বীরপুরুষ
... ঋষি
ঘুম ভেঙে উঠে বসলো বিনু ,পাশে মা নেই ,এই খাটে বিনু ঘুমোয়
না,এটা ঠাকুমার খাট ।পাশের ঘরে বাবার গলার স্বর পাওয়া যাচ্ছে ,ঠাকুমাকে বলছে বাবা ,
মা এত ভেবো না মিনু ঠিক হয়ে যাবে ।এখন করোনা অনেকের হচ্ছে আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছে,এত ভেবো
না ।বিনুর মা আজ পাঁচ দিন হলো হাসপাতালে ভর্তি ।কি যে এক রোগ এসেছে পৃথিবীতে
,সবাইকে ঘর বন্দী করে রেখেছে । বিনু ক্লাস টু থেকে থ্রিতে উঠে গেলো স্কুলে না গিয়ে অনলাইনে পরীক্ষা দিয়ে
।এখন লকডাউন চলছে ,বাবারও অফিস বন্ধ ,বিনু আড়াল থেকে দেখেছে ঠাকুমা খবর শুনলে খালি
কাঁদে ।বাবা বন্ধুদের সাথে ফোনে কথা বললে সে শুনেছে বাবাকে বলতে আর চলছে না বুঝলি এই তো লকডাউন
থেকে উঠলাম তার মধ্যে আবার লকডাউন ,জমানো টাকা প্রায় শেষ তারমধ্যে মিনু হাসপাতালে
,সংসারটা বাঁচাতে পারলে হয় ।বিনু মাঝে মাঝে ভাবে সংসার মানে কি ?ছোটবেলায় সে পড়েছে
ফ্যামিলি ,বাবা ,মা ,ঠাকুমা ,দাদু এদেরকে
নিয়ে ফ্যামিলি ।দাদু মারা গেছেন আগের বছর করোনাতেই ,বাবা ঠাকুমা সবাই খুব কেঁদেছিল
,মা বলেছিল বিনুকে দাদু নাকি অন্ধকার আকাশের তারা হয়ে গেছেন। ঠাকুমার এখন শোয়ার ঘরে খাটের পাশে দাদুর একটা ছবি আছে ।
কাল রাতে বিনু একটা স্বপ্ন দেখেছে ,দাদুর সাথে সে পার্কে গেছে ,পাশের বাড়ির অঞ্জলি দি আর সেই ধিমান বলে দাদাটা পাশাপাশি বসে গল্প করছে ।একটা ষাঁড়দু ম করে কোথা থেকে ছুটে আসছে অঞ্জলি দির দিকে ,ধিমান দা ছুটে পালিয়ে গেলো অঞ্জলিদিকে ফেলে ,বিনু বীরপুরুষ হয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ষাঁড়টার ,ষাঁড়টা পালাচ্ছে ।অঞ্জলি দি বিনুকে কোলে তুলে চুমু খাচ্ছে ,কি অসভ্য বিনু দি ,সে কি আর ছোট আছে নাকি ? দাদু হাততালি দিচ্ছে ।বিনু ঠাকুমার গলা শুনতে পাছছে ঠাকুমা বলছে দাদুভাই এইবার মুখ ধুয়ে নেও তোমার অনলাইন ক্লাস শুরু হবে ।
বিনুর আর ভাল লাগছে না ,এই দুপুরে সারা বাড়ি শান্ত ।বাবা
খবরের কাগজ পড়ছে ,ঠাকুমা ঘুমোচ্ছে ,বিনু অনেক্ষন ধরে একটা কাগজের প্লেন তৈরি করতে চাইছে
পারছে না ,মা বলেছিল শিখিয়ে দেবে ।বাইরে একটা কোকিল ডাকছে অসময়ে ,বিনু জানে কোকিল
বসন্ত কালে ডাকে ,এখন তো গ্রীষ্মকাল কোকিল ডাকছে কেন ? বিনুর মায়ের জন্য মন খারাপ
করছে ,মায়ের মতো কেউ ভালোবাসে না তাকে ,সে উঠে গেলো বাবার কাছে ,বাবাকে প্রশ্ন করলো
,বাবা মা কবে আসবে ।বাবা বিনুকে কোলে বসিয়ে বললো আসবে তো খুব তাড়াতাড়ি ।বিনু
বাবাকে বললো আমাকে একটা কাগজের প্লেন তৈরি করে দেবে ?
আজ সন্ধ্যে থেকে বিনুর মাথাটা ভারি লাগছে ,বাবাকে খুব
চিন্তিত লাগছে ,ডাক্তার কাকুকে ফোন করে বাবা বলছে হ্যাঁ জ্বর আছে ১০১.১ ডিগ্রি ।বাবা ফোন নামিয়ে ঠাকুমাকে
বলছে আমি ওষুধ নিয়ে আসছি মা তুমি ভেবো না ।
ঠাকুমা বলছে ছেলেটা হয়েছে বাদর ,সারা দুপুর জেগে থাকে
একটু ঘুমোয় না ,বৌমা হাসপাতালে ভর্তি হাতির পাঁচ পা দেখেছে ,ঠান্ডা গরম লেগেছে ।আমার বয়স হয়েছে আর আমি
পারি না ,একলা হাতে কত করা যায়। বিনু ভাবছে
আচ্ছা মা থাকলে কি ঠাকুমার মতো এমন করতো তার জ্বর এলে ,নাকি বুকে জড়িয়ে বলতো দেখ
দুষ্টুমি করিস এত, জ্বর এলো ,এখন আমি কি করি বাবু ?
বিনু এখন আর চোখ খুলে চাইতে পারছে না ,সে অদ্ভুত ঘোরে যেন স্বপ্ন দেখেছে ।আকাশের
গায়ে লাল লাল অক্ষরে লেখা লকডাউন ।সারা আকাশময় হাজারো কাগজের এরোপ্লেন ,প্রতিটা এরোপ্লেনের
উপর এক একজন বসে ।ওইতো মা ,ওইতো বাবা ,দাদু ,ঠাকুমা ,অঞ্জলি দি,ধিমান দা ,স্কুলের দিদিমণি,
শুধুই উড়ছে ।সবাই চীৎকার করছে আর পারছি না ,আর পারছি না
......।
বিনু যেন রবিঠাকুরের বীরপুরুষ,তার হাতে এক বিশাল হাতুড়ি
,সে বলছে আমি সব তালা ভাঙছি এখুনি ।এই দেখো
ভাঙলাম স্কুলের তালা ,এই দেখো ভাঙছি বাজারের তালা ,এই যে বাবা তোমার অফিসের তালা
,মা তোমার হাসপাতালের তালা ।
বিনু আজ চারদিন পর চোখ খুললো ,তার পাশে মা রয়েছে ,মা
কবে ফিরে এলো ?মা বাবাকে বলছে কি গো কিছু করো না ,বাবুর যে জ্বর কমে না ,বাবা বলছে
তুমি এত চাপ নিয়ো না সদ্য সুস্থ হয়েছো ,বাবুর করোনা হয় নি ,রিপোর্ট নেগেটিভ।বিনু
মাকে বললো ক্লান্ত গলায় মা তুমি ভেবো না ,আমি বীরপুরুষ ঠিক হয়ে গেছি ,বলে ভাবের ঘোরে
আবৃত্তি করতে লাগলো
মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে ......।
No comments:
Post a Comment