরঞ্জন যতদুর পড়াশুনা করে জেনেছে এখন অবধি গল্প না কল্পনায় মানুষ ইউ এফ ও বলে উল্লেখ  করলেও ,সাইন্স এখনো কোন এর প্রমান পাই নি । বৃষ্টিরঞ্জন ডিসটর্চের ভ্যানিস ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়ে দিল এবং পরিষ্কার দেখতে পেলো ওই উজ্জ্বল চোঙের ভিতর অদ্ভুত কিছু প্রাণীর নড়াচড়া ।প্রাণীগুলো অদ্ভুত দেখতে আন্দাজ সাইজ তিন ফূট ,শরীর বলতে থলথলে মাংস ,গা দিয়ে আলো বেরোচ্ছে তাদের ,মাথাটা প্রায় শরীরের তুলনায় তিনগুন ,দুটো বড় বড় ঝুলে পড়া চোখ ,ঠোঁটের বদলে ফটের,মাথায় দুটো লম্বা সিং ,সিঙের আগায় নীল রঙের আলো জ্বলছে।দেখতে দেখতে সকাল হয়ে আসছিল বৃষ্টিরঞ্জন হোমিকে বললো ক্যামেরাটা দিতে । বৃষ্টিরঞ্জন ডিসটর্চের ফ্রিকোয়েন্সি কমিয়ে বাড়িয়ে ওই উজ্জ্বল চোঙটার এবং তার ভিতরের অদ্ভুত প্রাণিগুলোর বেশ কিছু ছবি তুলে রাখলো ।

আজ সারাদিন বৃষ্টিরঞ্জন আর মাহি  অন্য গ্রহের জীব  সম্পর্কে বিস্তর পড়াশুনা করেছে । বৃষ্টিরঞ্জন তার ডিসটর্চে আজ নতুন এক আলোর ফ্রিকোয়েন্সি যুক্ত করেছে যার মাধ্যমে ওই চোঙের মতো উজ্জ্বল যানটায় সঙ্কেত পাঠানো যায় ।মাহি এই ব্যাপারে বেশ উত্তেজিত ,সে সমস্ত ইন্সাইক্লোপিডিয়া খুলে ওই অদ্ভুত প্রাণীগুলোর অনেক গুলো স্কেচ করেছে ।হোমি আজ কাজে যায় নি সেও বৃষ্টিরঞ্জনকে বিভিন্ন তথ্য  সংগ্রহে সাহায্য করেছে ।আজ সন্ধ্যের মধ্যে তরফদার পরিবার সকলে রেডি হয়ে দুরবীন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র  নিয়ে ছাদে উঠে এসেছে ।

তখন রাত বারোটা হবে বৃষ্টিরঞ্জন গত দুঘণ্টা ধরে দুরবীনের আর ডিসটর্চের সাহায্যে আকাশে সেই উজ্জ্বল চোঙের উদ্দেশ্যে স্যিগনাল পাঠিয়ে চলেছে আর মাহি অন্য এক দুরবীনে চোখ রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে ।মাহি হঠাত চিৎকার করে উঠলো ওইতো কিছু একটা নামছে ।বলতে বলতেই তরফদারদের বাগানে ওই উজ্জ্বল চোঙটা প্রচন্ড ধাতব শব্দ করে নেমে এলো ।দোতলার ছাদ থেকে বৃষ্টিরঞ্জন সহ মাহি আর হোমি তাদের বাগানে ছুটে গেলো ।ওই তো দরজা খুলছে ,ওই যে অদ্ভুত প্রাণিগুলো । বৃষ্টিরঞ্জন এগিয়ে গেলো ,একটা প্রাণী প্রায় দশ ফুট লম্বা ওই চোঙটার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো ,হাত বাড়িয়ে দিলো বৃষ্টিরঞ্জনের দিকে কিন্তু মুখে কি একটা বলছে  প্রাণিটা ?বোঝা যাচ্ছে না ।হোমি বুদ্ধি করে ওপর থেকে ছুটে বৃষ্টিরঞ্জনের আবিষ্কৃত সেই নট আর বেল্টটা নিয়ে এসে বেল্টটা অদ্ভুত প্রাণীটার হাতে দিয়ে ইঙ্গিত করলো গলায় পরতে ।ম্যাজিক নট বৃষ্টিরঞ্জনের কানে , বৃষ্টিরঞ্জন নিজে বিশ্বাস করতে পারছিল না সেই অদ্ভুত প্রাণীটা বিশুদ্ধ বাংলায় বলছে হ্যালো ! আমি প্যাগলভ ,আমি আকাশের পাঁচ হাজার কোটী আলোকবর্ষ দূরে হোচি গ্রহে থাকি ।এটা কোথায় ?তুমি কে ? বৃষ্টিরঞ্জন উত্তর দিলো এটা পৃথিবী সৌরমণ্ডলের তৃতীয় গ্রহ ,আমি বৃষ্টিরঞ্জন,এ আমার মেয়ে মাহি ,ইনি হোমি ,আমি একজন সাইন্টিস্ট ।প্যাগলভ বললো তোমার স্ত্রী তোমার মতো না মেসিন । বৃষ্টিরঞ্জন উত্তর দিল মেসিন কিন্তু আমার মেয়ের মা ,আমার মেয়ে কিন্তু মেসিন না ।প্রাগলভ বললো তুমি মস্ত বড় সাইন্টিস্ট ,আমাদের গ্রহে অনেক সাইন্টিস্ট আছে তোমাকে আমন্ত্রন রইলো আমাদের গ্রহে ।এইবার বৃষ্টিরঞ্জন প্রাগলভকে বললো সে আর মাহি  একবার ওই উজ্জ্বল চোঙের মতো যানটা ঘুরে দেখতে চাই কারণ ভবিষ্যতে এমন একটা যান তিরী করার ইছছা আছে তার ,প্রাগলভ খুব যত্ন নিয়ে তাদের সেই উজ্জ্বল চোঙের মতো যানটা ঘুরিয়ে দেখালো ,যানের ভিতর প্রাগলভ তার স্ত্রী আর সন্তানের সাথে পরিচয় করালো আর একটা উজ্জ্বল ফল বৃষ্টিরঞ্জনকে দিল খেতে ,প্রাগলভ জানালো এ তাদের গ্রহের গাছের  ফল ,এই ফল খেলে নাকি কারোর কোন রোগ হতে পারে না । বৃষ্টিরঞ্জন ফলটা খেলো না সে ভবিষ্যৎ মানুষের উন্নতির জন্য এবং ফলটা রিসার্চের জন্য পকেটে রাখলো ।ইতিমধ্যে ভোর হয়ে আসছিল প্রাগলভ বললো এইবার তো যেতে হবে বন্ধু , বৃষ্টিরঞ্জন বন্ধুত্বের স্বীকৃতি হিসাবে তার আবিষ্কৃত হেয়ারিং ব্যান্ড আর নটটা প্রাগলভকে দিয়ে দিল ।একিরকম সেই উজ্জ্বল চোঙের দরজাটা বন্ধ হলো ,আকাশের দিকে উড়ে গেলো ।মাহি হাত নাড়লো সেই উজ্জ্বল চোঙের দিকে তাকিয়ে ।

পরেদিন দেখা গেলো তরফদারের বাগানের যে অংশে সেই ধাতব উজ্জ্বল যানটা নেমেছিল সেখানে অনেক নীল রঙের ফুল ফুটেছে ।পাড়ার লোকেরা বললো গত রাতে নাকি পাগলা সাইন্টিস্টের বাড়িতে ভুত এসেছিল ।আর মাহি আর বৃষ্টিরঞ্জন এখন নতুন এক এক্সপেরিমেন্টে ব্যাস্ত প্রাগলভের দেওয়া নতুন উজ্জ্বল ফলে এমন কি আছে যাতে রোগ নিরাময় হয় আর অন্য গ্রহের যাওয়ার উড়ো  কি করে তৈরী করা যায় ।

Thursday, May 20, 2021

মিস্টার অনিরুদ্ধ

 

 

মিস্টার অনিরুদ্ধ

... ঋষি

 

পৃথিবীতে  আদিম রিপুদের মধ্যে অন্যতম ক্রোধ ।মিস্টার অনিরুদ্ধ পাঠক ডি এস পি কোলকাতা পুলিশ এই মুহুর্তে রাগে ঠক ঠক করে কাঁপছেন কারন আর এক ইঞ্চির জন্য তার বুলেট টা অপরাধীকে না ছুঁয়ে চলে গেলো আর সেই ফাঁকে অপরাধী চম্পট।মিস্টার পাঠক এই মুহূর্তে কলকাতা পুলিশের সবচেয়ে প্রতিভাবান পুলিশ অফিসার ,তার দাপটে এই মুহূর্তে কলকাতার ক্রিমিনাল এক্টিভিটি অনেক কমেছে ।কিন্তু শেষ চারসপ্তাহে এক খুনীর দাপটে কলকাতায় চারটি খুন হয়েছে ,প্রতিবারে খুনী খুব সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে একইরকম ভাবে খুনগুলো করেছে,কোন প্রমান সে রাখে নি ।,কলকাতা গোয়েন্দা ডিপারট্মেন্ট এর কাছ থেকে খবর ছিল আগেভাগে এইবার ,কিন্তু সামান্য দেরি করে পুলিশ ব্যবাসায়ীর বাড়ি পৌঁছোয় আর খুনী শেষ মুহূর্তে ছাদ বেয়ে পালাবার সময় মিস্টার পাঠক গুলিটা করেন কিন্তু এক ইঞ্চির জন্য গুলিটা ফস্কায়,খুনী সেই সুযোগে চম্পট ।এই কেসে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার খুনীর টার্গেট সকলেই বড় বড় ব্যাবসায়ী ,খুনীর সাথে ব্যাবসায়ীদের কোন আগের যোগাযোগ নেই ,নেই কোন শ্ত্রুতা ,খুনের মটো তাই কিছুতেই ক্লিয়ার নয় পুলিশের কাছে ।

                                          মিস্টার অনিরুদ্ধ বাড়ি ঢুকলেন ,তার ল নিয়ে কলেজে পড়া মেয়ে প্রিয়া ছুটে এলো বললো কি নিপাত হলো ?অনিরুদ্ধ চমকে উঠলেন ,প্রিয়া কি করে জানলো ।প্রিয়া বুদ্ধিমতি মেয়ে সে বাবার মুখ দেখে বললো ,পালিয়েছে তাই ডিপ্রেসড ।অনিরুদ্ধ বললো তুই কি করে জানলি ?প্রিয়া হেসে বললো যেদিন তোমার কোন ক্রিমিনাল অপেরেশান থাকে তুমি সকালে ঘুম থেকে উঠে এক্সারসাইজ করো ,কম কথা বলো ,আর যদি অপেরাশান সাকসেসফুল হয় বাড়ি ফিরে প্রচুর কথা বলো আর ফেইলুওর হলে মুখ ছোট হয়ে যায় তোমার ।অনিরুদ্ধ অবাক হলও প্রিয়া তার মা মরা মেয়ে ,অনেক যত্নে তিনি তাকে মানুষ করছেন ,সে কত বড় হয়ে গেছে ।অনিরুদ্ধ মনে মনে মেয়েকে নিয়ে গর্ব বোধ করলেন এতটুকু মেয়ের লক্ষ্য দেখে ,তবু তিনি মুখে বললেন আজ কলেজ যাও  নি কেন ?প্রিয়া বললো কলেজ মানুষকে বইয়ের শিক্ষা দিতে পারে কিন্তু মানুষের গভীর শিক্ষা তার বোধ ,সুবিনয় বলে যতদিন এই দেশে উঁচু নিচু গরীব বড়লোক ভেদাভেদ থাকবে এই দেশের কিছু হবে না ।মিস্টার অনিরুদ্ধ ধ্মকের সুরে বললেন তোমাকে না বলেছি ওই ডেঁপো ছেলেটার সাথে একদম মিশবে না ,মা বাপের ঠিক নেই তার । প্রিয়া বললো সুবিনয় বলে যারা খুব সহজে খাবার ,শিক্ষা আর চিকিৎসা পায় তারা আসলে দেশের সাধারন  মানুষের ব্যাথা বুঝবে না ,এই ভারতের আজো সত্তর শতাংশ দেশবাসীর জাতীয় ইনকাম মাসে তিনশো টাকা ,তারা বাঁচে কি করে আমরা শহরবাসীরা তার খবর রাখি না কারন আমরা স্বার্থপর টাকার গোলামী করি ।যতদিন না মানুষের অর্থনীতিতে সাম্যতা আসবে ততদিন দেশের প্রগতি সম্ভব নয় ।মিস্টার অনিরুদ্ধ খানিকটা তন্ময় হয়ে মেয়ের কথা শুনছিলেন ,তিনি এবার বললেন এত ডেঁপোমি করতে হবে না যাও অঞ্জলিদিকে খেতে  দিতে বলো আমি চান করে আসছি তারপর বিকেলে আজকের গল্পটা বলবো ।

অনিরুদ্ধ ঘুম থেকে উঠে অঞ্জলিকে এককাপ চা দিতে বসে খবরের কাগজটা খুলে বসলেন ,খবর পড়ে চমকে উঠলেন ,গড়িয়াহাটের সিমেন্ট ব্যাবসায়ী শ্যামসুন্দর আগারওয়ালের খুন ,খুনের অস্ত্র প্লাস্টিক ব্যাগ ,শ্বাস রোধ করে খুন করা হইয়েছে।অনিরুদ্ধ অবাক হলেন কাল ওই ভদ্রলোককেই একটুর জন্য বাঁচানও গেছে কোনরকম আজ সে আর নেই ,খুন ।গতকাল থেকে ওই গড়িয়াহাটের ব্যাবসায়ীর বাড়িতে পুলিশ প্রোটেকশান লাগানো হয়েছিল ,তা সত্বেও পুলিশকে কাঁচকলা দেখিয়ে খুন ,এ তো রীতিমত সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ ।মুডটা সকাল সকাল তেতো হয়ে গেলো অনিরুদ্ধের ,আএ এই সময় হাতের মুঠোফোনটা বেজে উঠলো ,অফিসের ফোন ,অনিরুদ্ধকে ইমিডিয়েট রেপোর্ট করতে বলা হইয়েছে হেডফিসে ।

 

 

হেডঅফিস থেকে বেড়িয়ে এলো অনিরুদ্ধ,রাজ্যের মন্ত্রী থেকে সমস্ত আমলারা ছিল মিটিং এ  ।অনিরুদ্ধ সহ সমস্ত পুলিশফোর্স কে রীতিমত ওয়ারনিং দেওয়া হলো ,একটা রাজ্যে এত পুলিশ ,গয়েন্দা এত শক্তি থাকা সত্বেও পর পর পাঁচটা খুন ,এদিকে মিডিয়া নাকি মাথার চুল ছিঁড়ে নিচ্ছে ,লজ্জা কি লজ্জা ! অনিরুদ্ধের উপর ভরসা রেখে মন্ত্রী বলেছেন পারলে আপনি পারবেন অনিরুদ্ধ বাবু ,আপনার হাতে সাতদিন আছে ,আপনাকে সমস্ত ক্ষমতা দেওয়া হলো,খুনীকে জীবিত বাঁ মৃত যেমন পারুন ধরুন ।

 

প্রিয়া দেখছে কলেজের গেটে সুবিনয় একটা মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রর নীতি সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ের উপর কিছু বলছে ,তাকে ঘিরে আছে অনেক স্টুডেন্ট ।সুবিনয় যা বলে তার বেশিরভাগ প্রিয়ার মাথার উপরদিয়ে বেড়িয়ে গেলেও কিছুটা ঢুকছে ।সুবিনয় বলছে কোন রাষ্ট্র একদিনে নিজের পায়ে দাঁড়ায় না তার পেছোনে থাকে সাধারন মানুষের ঘাম ,রক্ত আর সার্থহীন সত্যি ।যদি দেশ গড়তে হয় সাম্যতা দরকার ,দরকার মানুষের বেঁচে থাকার সমস্ত অধিকারের সমঅধিকার আর অধিকার কেউ দেয় না ,ইতিহাস সাক্ষী তা কেড়ে নিতে হইয়েছে চিরকাল ।সেই কারণে আগামী ১৭ ই জুন আমরা গান্ধিমুর্তির পাদদেশ অবধি মিছিল করবো ,বন্ধুরা আপনাদের উপস্থিতি কাম্য ।

প্রিয়া আর সুবিনয় হেঁটে যাচ্ছে কলেজস্ট্রিট দিয়ে পাশ দিয়ে একটা ট্রাম এগিয়ে যাচ্ছে বউবাজারের দিকে ।প্রিয়া বলছে সে আর হাঁটতে পারছে না সাথে গাড়ি থাকা সত্বেও হাঁটাটা বোকামি ,কিন্তু সুবিনয় কিছুতেই  গাড়িতে চলে না ,সে বলে আরাম মানুষকে নষ্ট করে ,সে প্রিয়াকে বলেছে এই যে প্রিয়ার বিলাব্যাসন ,গাড়ি ,বাড়ি সব তার বাবা কাউকে না কাউকে ডিপ্রাইভ করে করেছে ।সুবিনয়ের মতে যে দেশে অর্ধেকের উপর মানুষ প্রতিদিন প্রায় না খেয়ে থাকে সে দেশে গাড়ি চড়াটা অপরাধ ।প্রিয়া বলে সে তার বাবার একমাত্র মেয়ে ,তার বাবার সবকিছু তারই অধিকার ,সুবিনয় ফস করে জ্বলে ওঠে ,অধিকার !আর সাধারন মানুষের অধিকার ,আমার যদি ক্ষমতা থাকতো এই অধিকারওয়ালা গুলোকে আগে গুলি করে মাড়তাম ।তারপর সুবিনয় বললো ধর একদিন আমি তোর বাবার মাথায় বন্ধুকের নল ধ রে আছি তুই কি করবি ,আমাকে ভালবাসবি নাকি বাবার গলা জড়িয়ে ধড়বি ।প্রিয়া বললো সুবিনয় তুমি যদি বাবার সম্পর্কে এমন বলো আমি তোমার সাথে কোন সম্পর্ক রাখবো না । ছোটবেলায় মা মারা গেছে আমার বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে বড় করেছেন ।এইসময় একটা মারুতি ভ্যান এসে থামলও কতগুলো ছেলে আর সুবিনয় মিলে প্রিয়াকে জোর করে গাড়িতে তুলছে ,তারা কি যেন চেপে ধরেছে একটা প্রিয়ার নাকে ,প্রিয়া আর চেয়ে থাকতে পারছে না ।

প্রিয়ার মুখের উপর জল ছেটাচ্ছে সুবিনয়,প্রিয়া চোখ খুলছে ।প্রিয়া চোখ খুলে বুঝতে পারছে সে একটা নোংরা বস্তির মতো কোথাও আছে ,চারদিকদিয়ে দুর্গন্ধ আসছে ,সুবিনয় প্রিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে ,কি বিশ্বাস হচ্ছে না তো ,আমারও হচ্ছে না ,আর কোন উপায় ছিল না ,একদিন আগে তোর বাবার কারণে মরতে মরতে বেঁচেছি ,কি করছি আমরা ?একটা সম, অধিকারের দেশ চাইছি ,অন্যায় ।আর তোর বাবা সময়ের দালাল হয়ে আমাদের বিপ্লবের বুকে ছুরি মারছে ।  মা কসম বলছি অনিরুদ্ধ পাঠক তোর বাবা না হলে শেষ করে দিতাম ,তোর বাবা বলে তোকে গায়েব করলাম ।সুবিনয় তোর কোন ক্ষতি আমরা করবো না শুধু তোর বাবাকে এই কেস থেকে সরতে হবে , দেখা যাক তোর বাবা তোকে কত ভালোবাসে ।জল খাবি বলে সুবিনয় প্রিয়ার মুখের বাঁধনটা খুলে দিল ,প্রিয়া একমুখ থুথু ছুঁড়ে মারল সুবিনয়ের মুখে তারপর বললো এই জন্য বাবা তোমার সাথে মিশতে বারণ করতো আমি শুনি নি ,বাবা ঠিক বলে বাপ মায়ে খেদানো ছেলে ,আর কি আশা করা যায় তোমার  থেকে ।প্রিয়া বল;ছে সুবিনয় আমি তোমাকে বাহাদুর ভাবতাম ,কিন্তু তুমি খুব সাধারণ ,শুধু মুখে বড় কথা বললে বিপ্লব হয় না ,তুমি আমাকে কিডন্যাপ করে বিপ্লব করবে ।সুবিনয় আর সহ্য করতে পারলো না ,এক থাপ্পড় মারলো প্রিয়াকে ,বললো ,মানুষের সমঅধিকারের জন্য যদি আমি পাঁচটা খুন করতে পারি তবে তোকে খুন করতে আমার বাঁধবে না ,তাছাড়া আমি দোষ করলে তুইও করেছিস ,তুই তোর বাবার সব খবর আমাকে দিস আর টাকা পয়সা দিয়েও আমাদের হেল্প করিস । প্রিয়া কেঁদে উঠলো তুমি আমাকে ইউটিলাইস করলে সুবিনয় দা ?

দিল্লী থেকে গোয়েন্দার বড় অফিসার মিস্টার ভাটস এইমুহুর্তে  দাঁড়িয়ে আছেন দুটো মৃতদেহের সামনে ।উনি ধীরে ধীরে মৃতদেহদুটির মুখের ঢাকনা সরালেন প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বল্লেন চিনতে পারছো ?প্রিয়া কেঁদে উঠলো তার বাবা আর সুবিনয়দা ।মিস্টার ভাটস খুব শান্ত হয়ে প্রিয়াকে বললেন তুমি এর সম্বন্ধে কিছুই জানতে না তাই না ?তুমি কিডন্যাপ হবার পর তোমার বাবা আর সুবিনয়ের দল মিলে মন্ত্রীর মেয়েকে কিডন্যাপ করে ,আসলে তোমার বাবা ভয় পেয়ে গেছিলেন ওনাকে ডেকে যখন সাতদিন সময় দেওয়া হয় খুনীকে ধরতে ।তোমার বাবাই তোমাকে কিডন্যাপ করান যাতে তার  দিকে কোনভাবে কেউ আঙ্গুল না তুলতে পারেন ,কিন্তু ভুল করেন অন্য জায়গায় ,তিনি যে চিঠিটা মেয়ের কিডণ্যাপারের চিঠি বলে কেস থেকে সরে যেতে চান সেটা আমাদের এক্সপার্টরা তোমার বাবার হাতের লেখা বলে ধরে ফেলেন ,তবুও আমদের কাছে মোটিভ ক্লিয়ার হচ্ছিল না।আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারি তোমার মা যখন মারা যান ,তুমি তখন তুমি খুব ছোট ,উনি তখন মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন ,বেশ কিছুদিন সেই সময় অনিরুদ্ধ বাবু পাগলা গারদে ছিলেন ,পরে তিনি সুস্থ ভাবে ফিরে আসেন কিন্তু নিয়মিত তিনি অষুধ খেতেন ।তিনি অপেক্ষা করছিলেন তোমাকে বড় করার জন্য।সুবিনয়ের সাথে পরিচয় ওনার সেই পাগলা গারদে থাকা কালীন ,পাশের একটা অনাথ হোস্টেলে সুবিনয় পড়তো ,খোঁজ নিয়ে জেনেছি সুবিনয়ের পড়ার খরচা সমস্তটাই অনিরুদ্ধ বাবু চালাতেন ।অনিরুদ্ধ বাবুর মধ্যে আসলে দুটি চরিত্র বাস করতো একজন বাবা এবং একজন নকশাল । নিজেকে তিনি একজন বিপ্লবী নকশাল মনে করে সুবিনয়ের মতো কিছু লক্ষ্যভ্রস্ট যুবকদের নিয়ে দল তৈরী করেন পুঁজিবাদী মানুষ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ,কিন্তু উনি ভুলে গেছিলেন এটা নকশাল  যুগ নয় ,এটা পুঁজিবাদী যুগ নয় এ যুগ সাধারন মানুষের ।যাই হোক মিস প্রিয়া আমরা মানে মন্ত্রীসভার কেউ চান না তোমার বাবার কথা জানাজানি হোক তবে লোকে পুলিশের উপর আর বিশ্বাস রাখতে পারবে না ,বরং আমরা সংবাদ মাধ্যমে এই কথা বলবো মিস্টার অনিরুদ্ধ কিছু কুখ্যাত সমাজবিরোধীর সাথে গুলির লড়াইয়ে নিজের কর্তব্যরক্ষায় মারা যান ।প্রিয়া এই সময় বাবাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো ।

Monday, May 17, 2021

বীরপুরুষ

 


বীরপুরুষ

... ঋষি

 

ঘুম ভেঙে উঠে বসলো বিনু ,পাশে মা নেই ,এই খাটে বিনু ঘুমোয় না,এটা ঠাকুমার খাট ।পাশের ঘরে বাবার গলার স্বর পাওয়া যাচ্ছে ,ঠাকুমাকে বলছে বাবা , মা এত ভেবো না মিনু ঠিক হয়ে যাবে ।এখন করোনা অনেকের হচ্ছে আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছে,এত ভেবো না ।বিনুর মা আজ পাঁচ দিন হলো হাসপাতালে ভর্তি ।কি যে এক রোগ এসেছে পৃথিবীতে ,সবাইকে ঘর বন্দী করে রেখেছে । বিনু ক্লাস টু  থেকে থ্রিতে  উঠে গেলো স্কুলে না গিয়ে অনলাইনে পরীক্ষা দিয়ে ।এখন লকডাউন চলছে ,বাবারও অফিস বন্ধ ,বিনু আড়াল থেকে দেখেছে ঠাকুমা খবর শুনলে খালি কাঁদে ।বাবা বন্ধুদের সাথে ফোনে কথা বললে সে  শুনেছে বাবাকে বলতে আর চলছে না বুঝলি এই তো লকডাউন থেকে উঠলাম তার মধ্যে আবার লকডাউন ,জমানো টাকা প্রায় শেষ তারমধ্যে মিনু হাসপাতালে ,সংসারটা বাঁচাতে পারলে হয় ।বিনু মাঝে মাঝে ভাবে সংসার মানে কি ?ছোটবেলায় সে পড়েছে ফ্যামিলি ,বাবা ,মা ,ঠাকুমা ,দাদু  এদেরকে নিয়ে ফ্যামিলি ।দাদু মারা গেছেন আগের বছর করোনাতেই ,বাবা ঠাকুমা সবাই খুব কেঁদেছিল ,মা বলেছিল বিনুকে দাদু নাকি অন্ধকার আকাশের তারা হয়ে গেছেন। ঠাকুমার এখন  শোয়ার ঘরে খাটের পাশে দাদুর একটা ছবি আছে ।

কাল রাতে বিনু একটা স্বপ্ন দেখেছে ,দাদুর সাথে সে পার্কে গেছে ,পাশের বাড়ির  অঞ্জলি দি আর সেই ধিমান বলে দাদাটা পাশাপাশি বসে গল্প করছে ।একটা ষাঁড়দু ম করে কোথা থেকে ছুটে আসছে অঞ্জলি দির দিকে ,ধিমান দা ছুটে পালিয়ে গেলো অঞ্জলিদিকে ফেলে ,বিনু বীরপুরুষ হয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ষাঁড়টার ,ষাঁড়টা পালাচ্ছে ।অঞ্জলি দি বিনুকে কোলে তুলে চুমু খাচ্ছে ,কি অসভ্য বিনু দি ,সে কি আর ছোট আছে নাকি ? দাদু হাততালি দিচ্ছে ।বিনু ঠাকুমার গলা শুনতে পাছছে ঠাকুমা বলছে দাদুভাই এইবার মুখ ধুয়ে নেও তোমার অনলাইন ক্লাস শুরু হবে ।

বিনুর আর ভাল লাগছে না ,এই দুপুরে সারা বাড়ি শান্ত ।বাবা খবরের কাগজ পড়ছে ,ঠাকুমা ঘুমোচ্ছে ,বিনু অনেক্ষন ধরে একটা কাগজের প্লেন তৈরি করতে চাইছে পারছে না ,মা বলেছিল শিখিয়ে দেবে ।বাইরে একটা কোকিল ডাকছে অসময়ে ,বিনু জানে কোকিল বসন্ত কালে ডাকে ,এখন তো গ্রীষ্মকাল কোকিল ডাকছে কেন ? বিনুর মায়ের জন্য মন খারাপ করছে ,মায়ের মতো কেউ ভালোবাসে না তাকে ,সে উঠে গেলো বাবার কাছে ,বাবাকে প্রশ্ন করলো ,বাবা মা কবে আসবে ।বাবা বিনুকে কোলে বসিয়ে বললো আসবে তো খুব তাড়াতাড়ি ।বিনু বাবাকে বললো আমাকে একটা কাগজের প্লেন তৈরি করে দেবে ?

আজ সন্ধ্যে থেকে বিনুর মাথাটা ভারি লাগছে ,বাবাকে খুব চিন্তিত লাগছে ,ডাক্তার কাকুকে ফোন করে বাবা বলছে হ্যাঁ  জ্বর আছে ১০১.১ ডিগ্রি ।বাবা ফোন নামিয়ে ঠাকুমাকে বলছে আমি ওষুধ নিয়ে আসছি মা তুমি ভেবো না ।

ঠাকুমা বলছে ছেলেটা হয়েছে বাদর ,সারা দুপুর জেগে থাকে একটু ঘুমোয় না ,বৌমা হাসপাতালে ভর্তি হাতির পাঁচ পা দেখেছে  ,ঠান্ডা গরম লেগেছে ।আমার বয়স হয়েছে আর আমি পারি  না ,একলা হাতে কত করা যায়। বিনু ভাবছে আচ্ছা মা থাকলে কি ঠাকুমার মতো এমন করতো তার জ্বর এলে ,নাকি বুকে জড়িয়ে বলতো দেখ দুষ্টুমি করিস এত, জ্বর এলো ,এখন আমি কি করি বাবু ?

                    বিনু এখন আর চোখ খুলে চাইতে পারছে না ,সে অদ্ভুত ঘোরে যেন স্বপ্ন দেখেছে ।আকাশের গায়ে লাল লাল অক্ষরে লেখা লকডাউন ।সারা আকাশময় হাজারো কাগজের এরোপ্লেন ,প্রতিটা এরোপ্লেনের উপর এক একজন বসে ।ওইতো মা ,ওইতো বাবা ,দাদু ,ঠাকুমা ,অঞ্জলি দি,ধিমান দা ,স্কুলের দিদিমণি,

শুধুই উড়ছে ।সবাই চীৎকার করছে আর পারছি না ,আর পারছি না ......।

বিনু যেন রবিঠাকুরের বীরপুরুষ,তার হাতে এক বিশাল হাতুড়ি ,সে বলছে আমি সব তালা ভাঙছি এখুনি  ।এই দেখো ভাঙলাম স্কুলের তালা ,এই দেখো ভাঙছি বাজারের তালা ,এই যে বাবা তোমার অফিসের তালা ,মা তোমার হাসপাতালের তালা ।

বিনু আজ চারদিন পর চোখ খুললো ,তার পাশে মা রয়েছে ,মা কবে ফিরে এলো ?মা বাবাকে বলছে কি গো কিছু করো না ,বাবুর যে জ্বর কমে না ,বাবা বলছে তুমি এত চাপ নিয়ো না সদ্য সুস্থ হয়েছো ,বাবুর করোনা হয় নি ,রিপোর্ট নেগেটিভ।বিনু মাকে বললো ক্লান্ত গলায় মা তুমি ভেবো না ,আমি বীরপুরুষ ঠিক হয়ে গেছি ,বলে ভাবের ঘোরে আবৃত্তি করতে লাগলো

মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে

মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে ......।

 

  

 

 

Saturday, January 30, 2021

ভালোবাসিস আমায়

 ভালোবাসিস আমায় 

... ঋষি 


নাগেরবাজারে সন্ধ্যের  ভিড়ের মাঝে শান্তিলাল পথ হাঁটছে ধীর পায়ে। চারপাশে হকারের চিৎকার,ফুটপাথে এতো ভীর  কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। তার মাথায় ঘুরছে চিন্তামনির মুখ । একটা স্ট্রিট লাইটের দিকে তাকিয়ে আছে অনেক্ষন সে ,এক জায়গায় দাঁড়িয়ে , খেয়াল নেই শান্তিলালের। তার মনে পড়ছে বিহার থেকে চিন্তামনির হাত ধরে পালিয়ে আসা দিনগুলো। কত স্বপ্ন ছিল চোখে সেদিন। চিন্তামণি তার গাঁয়ের বাবুই হালুয়ার বৌ ,মনে মনে বহুদিন শান্তিলাল চিন্তামনিকে অন্য চোখে দেখতো । ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতো গাঁয়ের কুঁয়োর পাশে ,কখন চিন্তামণি আসে ,একবার তাকায় ,একটু হাসে। না সে কোনোদিনই সাহস করে বলতে পারে নি তার মন কি বাত চিন্তামনিকে। বাবুয়ার বাজারে  মিষ্টির দোকান ছিল ,সে সারাদিন গ্রামের ছোট মিষ্টির দোকানটায় বসে থাকতো আর বাড়িতে গিয়ে মদ খেয়ে মনের সুখে পেটাতো চিন্তামণিকে।

 সেদিনটা যদি না আসতো তবে হয়তো আজকের দিনটা আসতো না শান্তিলালের জীবনে। সেদিনও মদ খেয়ে মুখচোখ ফাঁটিয়ে দিয়েছিল বাবুয়া চিন্তামনির ,বের করে দিয়েছিল ঘরের বাইরে। চিন্তামণি অন্ধকারে বসে ছিল বাবুয়ার ঘরের দুয়ারে ,অঝোরে কাঁদছিল সে। শান্তিলাল এমনিতেই সাইকেল ঘুরপাক খেতো বাবুয়ার বাড়ির আশেপাশে একবার যদি চিন্তামনিকে দেখতে পায়। সেদিন রাতেও শান্তিলাল গেছিল এবং সেই অবস্থায় চিন্তামনিকে দেখে আর স্থির থাকতে পারে নি ,ঘরে ঢুকে একটা হাতুড়ি দিয়ে খুন করে সে বাবুয়াকে। তারপর অসহায়ের মতো সে এসে দাঁড়ায় শান্তিলাল  কাছে প্রশ্ন করে ,যাবি আমার সাথে ?

- কিছুটা ভীত ,কিছুটা ভয়ে চিন্তামণি  শান্তিলতা বলে তুই যদি আমায় খুন করিস? ,

- শান্তিলাল পাগলের মতো জড়িয়ে ধরে চিন্তামনিকে ,বলে ভালোবাসি রে ,সাদি করবো তোর লাগে। 

সেই রাতে শান্তিলাল আর চিন্তামণি গ্রাম ছাড়ে ,চলে আসে ভিড়ের শহর কলকাতায়। আজ আটমাস হয়েছে শান্তিলাল চিন্তামনিকে নিয়ে থাকে নাগেরবাজারের বস্তিতে ,আর কাজ করে সে সামনেই বাজারে একটা আটা ভাঙাবার দোকানে। বেশ তো চলছিল তাদের কিন্তু চিন্তামনির পেটে যে এখন তার ভালোবাসার সন্তান। প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে কত রার সে যে চিন্তামনির  পেটে চুমু খেয়ে কাটিয়েছে। স্বপ্ন দেখেছে বলছে চিন্তামনিকে আমি তো আর পড়াশুনা করতে পারি নি বাবুকে পড়াবো। চিন্তামণি শুধু হেসেছে। 

                  শান্তিলাল যে দোকানে কাজ করে ,সেই দোকান মালিকের ছেলে বিক্রম আজ বেশ কিছু দিন হলো তার বস্তিপাড়ার ঘরটায় আসে। বস্তুত বিহার থেকে আসার পর বিক্রমী ঠিক করে দেয় ওই ঘরটা ,ওই সূত্রে আলাপ ,বিক্রম সেদিন বলেছিল চিন্তামনিকে ভাবি কোনো ভাবনা নেই ,আমি তো রইলাম ,কোনো দরকার হলে আমাকে মনে করো আমি আছি ,আর মাঝে মধ্যে এসব তোমার হাতে চা খেতে। এতদিন গা করেনি শান্তিলাল কিন্তু আজ তার দোকানে বল্টু যখন শান্তিলালকে বললো তোর আর কাজ করে কি হবে ,এতো পয়সা কে খাবে তোর তো বৌ কামাচ্ছে রে দুহাতে ,কি কপাল মাইরি তোর। বিষয়টা পরিষ্কার হতে শান্তিলাল জানলো শান্তিলাল যখন কাজ করে বিক্রম যায় চিন্তামনির কাছে। শান্তিলতার মাথা গরম হয়ে গেছিল ,তবে কি শান্তিলতার পেটে বাচ্চাটা ?কি করবে এখন শান্তিলাল ?

অনেক রাতে ঘরে পা টলতে টলতে  ফিরলো শান্তিলাল ,আজ একটু বাংলা বেশি চড়েছিল তার। দরজা খুললো চিন্তামণি বললো কি ব্যাপার এত রাত কেন ?

- উত্তরে শান্তিলাল বললে তোকে কি সব বলতে হবে,যা খেতে দে। 

খাওয়ার থালায় বসে শান্তিলাল ডাল মুখে দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল ,কি এটা ? আর হবেই না কেন তোর কি এখন সময় আছে।

চিন্তামণি  বড় অবাক চোখে তাকালো। বললো তার মানে ?

-  চিন্তামণি বিশ্বাস করতে পারলো না ,কেঁদে বললো তুই আমায় অবিশ্বাস করিস ?

- শান্তিলাল চুলের  মুঠি ধরে চিন্তামনিকে বললো এইজন্য বাবুয়া তোকে মারতো ,বদ চরিত্র মেয়েছেলে বেরো এখান থেকে। 

অনেক সকালে ঘুম ভাঙলো শান্তিলালের ,বিছানায় দেখতো পেলো না চিন্তামনিকে। মনে পড়লো তার আগেরদিন রাত্রের কথা ,আঁতকে উঠলো সে। গামছা পরেই সে ছুটে যাচ্ছিল সে চিন্তামনিকে খুঁজতে। কিন্তু দরজা খুলে সে অবাক হলো চিন্তামণি বসে বসে ঘুমোচ্ছে  বাইরের সিঁড়িতে ,তার চোখের কাজল গড়িয়ে নামছে সারা গাল বেয়ে। কেঁদে উঠলো শান্তিলাল  ,ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তার ঘুমন্ত স্ত্রীকে ,চিন্তামণি চোখ খুললো ,শান্তিলাল বললো 

- বড় ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দে রে, আর হবে না ,আর কষ্ট দেব না তোকে 

আর চিন্তামণি শান্তিলালকে বললো 

ভালোবাসিস আমায় ?  

     

সাইলেন্ট অফ ডেথ

সাইলেন্ট অফ ডেথ 

... ঋষি 

.

রাত্রের একটা নিজস্ব শব্দ আছে ,কান পাতলে আপনি শুনতে পাবেন নিজের গভীরে অজস্র টানেল ,অজস্র অজস্র আরো সরু টানেল দিয়ে আপনি হেঁটে চলেছেন। আসলে সেই সময় আপনার মন ভীষণ অস্থির ,কিংবা আরো গভীর করে বললে আপনার জীবনের অতৃপ্তিগুলো আপনাকে ব্যাকুল করছে ,মাথার নিউরনগুলো অস্থির আর ফলস্বরূপ ঘুম না আসা রোগ। বাঁচতে হলে ঘুমোতেই হবে! ঘুমই হচ্ছে সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। ঘুম আপনার মস্তিষ্ক ও শরীরকে দেয় পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম। যার কারণে আপনি কর্মক্ষম থাকতে পারেন।আপনার মতো অনেক আছে যারা রাতের পর রাত শুয়ে জেগে থাকে, ঘুমানোর চেষ্টা করলেও তাদের ঘুম আসে না। আবার ঘুমানোর পর মধ্যরাতে জেগে যায়। চেষ্টার পরও আর ঘুমাতে পারে না। অনেকে এটাকে খুব সাধারণ ব্যাপার মনে করে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু, সারা দিনের কাজকর্ম শেষে শরীর ও ব্রেনের বিশ্রাম দরকার হয়। ঘুমের সমস্যা নিয়মিত চলতে থাকলে ক্রনিক (chronic) হয়ে পরে অসুখে পরিণত হয়। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে ইনসমনিয়া (insomnia)। 

                           কিন্তু ম্যাডাম আপনি জানেন তো আমি পেশায় একজন কামার ,লোকে আমাকে আর্টিস্ট বলে ঠিক ,আসলে আমি তো লোহা দিয়েই তৈরী করি ভাবনাদের। আগে আমার রাতে ঘুম হতো না ,ভাবনায় চলতো বিভিন্ন স্কাল্পচার কিন্তু এখন আমি ঘুমোলেই শুনতে পাই অন্ধকারের শব্দ ,ঘুম ভেঙে যায় বারংবার ,আসতে চাই না কোনো ভাবনা। শেষ দুমাস আমি তেমন কিছুই তৈরী করতে পারি নি ,শরীরের অবস্থা অবনতির জন্য শেষ মাসে আমার একটা প্রদর্শনীতে আমি নিজেই উপস্থিত থাকতে পারি নি। মনে হয় রাতের বিছানায় অন্ধকার যেন পা টিপে টিপে নিস্তব্ধে হাঁটে আমার ভিতর। 

- মিস প্রিয়াঙ্কা এই শহরের নাম করা মনোস্তত্ববিদ অম্লান কে প্রশ্ন করেন ,আপনি তো প্রায় মধ্যবয়স্ক বিয়ে করছেন ? বাড়িতে আর কে কে আছে ?

- অম্লানবেশ লজ্জিত ভাবে বলে কে নিয়ে করবে লোহা পোড়ানো মানুষটাকে ? এক প্রেমিকা ছিল কলেজ জীবনে ,সে চলে গেলো কারণ আমি তখনি এই অম্লান সাঁতরা হই নি। বাবা মারা গেছেন ক্লাস থ্রিতে  ,মা কলেজে থাকতে মারা গেছেন ,বাড়ি একলা আমি থাকি আর আজকাল রাত্রি হলে মনে হয় নিস্তব্ধ অন্ধকারের একটা ভাষা থাকে আমার সাথে। 

- মিস প্রিয়াঙ্কা প্রশ্ন করলেন আপনার বাবা কি করতেন ? বলুন না আপনার ছোটবেলা সম্পর্কে। 

- অম্লান বলতে শুরু করলো ,মায়ের কাছে শোনা বাবা দুর্গাপুর স্টিল ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন ,তেমন কোন স্মৃতি মনে নেই বাবার সাথে আমার শুধু একটা ছবি ছাড়া। মা অনেক কষ্ট করে বাবার অল্প পেনশনে আমাকে মানুষ করেন ,একটু বড়ো হওয়ার পর  যখন আমি স্কাল্পচার নিয়ে কলেজে পড়ি ,আমার লোহার ভাবনাগুলো অল্প অল্প নাম হচ্ছে তখন ,মাকে নিয়ে যায় আমার এক প্রদর্শনীতে ,কিন্তু অবাক কি জানেন আমার একটা স্কাল্পচারের সামনে দাঁড়িয়ে ,মা হঠাৎ বলেন লোহা তোকেও গিলে খাবে তোর বাবার মতো এবং পরমুহূর্তে হার্টফেল করে মারা যান।  

- মিস প্রিয়াঙ্কা এইবার অম্লান বাবুর কাছে সেই স্কাল্পচারটা সম্পর্কে জানতে চান এবং উত্তরে অম্লান বলে আছে এখনো ,আপনি চাইলে আপনাকে ওয়াটসাপে ছবি তুলে তুলে পাঠিয়ে দেব। 

- মিস প্রিয়ঙ্কা এইবার আবার বলেন আমার মনে হয় আপনার ঘুমের খুব দরকার। আমি কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি রাত্রে ঘুমের চেষ্টা করবেন আর শোয়ার আগে একবার চান করবেন। 


অম্লান সময় মতো ওষুধ খেয়েছে ,খাওয়া দাওয়া ঠিক করছে ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে আসার পর  থেকে সে কেমন ঝিমিয়ে থাকে আজকাল। বহুদিন কোন কাজ করা হয় নি ,মাথায় আজকাল ভাবনা আসে না। সামনে কানপুরে একটা অম্লানের প্রদর্শনী তার লিফলেট টা টেবিলের উপর পরে। অম্লান তুলে নিলো হাতে লেখা আছে  " লৌহ মানুষ " স্বীকৃতপ্রাপ্ত অম্লান সাঁতরা। অম্লানে হাসি পেল ,সে ঠিক করলো আজ সন্ধ্যেয় সে কিছু তৈরী করবে ,কিন্তু সে ভাবনা শুন্য বহুদিন। কি তৈরী করবে অম্লান ?ভাবতে ভাবতে মাথায় এলো সাইলেন্ট অফ ডেথ ,ঠিক এটাই তাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না তাই তৈরী করবে সে। 

   এগিয়ে গেলো স্টুডিওতে ,পাশে বার্ণারে সে কিছু লোহার গলা গলাতে দিলো। এসে বসলো সেই স্কাল্পচার তৈরী করার টেবিলটার পাশে রাখা  ,যেখানে সে তৈরী করেছে ইতিমধ্যে তার সব বিখ্যার সৃষ্টি। তুলে নিলো হাতে অম্লান অনেকটা মাটির তাল ,ভাবনাকে রূপ দিতে হবে তারপর ঢেলে দিতে হবে তারমধ্যে লাল রক্তের মতো লোহা। অম্লানের কাছে লোহা গলানো তরলটা আসলে ভাবনার লাভা ,যা মাঝে মাঝে ভাবনার বিস্ফোরণে ধ্বংস করে পৃথিবী ,নতুন সৃষ্টি হবে বলে। সে আনমনে মাটি নিয়ে খেলা করে ,কেমন ঝিম ঝিম করছে মাথাটা। আজকাল প্রায় সারাদিন কেমন ঘুম ঘুম পায় তার। অম্লান এগিয়ে যায় সামনে রাখা আয়নাটার দিকে ,আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিনতে পারে না নিজেকে। দানবের মতো চেহারা অম্লানের ,চোখের তলায় কালি,গালে বড় বড় দাঁড়ি ,অযত্নের একমাথা চুল ,এই কি সেই অম্লান ,যাকে প্রায় সাংস্কৃতিক মঞ্চে অভ্যর্থনা নিতে দেখা যায় খবরের পাতায়। অম্লান ঠিক করে আজ সে চান করবে ভালো করে,পরিষ্কার করবে নিজেকে  ,বহুদিন চান করা হয় নি ভালোকরে। এগিয়ে যায় বাথরুমের দিকে ,সাওয়ার চালিয়ে দেয়। কিন্তু এতো ধোঁয়া কেন ? অমলনা অবাক হয় তার সারা শরীরে কেমন শীত করছে ,ধোঁয়া বেরোচ্ছে শরীর থেকে। সওয়ার বন্ধ করে আবার চালায় ,না একই রকম ,কি হচ্ছে এটা ,তার শরীর থেকে এত ধোঁয়া বেরোচ্ছে কেন ?পাগলের মতো বেরিয়ে আসে বাথরুম থেকে ,টাওয়েল দিয়ে গা মুছতে গিয়ে টের পায় তার তালুতে ছেঁকা লাগছে ,সারা শরীর যেন আগুনের মতো জ্বলছে ,সে পাত্তা দেয় না এইসব। শুনতে পায় লোহা গলানোর মেশিনটা আওয়াজ করছে স্টুডিওর ভেতর থেকে ,এগিয়ে যায় সে টলোমলো পায়ে  স্টুডিওর দিকে। 

                       অম্লান অপেক্ষা করছিল তার সৃষ্টিটার  জন্য সাইলেন্ট অফ ডেথ। সে গলানো লোহা ঢেলে দিয়েছে অনেক্ষন তার মাটির ভাস্কর্যের ভিতর। এতক্ষন অপেক্ষা এযেন ছোটবেলায় দেখা সেই মুরগির ডিম্ ফুটে বাচ্ছা বেরোনোর মতো। প্রায় কতক্ষন চেয়ে আছে অম্লান তার সৃষ্টির দিকে খেয়াল নেই।শুধু তার গা ,হাত পা ,ভীষণ জ্বালা করছে ,মাথার চুল পুড়ছে ,চামড়া পোড়ার গন্ধ ,আর সহ্য করতে পারছে না সে ,চোখ বন্ধ করলো অম্লান।  

৩ 

খবরের কাগজে আজ একটা খবর পড়লো মনস্তত্ববিদ এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ  মিস প্রিয়াঙ্কা প্রখ্যাত লৌহ শিল্পী যিনি লৌহ মানুষ শিরোপায় ভূষিত অম্লান সাঁতরা কাল মধ্যরাতে নিজের স্টুডিওতে মারা গেছেন। পুলিশের অনুমান তিনি বহুদিন ধরে মনোরোগে ভুগছিলেন ,পুলিশ যখন উদ্ধার করে তার শরীরের অধিকাংশ  আগুনে প্রায় পুড়ে গেছে। খবরটা পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেলো প্রিয়ঙ্কার  ,আবার কোথাও মন ভালো হয়ে গেলো। অম্লান সেদিন তাকে চিনতে পারলো না ,মিথ্যে কথা বললো প্রেমিকা ছেড়ে গেছে। প্রিয়াঙ্কা পাগলের মতো ভালোবাসতো অম্লানকে ,আজও বসে তাই সেও অবিবাহিতা আজও। কিন্তু অম্লান নিজের স্বার্থের জন্য তাকে একলা ছেড়ে চলে গেলো মাদ্রাস ক্রিশ্চান আর্ট কলেজে ,ধীরে ধীরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলো ,ভাবলো না প্রিয়াঙ্কার কথা। কিন্তু প্রিয়াঙ্কা হেরে যায় নি সে হারতে পারে না ,অম্লানের সেটি পাওয়ার ছিল ,সেজন্য লাস্ট ভিসিটে সে অম্লানকে হয় ডোসেজ মাথা খারাপের ওষুধ দিয়েছিল। পাশে টেবিলে ফোনটা বেজে উঠলো ,২৪ x ৭ খবরের কাগজ থেকে রিপোর্টার প্রশ্ন করলো মিস প্রিয়ঙ্কাকে 

- আচ্ছা আপনি তো অম্লান বাবুর চিকিৎসা করছেলিন। মৃত্যুর আগে কি ওনার মধ্যে কিছু পাগলামী লক্ষ্য করেছিলেন ?