মৃত্যু সুখ
... ঋষি
হাতের নখে রক্ত লেগে গেলে মানুষ বন্য হয়ে যায়। সবুজ প্রকৃতির সাথে মানুষের এক ব্যাপক মিল আছে। প্রকৃতি ততক্ষন সুন্দর যতক্ষণ দূষণ মাত্রা না পেরোয় ,মানুষ ততক্ষন স্থির থাকে ,সুন্দর হাসে কিন্তু যখনি সময়ের স্রোতগুলো দূষিত হয়ে যায় ,মানুষের ফুটে ওঠে হিংস্রতা। সভ্যতার শব্দ যদি কেউ ভালোভাবে শোনে শুনতে পারবে চিৎকার সময়ে ,সময় অর্থাৎ কাল যা মানুষকে কখনো কখনো ঈশ্বর থেকে শয়তান করে দেয় ,অথচ সমাজের মুখোশে ঢাকা সেই মানুষ তখন ভীষণ স্বাভাবিক ,ভীষণ জটিল ,হয়তো খতরনাক।
মিলন এক মনে তৈরী করার চেষ্টা করছে একটা মাটির ভাস্কর্য ,সামনে বসে আছে তার মডেল অনুসূয়া। মিলন সরকার প্রখ্যাত আর্টিস্ট যার ভাস্কর্য আজ সারা পৃথিবীতে সারা ফেলে দিয়েছে। তার ভাস্কর্যের সমালোচনা যারা করেন তারা বলেন
মিলনের ভাস্কর্যে থাকে নগ্নতা ,হিংস্রতা ,একটা সমাজের রূপ যা অতি অন্ধকার থেকে উঠে আসা। মিলন একমনে এই সময় একটা ভাস্কর্যকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে যা তার স্বপ্নে প্রায় আসে। এক রমণীর খোলা উত্তাল স্তন আর ঠিক মাঝখানে রক্তাক্ত কিছু আঁচড় অথচ সেই রমণীর মুখে হাসি বলে দিচ্ছে সে খুশি।
বিভীষিকা যেন আগুনেররূপ নিয়ে রমণীর চোখের হিংস্রতায় ,ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে সমস্ত শিকল ,রমণী জিভ দিয়ে নিজের বুকের রক্ত চেটে নিচ্ছে নিজের আঙ্গুল থেকে।
অনুসূয়া হঠাৎ বলে স্যার ওয়াশরুম ,
- মিলন খেঁচিয়ে ওঠে তোর কি আর মোতার সময় হয় না ,যা আর কি।
অনুসূয়া উঠে পা বাড়ায় ওয়াশরুমের দিকে। অনুসূয়া আজ প্রায় তিনবছর কাজ করছে মিলনের সাথে। সে জানে লোকটা পাগোল আছে ,কেমন একটা ফর্সা মুখের,ঝাকড়া মেয়েদের মতো গম্ভীর মিলন। তবে মানুষটা ভালো,মাস পরার আগেই টাকা দিয়ে দেয়। দু চারবার অনুসূয়া অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করেছে ,স্বার্থ ছিল অনুসূয়ার অবিবাহিত তার উপর প্রচুর টাকা আর অনুসূয়া খুব সাধারণ একটা মেয়ে যে শরীর বেচে খায়। এই যে মডেল হয়ে বসে থাকা সেটা একধরণের শরীর বেচাই তো। কি আছে তার শরীরে যা মিলন দেখে না ,হাত দিয়েও দেখে কিন্তু অদ্ভুত হলে মিলন যখন কাজের জন্য তার শরীরে হাত দেয় ,সেই স্পর্শে কোনো কাম থাকে না ,কেমন একটা শীতল হাত মিলনের। অধিকাংশ সময় কাজের অছিলায় মিলন অনুসূয়ার স্তনে হাত বোলায় কিংবা যখন মিলন তার কোনো স্ক্যাল্পচারে মাটি বোলায় তখন অনুসূয়া লক্ষ্য করেছে মিলনের চোখগুলো কোন হিংস্র জানোয়ারের মতো জ্বলতে থাকে। অনুসূয়া বহুবার জানতে চেষ্টা করেছে মিলনের সম্পর্কে ,তার পরিবার সম্পর্কে ,মিলন কিছু বলে নি ,শুধু ঝাঁঝিয়ে উঠেছে। কোনো এক ম্যাগাজিন পরে অনুসূয়া জানতে পেরেছে শুধু মিলন নদিয়ার ছেলে ,আর তার শুরুর সময় প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে। কানাঘুষায় শোনা মিলনের নাকি বিয়ে হয়েছিল কিন্তু সেই স্ত্রী আত্মহত্যা করে। অনুসূয়া এগিয়ে যায় ওয়াশরুমে সেখানে রোজকার মতো বেসিনে দেখতে পায় তাজা রক্তের কিছু ফোঁটা।
আজ অনেক রাত হয়ে গেছে অনুসূয়ার ,প্রায় দুটো তিনটে। মিলন আজ তার অদ্ভুত ভাস্কর্যটা শেষ করেছে। কি বিভৎস্য সেই ভাস্কর্য ,মানুষের মতো দেখতে কোনো রমণী ,অথচ মোটেও মানুষ না।অনুসূয়া ভীষণ ক্লান্ত সে খুব আবদারের সুরে মিলনকে বললো স্যার আজ বাড়ি যাবো না এখানেই থাকবো ,মিলন প্রথমে খেঁচিয়ে উঠলো তারপর কি মনে করে বললো ফ্রীজে খাবার আছে খেয়ে নিয়ে নিচের সিঁড়ির পাশের ঘরটায় ঘুমিয়ে পর গিয়ে। আমার এখনো কাজ শেষ হয় নি ,যা।
অনুসূয়ার ঘুম ভেঙে গেলো কেমন একটা মেয়েদের কান্না সে শুনতে পেলো উপরের ষ্টুডিও থেকে। মাথার উপর ঘড়িটায় তাকিয়ে সে দেখলো রাত তিনটে।
আবারো শুনলো শব্দটা ,শব্দটার মধ্যে কেমন একটা গা ছমছমে ব্যাপার আছে ,লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে অনুসূয়ার। কি করবে বুঝতে পারছিল না সে। যাবে উপরে ?ডাকবে স্যারকে ,স্যার কি করছে এখন। আবারো শুনলো আওয়াজটা ,আর স্থির থাকতে পারলো না অনুসূয়া। এগিয়ে গেলো সে সিঁড়ি বেয়ে স্টুডিওর দিকে।
নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিল না। স্যার ! সম্পূর্ণ নগ্ন একটা মানুষ ,ব্লেড দিয়ে চিঁড়ে দিচ্ছে বুকের মাঝখানটা আর সেখান থেকে রক্ত নিয়ে লেপে চলেছে সদ্য তৈরী করা মাটির ভাস্কর্যের বুকে। চিৎকার করছে মাঝে মাঝে মেয়েদের মতো ,
একি স্যারের যে নিম্নাংশে পুরুষের চিন্হ নেই। কেমন একটা হিংস্র রমণীর মতো মিলন তাকালো অনুসূয়ার দিকে ,তুই ? অজ্ঞান হয়ে গেলো অনুসূয়া।
সকালে অনুসূয়ার জ্ঞান ফিরলো মিলন স্যারের কাজের মেয়েটার জলের ছেটানোর স্পর্শে। সারা বাড়ি পুলিশ ,মিলন স্যার মারা গেছেন কাল রাতে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের জন্য। সাথে পাওয়া গেছে একটা সুইসাইট নোট। পুলিশ প্রশ্ন করেছিল অনুসূয়াকে আপনি তো কাজ করতেন এতদিন মিলনবাবুর সাথে আপনি কিছু অপ্রকৃতস্থ কিছু নজর করেছেন ? অনুসূয়া কিছু বলে নি। তবে সে পড়েছিল মিলন স্যারের শেষ মৃত্যু নোট ,যাতে লেখা ছিল
প্রিয় জীবন ,
আসলে ইতিহাস বলে কিছু হয় না আর এই সমাজের কাছে সাধারণ থাকাটা নিয়মে আর নিয়মের বাইরে সবটাই অনিয়ম। আমি সাধারণ নই ,অসাধারণ একজন নারী ,যাকে ছোটবেলায় বের করে দিয়েছে মা ,বাবা। যে হতে হতে চেয়েছিল মিনতি ,সে হয়ে গেছে সমাজের জন্য মিলন। কিন্তু তার ভিতরের নারী মোর নি এক মুহূর্তের জন্য , যে বন্ধুত্বের খোঁজে বিয়ে করেছিল এক বান্ধবীকে সেও ছেড়ে চলে গেছে অভিমানী মৃত্যুতে। তবে বেশ চলছিল লুকিয়ে লুকিয়ে এই অদ্ভুত জীবন কিন্তু আর সম্ভব হলো না ,আর সম্ভব হবে না ,তাই আমি চললাম।আমার তৈরী শেষ ভাস্কর্য যার নাম দিলাম " মৃত্যু সুখ ",সে হয়তো বদল আনতে পারবে আজকের সমাজের কিংবা সময়ের ,হয়তো ইতিহাস লিখবে সে। আমি চললাম ,
ইতি
মিলন
অনুসূয়া এগিয়ে গেলো স্যারের শেষ ভাস্কর্যের দিকে ,লাল রক্তে মাখা একজন মহিলা হিস্র চোখে তাকিয়ে এই সভ্যতার দিকে , স্যারের " মৃত্যু সুখ " ।
No comments:
Post a Comment