Thursday, May 20, 2021

মিস্টার অনিরুদ্ধ

 

 

মিস্টার অনিরুদ্ধ

... ঋষি

 

পৃথিবীতে  আদিম রিপুদের মধ্যে অন্যতম ক্রোধ ।মিস্টার অনিরুদ্ধ পাঠক ডি এস পি কোলকাতা পুলিশ এই মুহুর্তে রাগে ঠক ঠক করে কাঁপছেন কারন আর এক ইঞ্চির জন্য তার বুলেট টা অপরাধীকে না ছুঁয়ে চলে গেলো আর সেই ফাঁকে অপরাধী চম্পট।মিস্টার পাঠক এই মুহূর্তে কলকাতা পুলিশের সবচেয়ে প্রতিভাবান পুলিশ অফিসার ,তার দাপটে এই মুহূর্তে কলকাতার ক্রিমিনাল এক্টিভিটি অনেক কমেছে ।কিন্তু শেষ চারসপ্তাহে এক খুনীর দাপটে কলকাতায় চারটি খুন হয়েছে ,প্রতিবারে খুনী খুব সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে একইরকম ভাবে খুনগুলো করেছে,কোন প্রমান সে রাখে নি ।,কলকাতা গোয়েন্দা ডিপারট্মেন্ট এর কাছ থেকে খবর ছিল আগেভাগে এইবার ,কিন্তু সামান্য দেরি করে পুলিশ ব্যবাসায়ীর বাড়ি পৌঁছোয় আর খুনী শেষ মুহূর্তে ছাদ বেয়ে পালাবার সময় মিস্টার পাঠক গুলিটা করেন কিন্তু এক ইঞ্চির জন্য গুলিটা ফস্কায়,খুনী সেই সুযোগে চম্পট ।এই কেসে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার খুনীর টার্গেট সকলেই বড় বড় ব্যাবসায়ী ,খুনীর সাথে ব্যাবসায়ীদের কোন আগের যোগাযোগ নেই ,নেই কোন শ্ত্রুতা ,খুনের মটো তাই কিছুতেই ক্লিয়ার নয় পুলিশের কাছে ।

                                          মিস্টার অনিরুদ্ধ বাড়ি ঢুকলেন ,তার ল নিয়ে কলেজে পড়া মেয়ে প্রিয়া ছুটে এলো বললো কি নিপাত হলো ?অনিরুদ্ধ চমকে উঠলেন ,প্রিয়া কি করে জানলো ।প্রিয়া বুদ্ধিমতি মেয়ে সে বাবার মুখ দেখে বললো ,পালিয়েছে তাই ডিপ্রেসড ।অনিরুদ্ধ বললো তুই কি করে জানলি ?প্রিয়া হেসে বললো যেদিন তোমার কোন ক্রিমিনাল অপেরেশান থাকে তুমি সকালে ঘুম থেকে উঠে এক্সারসাইজ করো ,কম কথা বলো ,আর যদি অপেরাশান সাকসেসফুল হয় বাড়ি ফিরে প্রচুর কথা বলো আর ফেইলুওর হলে মুখ ছোট হয়ে যায় তোমার ।অনিরুদ্ধ অবাক হলও প্রিয়া তার মা মরা মেয়ে ,অনেক যত্নে তিনি তাকে মানুষ করছেন ,সে কত বড় হয়ে গেছে ।অনিরুদ্ধ মনে মনে মেয়েকে নিয়ে গর্ব বোধ করলেন এতটুকু মেয়ের লক্ষ্য দেখে ,তবু তিনি মুখে বললেন আজ কলেজ যাও  নি কেন ?প্রিয়া বললো কলেজ মানুষকে বইয়ের শিক্ষা দিতে পারে কিন্তু মানুষের গভীর শিক্ষা তার বোধ ,সুবিনয় বলে যতদিন এই দেশে উঁচু নিচু গরীব বড়লোক ভেদাভেদ থাকবে এই দেশের কিছু হবে না ।মিস্টার অনিরুদ্ধ ধ্মকের সুরে বললেন তোমাকে না বলেছি ওই ডেঁপো ছেলেটার সাথে একদম মিশবে না ,মা বাপের ঠিক নেই তার । প্রিয়া বললো সুবিনয় বলে যারা খুব সহজে খাবার ,শিক্ষা আর চিকিৎসা পায় তারা আসলে দেশের সাধারন  মানুষের ব্যাথা বুঝবে না ,এই ভারতের আজো সত্তর শতাংশ দেশবাসীর জাতীয় ইনকাম মাসে তিনশো টাকা ,তারা বাঁচে কি করে আমরা শহরবাসীরা তার খবর রাখি না কারন আমরা স্বার্থপর টাকার গোলামী করি ।যতদিন না মানুষের অর্থনীতিতে সাম্যতা আসবে ততদিন দেশের প্রগতি সম্ভব নয় ।মিস্টার অনিরুদ্ধ খানিকটা তন্ময় হয়ে মেয়ের কথা শুনছিলেন ,তিনি এবার বললেন এত ডেঁপোমি করতে হবে না যাও অঞ্জলিদিকে খেতে  দিতে বলো আমি চান করে আসছি তারপর বিকেলে আজকের গল্পটা বলবো ।

অনিরুদ্ধ ঘুম থেকে উঠে অঞ্জলিকে এককাপ চা দিতে বসে খবরের কাগজটা খুলে বসলেন ,খবর পড়ে চমকে উঠলেন ,গড়িয়াহাটের সিমেন্ট ব্যাবসায়ী শ্যামসুন্দর আগারওয়ালের খুন ,খুনের অস্ত্র প্লাস্টিক ব্যাগ ,শ্বাস রোধ করে খুন করা হইয়েছে।অনিরুদ্ধ অবাক হলেন কাল ওই ভদ্রলোককেই একটুর জন্য বাঁচানও গেছে কোনরকম আজ সে আর নেই ,খুন ।গতকাল থেকে ওই গড়িয়াহাটের ব্যাবসায়ীর বাড়িতে পুলিশ প্রোটেকশান লাগানো হয়েছিল ,তা সত্বেও পুলিশকে কাঁচকলা দেখিয়ে খুন ,এ তো রীতিমত সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ ।মুডটা সকাল সকাল তেতো হয়ে গেলো অনিরুদ্ধের ,আএ এই সময় হাতের মুঠোফোনটা বেজে উঠলো ,অফিসের ফোন ,অনিরুদ্ধকে ইমিডিয়েট রেপোর্ট করতে বলা হইয়েছে হেডফিসে ।

 

 

হেডঅফিস থেকে বেড়িয়ে এলো অনিরুদ্ধ,রাজ্যের মন্ত্রী থেকে সমস্ত আমলারা ছিল মিটিং এ  ।অনিরুদ্ধ সহ সমস্ত পুলিশফোর্স কে রীতিমত ওয়ারনিং দেওয়া হলো ,একটা রাজ্যে এত পুলিশ ,গয়েন্দা এত শক্তি থাকা সত্বেও পর পর পাঁচটা খুন ,এদিকে মিডিয়া নাকি মাথার চুল ছিঁড়ে নিচ্ছে ,লজ্জা কি লজ্জা ! অনিরুদ্ধের উপর ভরসা রেখে মন্ত্রী বলেছেন পারলে আপনি পারবেন অনিরুদ্ধ বাবু ,আপনার হাতে সাতদিন আছে ,আপনাকে সমস্ত ক্ষমতা দেওয়া হলো,খুনীকে জীবিত বাঁ মৃত যেমন পারুন ধরুন ।

 

প্রিয়া দেখছে কলেজের গেটে সুবিনয় একটা মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রর নীতি সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ের উপর কিছু বলছে ,তাকে ঘিরে আছে অনেক স্টুডেন্ট ।সুবিনয় যা বলে তার বেশিরভাগ প্রিয়ার মাথার উপরদিয়ে বেড়িয়ে গেলেও কিছুটা ঢুকছে ।সুবিনয় বলছে কোন রাষ্ট্র একদিনে নিজের পায়ে দাঁড়ায় না তার পেছোনে থাকে সাধারন মানুষের ঘাম ,রক্ত আর সার্থহীন সত্যি ।যদি দেশ গড়তে হয় সাম্যতা দরকার ,দরকার মানুষের বেঁচে থাকার সমস্ত অধিকারের সমঅধিকার আর অধিকার কেউ দেয় না ,ইতিহাস সাক্ষী তা কেড়ে নিতে হইয়েছে চিরকাল ।সেই কারণে আগামী ১৭ ই জুন আমরা গান্ধিমুর্তির পাদদেশ অবধি মিছিল করবো ,বন্ধুরা আপনাদের উপস্থিতি কাম্য ।

প্রিয়া আর সুবিনয় হেঁটে যাচ্ছে কলেজস্ট্রিট দিয়ে পাশ দিয়ে একটা ট্রাম এগিয়ে যাচ্ছে বউবাজারের দিকে ।প্রিয়া বলছে সে আর হাঁটতে পারছে না সাথে গাড়ি থাকা সত্বেও হাঁটাটা বোকামি ,কিন্তু সুবিনয় কিছুতেই  গাড়িতে চলে না ,সে বলে আরাম মানুষকে নষ্ট করে ,সে প্রিয়াকে বলেছে এই যে প্রিয়ার বিলাব্যাসন ,গাড়ি ,বাড়ি সব তার বাবা কাউকে না কাউকে ডিপ্রাইভ করে করেছে ।সুবিনয়ের মতে যে দেশে অর্ধেকের উপর মানুষ প্রতিদিন প্রায় না খেয়ে থাকে সে দেশে গাড়ি চড়াটা অপরাধ ।প্রিয়া বলে সে তার বাবার একমাত্র মেয়ে ,তার বাবার সবকিছু তারই অধিকার ,সুবিনয় ফস করে জ্বলে ওঠে ,অধিকার !আর সাধারন মানুষের অধিকার ,আমার যদি ক্ষমতা থাকতো এই অধিকারওয়ালা গুলোকে আগে গুলি করে মাড়তাম ।তারপর সুবিনয় বললো ধর একদিন আমি তোর বাবার মাথায় বন্ধুকের নল ধ রে আছি তুই কি করবি ,আমাকে ভালবাসবি নাকি বাবার গলা জড়িয়ে ধড়বি ।প্রিয়া বললো সুবিনয় তুমি যদি বাবার সম্পর্কে এমন বলো আমি তোমার সাথে কোন সম্পর্ক রাখবো না । ছোটবেলায় মা মারা গেছে আমার বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে বড় করেছেন ।এইসময় একটা মারুতি ভ্যান এসে থামলও কতগুলো ছেলে আর সুবিনয় মিলে প্রিয়াকে জোর করে গাড়িতে তুলছে ,তারা কি যেন চেপে ধরেছে একটা প্রিয়ার নাকে ,প্রিয়া আর চেয়ে থাকতে পারছে না ।

প্রিয়ার মুখের উপর জল ছেটাচ্ছে সুবিনয়,প্রিয়া চোখ খুলছে ।প্রিয়া চোখ খুলে বুঝতে পারছে সে একটা নোংরা বস্তির মতো কোথাও আছে ,চারদিকদিয়ে দুর্গন্ধ আসছে ,সুবিনয় প্রিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে ,কি বিশ্বাস হচ্ছে না তো ,আমারও হচ্ছে না ,আর কোন উপায় ছিল না ,একদিন আগে তোর বাবার কারণে মরতে মরতে বেঁচেছি ,কি করছি আমরা ?একটা সম, অধিকারের দেশ চাইছি ,অন্যায় ।আর তোর বাবা সময়ের দালাল হয়ে আমাদের বিপ্লবের বুকে ছুরি মারছে ।  মা কসম বলছি অনিরুদ্ধ পাঠক তোর বাবা না হলে শেষ করে দিতাম ,তোর বাবা বলে তোকে গায়েব করলাম ।সুবিনয় তোর কোন ক্ষতি আমরা করবো না শুধু তোর বাবাকে এই কেস থেকে সরতে হবে , দেখা যাক তোর বাবা তোকে কত ভালোবাসে ।জল খাবি বলে সুবিনয় প্রিয়ার মুখের বাঁধনটা খুলে দিল ,প্রিয়া একমুখ থুথু ছুঁড়ে মারল সুবিনয়ের মুখে তারপর বললো এই জন্য বাবা তোমার সাথে মিশতে বারণ করতো আমি শুনি নি ,বাবা ঠিক বলে বাপ মায়ে খেদানো ছেলে ,আর কি আশা করা যায় তোমার  থেকে ।প্রিয়া বল;ছে সুবিনয় আমি তোমাকে বাহাদুর ভাবতাম ,কিন্তু তুমি খুব সাধারণ ,শুধু মুখে বড় কথা বললে বিপ্লব হয় না ,তুমি আমাকে কিডন্যাপ করে বিপ্লব করবে ।সুবিনয় আর সহ্য করতে পারলো না ,এক থাপ্পড় মারলো প্রিয়াকে ,বললো ,মানুষের সমঅধিকারের জন্য যদি আমি পাঁচটা খুন করতে পারি তবে তোকে খুন করতে আমার বাঁধবে না ,তাছাড়া আমি দোষ করলে তুইও করেছিস ,তুই তোর বাবার সব খবর আমাকে দিস আর টাকা পয়সা দিয়েও আমাদের হেল্প করিস । প্রিয়া কেঁদে উঠলো তুমি আমাকে ইউটিলাইস করলে সুবিনয় দা ?

দিল্লী থেকে গোয়েন্দার বড় অফিসার মিস্টার ভাটস এইমুহুর্তে  দাঁড়িয়ে আছেন দুটো মৃতদেহের সামনে ।উনি ধীরে ধীরে মৃতদেহদুটির মুখের ঢাকনা সরালেন প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বল্লেন চিনতে পারছো ?প্রিয়া কেঁদে উঠলো তার বাবা আর সুবিনয়দা ।মিস্টার ভাটস খুব শান্ত হয়ে প্রিয়াকে বললেন তুমি এর সম্বন্ধে কিছুই জানতে না তাই না ?তুমি কিডন্যাপ হবার পর তোমার বাবা আর সুবিনয়ের দল মিলে মন্ত্রীর মেয়েকে কিডন্যাপ করে ,আসলে তোমার বাবা ভয় পেয়ে গেছিলেন ওনাকে ডেকে যখন সাতদিন সময় দেওয়া হয় খুনীকে ধরতে ।তোমার বাবাই তোমাকে কিডন্যাপ করান যাতে তার  দিকে কোনভাবে কেউ আঙ্গুল না তুলতে পারেন ,কিন্তু ভুল করেন অন্য জায়গায় ,তিনি যে চিঠিটা মেয়ের কিডণ্যাপারের চিঠি বলে কেস থেকে সরে যেতে চান সেটা আমাদের এক্সপার্টরা তোমার বাবার হাতের লেখা বলে ধরে ফেলেন ,তবুও আমদের কাছে মোটিভ ক্লিয়ার হচ্ছিল না।আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারি তোমার মা যখন মারা যান ,তুমি তখন তুমি খুব ছোট ,উনি তখন মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন ,বেশ কিছুদিন সেই সময় অনিরুদ্ধ বাবু পাগলা গারদে ছিলেন ,পরে তিনি সুস্থ ভাবে ফিরে আসেন কিন্তু নিয়মিত তিনি অষুধ খেতেন ।তিনি অপেক্ষা করছিলেন তোমাকে বড় করার জন্য।সুবিনয়ের সাথে পরিচয় ওনার সেই পাগলা গারদে থাকা কালীন ,পাশের একটা অনাথ হোস্টেলে সুবিনয় পড়তো ,খোঁজ নিয়ে জেনেছি সুবিনয়ের পড়ার খরচা সমস্তটাই অনিরুদ্ধ বাবু চালাতেন ।অনিরুদ্ধ বাবুর মধ্যে আসলে দুটি চরিত্র বাস করতো একজন বাবা এবং একজন নকশাল । নিজেকে তিনি একজন বিপ্লবী নকশাল মনে করে সুবিনয়ের মতো কিছু লক্ষ্যভ্রস্ট যুবকদের নিয়ে দল তৈরী করেন পুঁজিবাদী মানুষ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ,কিন্তু উনি ভুলে গেছিলেন এটা নকশাল  যুগ নয় ,এটা পুঁজিবাদী যুগ নয় এ যুগ সাধারন মানুষের ।যাই হোক মিস প্রিয়া আমরা মানে মন্ত্রীসভার কেউ চান না তোমার বাবার কথা জানাজানি হোক তবে লোকে পুলিশের উপর আর বিশ্বাস রাখতে পারবে না ,বরং আমরা সংবাদ মাধ্যমে এই কথা বলবো মিস্টার অনিরুদ্ধ কিছু কুখ্যাত সমাজবিরোধীর সাথে গুলির লড়াইয়ে নিজের কর্তব্যরক্ষায় মারা যান ।প্রিয়া এই সময় বাবাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো ।

No comments:

Post a Comment