ভালোবাসিস আমায়
... ঋষি
নাগেরবাজারে সন্ধ্যের ভিড়ের মাঝে শান্তিলাল পথ হাঁটছে ধীর পায়ে। চারপাশে হকারের চিৎকার,ফুটপাথে এতো ভীর কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। তার মাথায় ঘুরছে চিন্তামনির মুখ । একটা স্ট্রিট লাইটের দিকে তাকিয়ে আছে অনেক্ষন সে ,এক জায়গায় দাঁড়িয়ে , খেয়াল নেই শান্তিলালের। তার মনে পড়ছে বিহার থেকে চিন্তামনির হাত ধরে পালিয়ে আসা দিনগুলো। কত স্বপ্ন ছিল চোখে সেদিন। চিন্তামণি তার গাঁয়ের বাবুই হালুয়ার বৌ ,মনে মনে বহুদিন শান্তিলাল চিন্তামনিকে অন্য চোখে দেখতো । ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতো গাঁয়ের কুঁয়োর পাশে ,কখন চিন্তামণি আসে ,একবার তাকায় ,একটু হাসে। না সে কোনোদিনই সাহস করে বলতে পারে নি তার মন কি বাত চিন্তামনিকে। বাবুয়ার বাজারে মিষ্টির দোকান ছিল ,সে সারাদিন গ্রামের ছোট মিষ্টির দোকানটায় বসে থাকতো আর বাড়িতে গিয়ে মদ খেয়ে মনের সুখে পেটাতো চিন্তামণিকে।
সেদিনটা যদি না আসতো তবে হয়তো আজকের দিনটা আসতো না শান্তিলালের জীবনে। সেদিনও মদ খেয়ে মুখচোখ ফাঁটিয়ে দিয়েছিল বাবুয়া চিন্তামনির ,বের করে দিয়েছিল ঘরের বাইরে। চিন্তামণি অন্ধকারে বসে ছিল বাবুয়ার ঘরের দুয়ারে ,অঝোরে কাঁদছিল সে। শান্তিলাল এমনিতেই সাইকেল ঘুরপাক খেতো বাবুয়ার বাড়ির আশেপাশে একবার যদি চিন্তামনিকে দেখতে পায়। সেদিন রাতেও শান্তিলাল গেছিল এবং সেই অবস্থায় চিন্তামনিকে দেখে আর স্থির থাকতে পারে নি ,ঘরে ঢুকে একটা হাতুড়ি দিয়ে খুন করে সে বাবুয়াকে। তারপর অসহায়ের মতো সে এসে দাঁড়ায় শান্তিলাল কাছে প্রশ্ন করে ,যাবি আমার সাথে ?
- কিছুটা ভীত ,কিছুটা ভয়ে চিন্তামণি শান্তিলতা বলে তুই যদি আমায় খুন করিস? ,
- শান্তিলাল পাগলের মতো জড়িয়ে ধরে চিন্তামনিকে ,বলে ভালোবাসি রে ,সাদি করবো তোর লাগে।
সেই রাতে শান্তিলাল আর চিন্তামণি গ্রাম ছাড়ে ,চলে আসে ভিড়ের শহর কলকাতায়। আজ আটমাস হয়েছে শান্তিলাল চিন্তামনিকে নিয়ে থাকে নাগেরবাজারের বস্তিতে ,আর কাজ করে সে সামনেই বাজারে একটা আটা ভাঙাবার দোকানে। বেশ তো চলছিল তাদের কিন্তু চিন্তামনির পেটে যে এখন তার ভালোবাসার সন্তান। প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে কত রার সে যে চিন্তামনির পেটে চুমু খেয়ে কাটিয়েছে। স্বপ্ন দেখেছে বলছে চিন্তামনিকে আমি তো আর পড়াশুনা করতে পারি নি বাবুকে পড়াবো। চিন্তামণি শুধু হেসেছে।
শান্তিলাল যে দোকানে কাজ করে ,সেই দোকান মালিকের ছেলে বিক্রম আজ বেশ কিছু দিন হলো তার বস্তিপাড়ার ঘরটায় আসে। বস্তুত বিহার থেকে আসার পর বিক্রমী ঠিক করে দেয় ওই ঘরটা ,ওই সূত্রে আলাপ ,বিক্রম সেদিন বলেছিল চিন্তামনিকে ভাবি কোনো ভাবনা নেই ,আমি তো রইলাম ,কোনো দরকার হলে আমাকে মনে করো আমি আছি ,আর মাঝে মধ্যে এসব তোমার হাতে চা খেতে। এতদিন গা করেনি শান্তিলাল কিন্তু আজ তার দোকানে বল্টু যখন শান্তিলালকে বললো তোর আর কাজ করে কি হবে ,এতো পয়সা কে খাবে তোর তো বৌ কামাচ্ছে রে দুহাতে ,কি কপাল মাইরি তোর। বিষয়টা পরিষ্কার হতে শান্তিলাল জানলো শান্তিলাল যখন কাজ করে বিক্রম যায় চিন্তামনির কাছে। শান্তিলতার মাথা গরম হয়ে গেছিল ,তবে কি শান্তিলতার পেটে বাচ্চাটা ?কি করবে এখন শান্তিলাল ?
অনেক রাতে ঘরে পা টলতে টলতে ফিরলো শান্তিলাল ,আজ একটু বাংলা বেশি চড়েছিল তার। দরজা খুললো চিন্তামণি বললো কি ব্যাপার এত রাত কেন ?
- উত্তরে শান্তিলাল বললে তোকে কি সব বলতে হবে,যা খেতে দে।
খাওয়ার থালায় বসে শান্তিলাল ডাল মুখে দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল ,কি এটা ? আর হবেই না কেন তোর কি এখন সময় আছে।
চিন্তামণি বড় অবাক চোখে তাকালো। বললো তার মানে ?
- চিন্তামণি বিশ্বাস করতে পারলো না ,কেঁদে বললো তুই আমায় অবিশ্বাস করিস ?
- শান্তিলাল চুলের মুঠি ধরে চিন্তামনিকে বললো এইজন্য বাবুয়া তোকে মারতো ,বদ চরিত্র মেয়েছেলে বেরো এখান থেকে।
অনেক সকালে ঘুম ভাঙলো শান্তিলালের ,বিছানায় দেখতো পেলো না চিন্তামনিকে। মনে পড়লো তার আগেরদিন রাত্রের কথা ,আঁতকে উঠলো সে। গামছা পরেই সে ছুটে যাচ্ছিল সে চিন্তামনিকে খুঁজতে। কিন্তু দরজা খুলে সে অবাক হলো চিন্তামণি বসে বসে ঘুমোচ্ছে বাইরের সিঁড়িতে ,তার চোখের কাজল গড়িয়ে নামছে সারা গাল বেয়ে। কেঁদে উঠলো শান্তিলাল ,ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তার ঘুমন্ত স্ত্রীকে ,চিন্তামণি চোখ খুললো ,শান্তিলাল বললো
- বড় ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দে রে, আর হবে না ,আর কষ্ট দেব না তোকে
আর চিন্তামণি শান্তিলালকে বললো
ভালোবাসিস আমায় ?
No comments:
Post a Comment