অনুযোগ
... ঋষি
অনুযোগ খুব শান্ত ভাবে তাকিয়ে আছে মৃত্তিকার দিকে ,ভোরের শেষ আলো যেন আলগা বেশে গড়িয়ে নামছে মৃত্তিকার সারা শরীর বেয়ে ,মুগ্ধ অনুযোগের হোটেলের এই রুমটাকে কেন যেন স্বর্গ মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। অনুযোগ সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে সমুদ্রের ধারে জানালাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ,ডুবে যায় ভাবনায়।
অনুযোগ ব্যানার্জি পেশায় সফটওয়ার ইঞ্জিয়ার ,ভালো চাকরি ,নিউটাউনের নিজের ফ্ল্যাট ,বিবাহিত ,শ্রীপর্ণা অনুযোগের স্ত্রী ,বড়োলোকের মেয়ে। তার স্ত্রী চাকরি করে কোনো এক কর্পোরেটে এইচ আরের ভূমিকায়। অনুযোগ আর শ্রীপর্ণার সুখে থাকার কথা ছিল ,অনুযোগ বাড়ির কথার বিরুদ্ধে ভালোবেসে শ্রীপর্ণাকে বিয়ে করে,বিয়ের শুরুর দিকে পাঁচ বছর বেশ ভালোই ছিল তারা। তারপর পর্ণা হলো ,কেমন যেন অনুযোগের পৃথিবীটা আটকে গেলো দশটা পাঁচটার চাকরি আর সংসার এই দুয়ের ফাঁকে। শ্রীপর্ণা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ছিল তাদের মেয়ে আর তার নিজের চাকরি নিয়ে। কখন অনুযোগের মনে হতে শুরু হয়েছিল পৃথিবীটা বোধহয় এইভাবেই চলছে সবকিছু মেনে নিতে হয়। ক্রমশ কথা বলা কমছিল স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ,শুরু হয়ে গেছিল ভুল বোঝাবুঝি। মেয়ের স্কুল ,বাজার হাট ,গাড়ির ,ফ্লাটের ই এম আই ,অনুযোগ হাঁপিয়ে উঠছিল ,হাঁপিয়ে উঠছিল জীবন থেকে ,ঠিক সেই সময় মৃত্তিকা যেন দেবীর মতো অনুযোগের সামনে এসে দাঁড়ায়।
মৃত্তিকা গ্রামের মেয়ে ,তার স্বামী মারা গেছে বহুদিন হলো ,নিজের বলতে তার এক ছেলে থ্রিতে পড়ে আর তার মা। কোনো এক অদ্ভুত সকালে মৃত্তিকার সাথে জীবন থেকে হেরে যাওয়া অনুযোগের দেখা হয় যেখানে অনুযোগ সকালে জগিং করতো। প্রথম মৃত্তিকাকে দেখেই কেন যে অনুযোগের ভীষণ কাছের মনে হয়েছিল ,মেয়েটা খুব সুন্দর হাসে আর সুন্দর কথা বলে। ক্রমশ প্রতিদিন দেখা হতে হতে অনুযোগ প্রায় ভালো লাগা থেকে একদিন বিকেলে মৃত্তিকার সাথে দেখা করতে চায় ,সেই বিকেলের দেখা প্রথম বন্ধুত্বের ছিল তারপর কখন যেন গভীর থেকে গভীর হতে হতে হৃদয়ের হয়ে গেলো। এখন নিয়ম করে অনুযোগ সংসারের ফাঁকে ,সময়ের ফাঁকে দেখা করে মৃত্তিকার সাথে। মৃত্তিকা মেয়েটা ভালো সে কখনও কিছু চাই অনুযোগের থেকে ,শুধু গভীর মুহূর্তে অনুযোগকে বলে আমার কিছু চায় না ,শুধু সাথে থেকো। অনুযোগ আজকাল কেন জানি মুক্তি খোঁজে সংসার থেকে কিন্তু প্রতিবারই আটকে যায় তার মেয়ের পর্ণার জন্য।
বেশ কিছু দিন হলো অনুযোগ হাঁপিয়ে উঠছে ,ক্রমশ সে যে মৃত্তিকার খুব কাছের কেউ হয়ে গেছে। কিছুতেই তার মন বসে না মৃত্তিকা ছাড়া ,অফিসের কাজের ভুল হয় ,কথা বলতে ভুলে যায় কি বলবে ,ক্লাইন্ট মিটিং এ প্রায়ই তাকে অপ্রস্তুত হতে হচ্ছে এর জন্য। বাড়িতে তার মন টেকে না কিছুতেই ,কিছুতেই নিজের আয়নার মুখোমুখি হতে পারে না অনুযোগ ,শ্রীপর্ণার সাথে প্রায়শই কথাকাটাকাটি হয় ,বিবাহিত এই সম্পর্কটা যেন তলানিতে এসে থেকেছে তার। অনুযোগ মৃত্তিকা সব বলে ,মৃত্তিকা বলে আমি আছি তো ,পালাচ্ছি না আর শোনো অনুযোগ আমরা তো আর কলেজে পড়ি না ,ধৈর্য ধরো সময় একটা রাস্তা বের করবে ঠিক।
দেখতে দেখতে সময় কাটে ,অনুযোগ আর মৃত্তিকা রাস্তা হারিয়ে রাস্তা খুঁজতে থাকে ,খুঁজতে থাকে নিশ্বাস একসাথে বাঁচবে বলে। আজ দু বছর হলো মৃত্তিকার মাও মারা গেছে এরমধ্যে ,মৃত্তিকার ছেলে আকাশ এখন চাকরি করে ব্যাংকে ,অনুযোগের মেয়ে পর্ণার এবছর শেষ সেমিস্টার। অনুযোগের স্ত্রী শ্রীপর্ণা এখন নিজের অফিসের বস প্রায়ই তাকে দেশের বাইরে যেতে হয়। অনুযোগের চারিপাশে সবাই বেশ ভালো আছে একমাত্র অনুযোগ আর মৃত্তিকা ছাড়া। অনুযোগ সেদিন মৃত্তিকাকে বলছিল এইবার সময় হলো কি বলো আমাদের একসাথে থাকার আর একসাথে বাঁচার ,মৃত্তিকা হেসেছিল একইরকম বলেছিল আমি তো আছি তাড়াহুড়ো তো কিছু নেই।
অনুযোগ সাঁতার জানে না তবুও সে এগিয়ে চলেছে সমুদ্রের দিকে ,সে এগিয়ে চলছে বাঁচার জন্য ,নিঃশ্বাসের জন্য । গত দুদিন অনুযোগ ভালো ছিল দিঘার এই হোটেলে মৃত্তিকার সাথে ,সময় হয়তো ভাবছে শুধু শরীর আসলে তা না ,অনুযোগ তার মানুষটাকে নিয়ে ভালো ছিল। অনুযোগ তার স্ত্রীকে সবকথা সত্যি বলেছিল ,মৃত্তিকাও বলেছিল তার ছেলেকে ,আকাশ অনেকটা অবাক হয়ে তার মার দিকে দেখেছিল কারণ মৃত্তিকা ধরেছিল একজন পঞ্চাশ উর্ধ মানুষের হাত। আসলে এইবার অনুযোগের সব স্বপ্ন গুলো সত্যি হওয়ার ছিল কিন্তু বাদ সাধলেন বিধাতা ,মৃত্তিকার গতকাল রাতে হার্ট এট্যাক হয় ,ডাক্তার এসে ঘোষণা করে সব শেষ। তবু সারারাত্রি অনুযোগ বুকের কাছে আগলে ধরে শুয়ে ছিল মৃত্তিকার ঠান্ডা শরীরটা ,একটুও কাঁদে নি সে শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সে মৃত্তিকার মুখ ,জীবনের ,মুখ। ভোররাতে কলকাতা থেকে ছুটে এসেছিল আকাশ ,অনেক কথা শুনিয়েছিল সে অনুযোগকে কিন্তু সে কিছুই উত্তর দেয় নি ,শুধু বোকার মতো চেয়ে ছিল আকাশের মুখে। সমস্ত কাজ শেষ হওয়ার পর অনুযোগ ডুকরে কেঁদে ওঠে ,আকাশ অনুযোগের কাঁধে হাত রেখে বলে এইবার কি করবে কাকু ?
-কলকাতা ফিরবে ,আমার সাথে গাড়ি আছে ?
-অনুযোগ হাসে , আকাশকে বলে এইবার বাঁচবো ,তুমি ভালো থেকো বাবা।
এই মুহূর্তে অনুযোগ প্রায় সমুদ্রের অনেকটা গভীরে আরেকটা পা বারবার আছে তার বাঁচবার জন্য। অনুযোগ এখন জলের তলায় বুঝতে পারছে তার কষ্ট হচ্ছে ,সে তবু বালিতে পা দিয়ে এগোচ্ছে ,যেন সে এগোচ্ছে মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা শেষ মুহূর্তে বলেছিল ভয় পেয়ো না আমি তো আছে ,হ্যা মৃত্তিকা আছে ,অনুযোগের শরীরটা জলে ভাসছে যেন মৃত্তিকার নরম বুকে ,অনুযোগ চোখ বুজছে।
No comments:
Post a Comment