Thursday, January 28, 2021

আলাপ

 আলাপ 

... ঋষি 


অবিরত কিছুটা পথ হেঁটে চলা ,বুকের মাঝখানে একটা অধিকার থাকে সকলের। সম্পর্কের সাথে অধিকারের হিসেবনিকেশ শুধু একচেটিয়া ,যেখানে প্রশ্ন একটাই থাকে আর উত্তর হ্যা কি না। শীতের আমেজে যখন শহর বেশ  আদুরে অনুভূতি নিয়ে বসে ,যখন শহরের সব লোকেরা সদ্য কেটে যাওয়া ক্রিসমাস আর বড়দিনের কেকের আলোচনা  করছে ,তখন আলাপ তাকিয়ে আছে খুব দূরে ,হয়তো অপেক্ষা ,হয়তো তাও না ,জীবন একটা চলন্ত নিয়মের ছায়াছবি ,উত্থানপতন কিংবা পতন। 

এক্ষেত্রে শব্দটা একটা খালি ঘরে চমকে ওঠা বাসনের মাটিতে পরে যাওয়া। 

                       আলাপ নামটা রেখেছিল তার বাবা  খুব ভালোবেসে। আলাপের বাবা সার্জেন্ট বিপুল নস্কর শহরের নামকরা হার্টের ডাক্তার ,মা ছিলেন  স্কুলটিচার। আলাপের বাবার  মতে সম্পর্ক ,সংসার আর সন্তান সবটাই এক একটা আলাপ। 

নামটা ভালোবেসে রেখেছেলন এককালীন বিখ্যাত ডাক্তার আজকের বার্ধক্যের কাছে পরাজিত বিপুল বাবু। বিপুলবাবুর বাবু স্ত্রী নিরুপমা  হঠাৎ এই ব্যস্ত পাগল মানুষটাকে ছেড়ে তার বন্ধু অনিকেতের হাত ধরে। বিপুলবাবুকে যেদিন শেষবারের মতো নিরুপমা বলেন তোমার সাথে আর সংসার করা যাচ্ছে না বুঝলে ,পুরুষ হিসেবে মুরোদ তো তোমার কিছুই নেই ,আমি তো ফুরিয়ে যায় নি এখনো ,আমি চললাম ,বিপুলবাবু সেদিন বলেছিলেন নিরুপমা আলাপ শেষ হলো তবে ,নিরুপমা উত্তরে বলেছিল তা শেষ কি করে হবে ,আলাপ রইলো তোমার কাছে। 

                 সেই আলাপ আজ দুবছর হলো কলকাতায় হার্টের সার্জেন্ট ,ডাক্তারের সুবাদে তার নাম ডাক খুব। যারা আলাপকে খুব কাছ থেকে চেনে তারা জানে আলাপ ভীষণ একগুঁয়ে ,একালসেরে। তার বান্ধবী কিংবা প্রেমিকা সরগম বলে আলাপ এমন করলে কি তোর মা ফিরবে ,আমি তো আছি ,আমি তোর সবকিছু ,বাবা আছে আমাদের কথা ভাব ,হাস আলাপ ,দেখ পৃথিবী তোর জন্য অপেক্ষা করছে। আলাপ বলে সরগম তুই বুঝবি না ,এই দুঃখ শুধু আমার ,কেউ বুঝবে না। তোর মা যখন তোকে বুকে জড়িয়ে ধরে আমার হিংসে হয় ,তোর মা যখন তোকে বলে ভীষণ রোগা লাগছে তোকে কিংবা বুকে জড়িয়ে রাখে অসুখ হলে ,আমার হিংসে হয়। কেন ? কেন ? কেন আমার সাথে ? আমি কি এটি অযোগ্য যে মা আমায় ছেড়ে চলে গেলেন,আমার মায়ের মুখটাও মনে নেই ।

বাড়িতে বাবা কোন ছবি অবধি রাখেন নি মার।  

- সরগম বলে বাবা তো আছে 

- আলাপ বলে বাবা তো আমাকে ভালোবাসে ,সারাজীবন ধরে আমাকে বুকে আগলে মানুষ করেছেন ,কিন্তু বাবা কখনো মা হয় না ,ওই জায়গাটা আমার চিরকাল ফাঁকা থেকেছে। আমি বাবাকে দোষ দি না ,বাবার মতো মানুষ কম আছে 

উনি জানতেন আমি ওনার সন্তান না ,তবুও সব জেনেও আমাকে কখনো বুঝতে দেন নি। আমি সব জানি সরগম ,তবু চিৎকার করে বলতে পারি কষ্টগুলো বুক ফেটে যায়। 

আজ সকাল সকাল হাসপাতাল থেকে ফোন ,আলাপ কোনরকম নাকে মুখে গুঁজে হাসপাতালে বেরোচ্ছে ,নার্স এসে বললো বাবা ডাকছে। আলাপ বাবার কাছে এসে দাঁড়ালো ,প্রশ্ন করলো কেমন আছেন আজ  বাবা ? বাবা বললেন  আর কেমন ,এখন তো শুধু মৃত্যুর অপেক্ষা আলাপ ,তুই খেয়েছিস বাবা। আলাপ বললো ভাব্বেন না আপনি আমি ঠিক আছি। 

                          আলাপ এখন অপেরেশন থিয়েটারে ,সামনে মিসেস  মল্লিক ,তার হার্ট আজ অপারেশন করবে আলাপ ,পেসমেকার বসানো হবে। বাইরে প্রতিবারকার মতো মিসেস মল্লিকের পরিবার দাঁড়িয়ে। ঢোকার সময় মিস্টার মল্লিক বললেন বাবা উনি তোমার মায়ের বয়সী ,ঠিক করে দেবে তো। আলাপের আজ বহুদিন মা শব্দটা শুনলেই বুক পুড়ে যায় ,কান্না পায় ,আলাপ গম্ভীর ভাবে বললো আমি ডাক্তার ,ঈশ্বর নই ,যতটা হবে ঠিক করবো। 

                             মিসেস মল্লিকের অপেরেশন হয়ে গেছে আজ বারো দিন। আলাপ রেগুলার ভিসিটে মিসেস মল্লিকের ঘরে এসেছে। তার হাতে মিসেস মল্লিকের ট্রিটমেন্টের ফাইল ,সে খুঁটিয়ে দেখছে সবকিছু। মিসেস মল্লিক চেয়ে আছেন তার দিকে ,হঠাৎ তিনি বললেন তোমার নাম আলাপ না ,আমারও তোমার বয়সী একটা ছেলে ছিল। আলাপ শুনছিল কিছু উত্তর  দিচ্ছিল। আবার মিসেস মল্লিক বললো আমার ছেলের নামও আলাপ ছিল,বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। আলাপ এগিয়ে গেলো বললো ম্যাডাম প্লিজ কাঁদবেন না শরীর খারাপ করবে ,মিসেস মল্লিক আলাপের হাতটা ধরে বললেন বাবা কেমন আছে আলাপ ?

                           এইমাত্র বিপুল নস্কর মারা গেলেন। তার মৃত দেহের পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিসেস মল্লিক মানে অনিকেত মল্লিকের স্ত্রী আর আলাপ। আলাপ ছুটে এসেছিল বাবার কাছে সোজা হাসপাতাল থেকে ,বলেছিল মিসেস মুখার্জির কথা ,বিপুল নস্কর তার বালিশের নিচ থেকে একটা ছবি বের করে আলাপের হাতে দিয়েছিযেন  ,তারপর বললেন  আলাপ চিনতে পেরেছিস তবে মাকে ,আলাপ হলো আবার মায়ের সাথে। সেটাই বিপুল নস্করের শেষ কথা। মিসেস মল্লিক বললেন উনি বলতেন আলাপ শব্দটা আসলে সম্পর্কের অন্য নাম ,কেঁদে উঠলেন মিসেস মল্লিক।   আলাপ তাকিয়ে আছে খুব দূরে জানলার বাইরে ,হয়তো অপেক্ষা ,হয়তো তাও না ,জীবন একটা চলন্ত নিয়মের ছায়াছবি ,উত্থানপতন কিংবা পতন। 

No comments:

Post a Comment