Saturday, January 30, 2021

সাইলেন্ট অফ ডেথ

সাইলেন্ট অফ ডেথ 

... ঋষি 

.

রাত্রের একটা নিজস্ব শব্দ আছে ,কান পাতলে আপনি শুনতে পাবেন নিজের গভীরে অজস্র টানেল ,অজস্র অজস্র আরো সরু টানেল দিয়ে আপনি হেঁটে চলেছেন। আসলে সেই সময় আপনার মন ভীষণ অস্থির ,কিংবা আরো গভীর করে বললে আপনার জীবনের অতৃপ্তিগুলো আপনাকে ব্যাকুল করছে ,মাথার নিউরনগুলো অস্থির আর ফলস্বরূপ ঘুম না আসা রোগ। বাঁচতে হলে ঘুমোতেই হবে! ঘুমই হচ্ছে সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। ঘুম আপনার মস্তিষ্ক ও শরীরকে দেয় পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম। যার কারণে আপনি কর্মক্ষম থাকতে পারেন।আপনার মতো অনেক আছে যারা রাতের পর রাত শুয়ে জেগে থাকে, ঘুমানোর চেষ্টা করলেও তাদের ঘুম আসে না। আবার ঘুমানোর পর মধ্যরাতে জেগে যায়। চেষ্টার পরও আর ঘুমাতে পারে না। অনেকে এটাকে খুব সাধারণ ব্যাপার মনে করে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু, সারা দিনের কাজকর্ম শেষে শরীর ও ব্রেনের বিশ্রাম দরকার হয়। ঘুমের সমস্যা নিয়মিত চলতে থাকলে ক্রনিক (chronic) হয়ে পরে অসুখে পরিণত হয়। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে ইনসমনিয়া (insomnia)। 

                           কিন্তু ম্যাডাম আপনি জানেন তো আমি পেশায় একজন কামার ,লোকে আমাকে আর্টিস্ট বলে ঠিক ,আসলে আমি তো লোহা দিয়েই তৈরী করি ভাবনাদের। আগে আমার রাতে ঘুম হতো না ,ভাবনায় চলতো বিভিন্ন স্কাল্পচার কিন্তু এখন আমি ঘুমোলেই শুনতে পাই অন্ধকারের শব্দ ,ঘুম ভেঙে যায় বারংবার ,আসতে চাই না কোনো ভাবনা। শেষ দুমাস আমি তেমন কিছুই তৈরী করতে পারি নি ,শরীরের অবস্থা অবনতির জন্য শেষ মাসে আমার একটা প্রদর্শনীতে আমি নিজেই উপস্থিত থাকতে পারি নি। মনে হয় রাতের বিছানায় অন্ধকার যেন পা টিপে টিপে নিস্তব্ধে হাঁটে আমার ভিতর। 

- মিস প্রিয়াঙ্কা এই শহরের নাম করা মনোস্তত্ববিদ অম্লান কে প্রশ্ন করেন ,আপনি তো প্রায় মধ্যবয়স্ক বিয়ে করছেন ? বাড়িতে আর কে কে আছে ?

- অম্লানবেশ লজ্জিত ভাবে বলে কে নিয়ে করবে লোহা পোড়ানো মানুষটাকে ? এক প্রেমিকা ছিল কলেজ জীবনে ,সে চলে গেলো কারণ আমি তখনি এই অম্লান সাঁতরা হই নি। বাবা মারা গেছেন ক্লাস থ্রিতে  ,মা কলেজে থাকতে মারা গেছেন ,বাড়ি একলা আমি থাকি আর আজকাল রাত্রি হলে মনে হয় নিস্তব্ধ অন্ধকারের একটা ভাষা থাকে আমার সাথে। 

- মিস প্রিয়াঙ্কা প্রশ্ন করলেন আপনার বাবা কি করতেন ? বলুন না আপনার ছোটবেলা সম্পর্কে। 

- অম্লান বলতে শুরু করলো ,মায়ের কাছে শোনা বাবা দুর্গাপুর স্টিল ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন ,তেমন কোন স্মৃতি মনে নেই বাবার সাথে আমার শুধু একটা ছবি ছাড়া। মা অনেক কষ্ট করে বাবার অল্প পেনশনে আমাকে মানুষ করেন ,একটু বড়ো হওয়ার পর  যখন আমি স্কাল্পচার নিয়ে কলেজে পড়ি ,আমার লোহার ভাবনাগুলো অল্প অল্প নাম হচ্ছে তখন ,মাকে নিয়ে যায় আমার এক প্রদর্শনীতে ,কিন্তু অবাক কি জানেন আমার একটা স্কাল্পচারের সামনে দাঁড়িয়ে ,মা হঠাৎ বলেন লোহা তোকেও গিলে খাবে তোর বাবার মতো এবং পরমুহূর্তে হার্টফেল করে মারা যান।  

- মিস প্রিয়াঙ্কা এইবার অম্লান বাবুর কাছে সেই স্কাল্পচারটা সম্পর্কে জানতে চান এবং উত্তরে অম্লান বলে আছে এখনো ,আপনি চাইলে আপনাকে ওয়াটসাপে ছবি তুলে তুলে পাঠিয়ে দেব। 

- মিস প্রিয়ঙ্কা এইবার আবার বলেন আমার মনে হয় আপনার ঘুমের খুব দরকার। আমি কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি রাত্রে ঘুমের চেষ্টা করবেন আর শোয়ার আগে একবার চান করবেন। 


অম্লান সময় মতো ওষুধ খেয়েছে ,খাওয়া দাওয়া ঠিক করছে ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে আসার পর  থেকে সে কেমন ঝিমিয়ে থাকে আজকাল। বহুদিন কোন কাজ করা হয় নি ,মাথায় আজকাল ভাবনা আসে না। সামনে কানপুরে একটা অম্লানের প্রদর্শনী তার লিফলেট টা টেবিলের উপর পরে। অম্লান তুলে নিলো হাতে লেখা আছে  " লৌহ মানুষ " স্বীকৃতপ্রাপ্ত অম্লান সাঁতরা। অম্লানে হাসি পেল ,সে ঠিক করলো আজ সন্ধ্যেয় সে কিছু তৈরী করবে ,কিন্তু সে ভাবনা শুন্য বহুদিন। কি তৈরী করবে অম্লান ?ভাবতে ভাবতে মাথায় এলো সাইলেন্ট অফ ডেথ ,ঠিক এটাই তাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না তাই তৈরী করবে সে। 

   এগিয়ে গেলো স্টুডিওতে ,পাশে বার্ণারে সে কিছু লোহার গলা গলাতে দিলো। এসে বসলো সেই স্কাল্পচার তৈরী করার টেবিলটার পাশে রাখা  ,যেখানে সে তৈরী করেছে ইতিমধ্যে তার সব বিখ্যার সৃষ্টি। তুলে নিলো হাতে অম্লান অনেকটা মাটির তাল ,ভাবনাকে রূপ দিতে হবে তারপর ঢেলে দিতে হবে তারমধ্যে লাল রক্তের মতো লোহা। অম্লানের কাছে লোহা গলানো তরলটা আসলে ভাবনার লাভা ,যা মাঝে মাঝে ভাবনার বিস্ফোরণে ধ্বংস করে পৃথিবী ,নতুন সৃষ্টি হবে বলে। সে আনমনে মাটি নিয়ে খেলা করে ,কেমন ঝিম ঝিম করছে মাথাটা। আজকাল প্রায় সারাদিন কেমন ঘুম ঘুম পায় তার। অম্লান এগিয়ে যায় সামনে রাখা আয়নাটার দিকে ,আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিনতে পারে না নিজেকে। দানবের মতো চেহারা অম্লানের ,চোখের তলায় কালি,গালে বড় বড় দাঁড়ি ,অযত্নের একমাথা চুল ,এই কি সেই অম্লান ,যাকে প্রায় সাংস্কৃতিক মঞ্চে অভ্যর্থনা নিতে দেখা যায় খবরের পাতায়। অম্লান ঠিক করে আজ সে চান করবে ভালো করে,পরিষ্কার করবে নিজেকে  ,বহুদিন চান করা হয় নি ভালোকরে। এগিয়ে যায় বাথরুমের দিকে ,সাওয়ার চালিয়ে দেয়। কিন্তু এতো ধোঁয়া কেন ? অমলনা অবাক হয় তার সারা শরীরে কেমন শীত করছে ,ধোঁয়া বেরোচ্ছে শরীর থেকে। সওয়ার বন্ধ করে আবার চালায় ,না একই রকম ,কি হচ্ছে এটা ,তার শরীর থেকে এত ধোঁয়া বেরোচ্ছে কেন ?পাগলের মতো বেরিয়ে আসে বাথরুম থেকে ,টাওয়েল দিয়ে গা মুছতে গিয়ে টের পায় তার তালুতে ছেঁকা লাগছে ,সারা শরীর যেন আগুনের মতো জ্বলছে ,সে পাত্তা দেয় না এইসব। শুনতে পায় লোহা গলানোর মেশিনটা আওয়াজ করছে স্টুডিওর ভেতর থেকে ,এগিয়ে যায় সে টলোমলো পায়ে  স্টুডিওর দিকে। 

                       অম্লান অপেক্ষা করছিল তার সৃষ্টিটার  জন্য সাইলেন্ট অফ ডেথ। সে গলানো লোহা ঢেলে দিয়েছে অনেক্ষন তার মাটির ভাস্কর্যের ভিতর। এতক্ষন অপেক্ষা এযেন ছোটবেলায় দেখা সেই মুরগির ডিম্ ফুটে বাচ্ছা বেরোনোর মতো। প্রায় কতক্ষন চেয়ে আছে অম্লান তার সৃষ্টির দিকে খেয়াল নেই।শুধু তার গা ,হাত পা ,ভীষণ জ্বালা করছে ,মাথার চুল পুড়ছে ,চামড়া পোড়ার গন্ধ ,আর সহ্য করতে পারছে না সে ,চোখ বন্ধ করলো অম্লান।  

৩ 

খবরের কাগজে আজ একটা খবর পড়লো মনস্তত্ববিদ এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ  মিস প্রিয়াঙ্কা প্রখ্যাত লৌহ শিল্পী যিনি লৌহ মানুষ শিরোপায় ভূষিত অম্লান সাঁতরা কাল মধ্যরাতে নিজের স্টুডিওতে মারা গেছেন। পুলিশের অনুমান তিনি বহুদিন ধরে মনোরোগে ভুগছিলেন ,পুলিশ যখন উদ্ধার করে তার শরীরের অধিকাংশ  আগুনে প্রায় পুড়ে গেছে। খবরটা পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেলো প্রিয়ঙ্কার  ,আবার কোথাও মন ভালো হয়ে গেলো। অম্লান সেদিন তাকে চিনতে পারলো না ,মিথ্যে কথা বললো প্রেমিকা ছেড়ে গেছে। প্রিয়াঙ্কা পাগলের মতো ভালোবাসতো অম্লানকে ,আজও বসে তাই সেও অবিবাহিতা আজও। কিন্তু অম্লান নিজের স্বার্থের জন্য তাকে একলা ছেড়ে চলে গেলো মাদ্রাস ক্রিশ্চান আর্ট কলেজে ,ধীরে ধীরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলো ,ভাবলো না প্রিয়াঙ্কার কথা। কিন্তু প্রিয়াঙ্কা হেরে যায় নি সে হারতে পারে না ,অম্লানের সেটি পাওয়ার ছিল ,সেজন্য লাস্ট ভিসিটে সে অম্লানকে হয় ডোসেজ মাথা খারাপের ওষুধ দিয়েছিল। পাশে টেবিলে ফোনটা বেজে উঠলো ,২৪ x ৭ খবরের কাগজ থেকে রিপোর্টার প্রশ্ন করলো মিস প্রিয়ঙ্কাকে 

- আচ্ছা আপনি তো অম্লান বাবুর চিকিৎসা করছেলিন। মৃত্যুর আগে কি ওনার মধ্যে কিছু পাগলামী লক্ষ্য করেছিলেন ?



No comments:

Post a Comment