Saturday, January 30, 2021

ভালোবাসিস আমায়

 ভালোবাসিস আমায় 

... ঋষি 


নাগেরবাজারে সন্ধ্যের  ভিড়ের মাঝে শান্তিলাল পথ হাঁটছে ধীর পায়ে। চারপাশে হকারের চিৎকার,ফুটপাথে এতো ভীর  কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। তার মাথায় ঘুরছে চিন্তামনির মুখ । একটা স্ট্রিট লাইটের দিকে তাকিয়ে আছে অনেক্ষন সে ,এক জায়গায় দাঁড়িয়ে , খেয়াল নেই শান্তিলালের। তার মনে পড়ছে বিহার থেকে চিন্তামনির হাত ধরে পালিয়ে আসা দিনগুলো। কত স্বপ্ন ছিল চোখে সেদিন। চিন্তামণি তার গাঁয়ের বাবুই হালুয়ার বৌ ,মনে মনে বহুদিন শান্তিলাল চিন্তামনিকে অন্য চোখে দেখতো । ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতো গাঁয়ের কুঁয়োর পাশে ,কখন চিন্তামণি আসে ,একবার তাকায় ,একটু হাসে। না সে কোনোদিনই সাহস করে বলতে পারে নি তার মন কি বাত চিন্তামনিকে। বাবুয়ার বাজারে  মিষ্টির দোকান ছিল ,সে সারাদিন গ্রামের ছোট মিষ্টির দোকানটায় বসে থাকতো আর বাড়িতে গিয়ে মদ খেয়ে মনের সুখে পেটাতো চিন্তামণিকে।

 সেদিনটা যদি না আসতো তবে হয়তো আজকের দিনটা আসতো না শান্তিলালের জীবনে। সেদিনও মদ খেয়ে মুখচোখ ফাঁটিয়ে দিয়েছিল বাবুয়া চিন্তামনির ,বের করে দিয়েছিল ঘরের বাইরে। চিন্তামণি অন্ধকারে বসে ছিল বাবুয়ার ঘরের দুয়ারে ,অঝোরে কাঁদছিল সে। শান্তিলাল এমনিতেই সাইকেল ঘুরপাক খেতো বাবুয়ার বাড়ির আশেপাশে একবার যদি চিন্তামনিকে দেখতে পায়। সেদিন রাতেও শান্তিলাল গেছিল এবং সেই অবস্থায় চিন্তামনিকে দেখে আর স্থির থাকতে পারে নি ,ঘরে ঢুকে একটা হাতুড়ি দিয়ে খুন করে সে বাবুয়াকে। তারপর অসহায়ের মতো সে এসে দাঁড়ায় শান্তিলাল  কাছে প্রশ্ন করে ,যাবি আমার সাথে ?

- কিছুটা ভীত ,কিছুটা ভয়ে চিন্তামণি  শান্তিলতা বলে তুই যদি আমায় খুন করিস? ,

- শান্তিলাল পাগলের মতো জড়িয়ে ধরে চিন্তামনিকে ,বলে ভালোবাসি রে ,সাদি করবো তোর লাগে। 

সেই রাতে শান্তিলাল আর চিন্তামণি গ্রাম ছাড়ে ,চলে আসে ভিড়ের শহর কলকাতায়। আজ আটমাস হয়েছে শান্তিলাল চিন্তামনিকে নিয়ে থাকে নাগেরবাজারের বস্তিতে ,আর কাজ করে সে সামনেই বাজারে একটা আটা ভাঙাবার দোকানে। বেশ তো চলছিল তাদের কিন্তু চিন্তামনির পেটে যে এখন তার ভালোবাসার সন্তান। প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে কত রার সে যে চিন্তামনির  পেটে চুমু খেয়ে কাটিয়েছে। স্বপ্ন দেখেছে বলছে চিন্তামনিকে আমি তো আর পড়াশুনা করতে পারি নি বাবুকে পড়াবো। চিন্তামণি শুধু হেসেছে। 

                  শান্তিলাল যে দোকানে কাজ করে ,সেই দোকান মালিকের ছেলে বিক্রম আজ বেশ কিছু দিন হলো তার বস্তিপাড়ার ঘরটায় আসে। বস্তুত বিহার থেকে আসার পর বিক্রমী ঠিক করে দেয় ওই ঘরটা ,ওই সূত্রে আলাপ ,বিক্রম সেদিন বলেছিল চিন্তামনিকে ভাবি কোনো ভাবনা নেই ,আমি তো রইলাম ,কোনো দরকার হলে আমাকে মনে করো আমি আছি ,আর মাঝে মধ্যে এসব তোমার হাতে চা খেতে। এতদিন গা করেনি শান্তিলাল কিন্তু আজ তার দোকানে বল্টু যখন শান্তিলালকে বললো তোর আর কাজ করে কি হবে ,এতো পয়সা কে খাবে তোর তো বৌ কামাচ্ছে রে দুহাতে ,কি কপাল মাইরি তোর। বিষয়টা পরিষ্কার হতে শান্তিলাল জানলো শান্তিলাল যখন কাজ করে বিক্রম যায় চিন্তামনির কাছে। শান্তিলতার মাথা গরম হয়ে গেছিল ,তবে কি শান্তিলতার পেটে বাচ্চাটা ?কি করবে এখন শান্তিলাল ?

অনেক রাতে ঘরে পা টলতে টলতে  ফিরলো শান্তিলাল ,আজ একটু বাংলা বেশি চড়েছিল তার। দরজা খুললো চিন্তামণি বললো কি ব্যাপার এত রাত কেন ?

- উত্তরে শান্তিলাল বললে তোকে কি সব বলতে হবে,যা খেতে দে। 

খাওয়ার থালায় বসে শান্তিলাল ডাল মুখে দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল ,কি এটা ? আর হবেই না কেন তোর কি এখন সময় আছে।

চিন্তামণি  বড় অবাক চোখে তাকালো। বললো তার মানে ?

-  চিন্তামণি বিশ্বাস করতে পারলো না ,কেঁদে বললো তুই আমায় অবিশ্বাস করিস ?

- শান্তিলাল চুলের  মুঠি ধরে চিন্তামনিকে বললো এইজন্য বাবুয়া তোকে মারতো ,বদ চরিত্র মেয়েছেলে বেরো এখান থেকে। 

অনেক সকালে ঘুম ভাঙলো শান্তিলালের ,বিছানায় দেখতো পেলো না চিন্তামনিকে। মনে পড়লো তার আগেরদিন রাত্রের কথা ,আঁতকে উঠলো সে। গামছা পরেই সে ছুটে যাচ্ছিল সে চিন্তামনিকে খুঁজতে। কিন্তু দরজা খুলে সে অবাক হলো চিন্তামণি বসে বসে ঘুমোচ্ছে  বাইরের সিঁড়িতে ,তার চোখের কাজল গড়িয়ে নামছে সারা গাল বেয়ে। কেঁদে উঠলো শান্তিলাল  ,ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তার ঘুমন্ত স্ত্রীকে ,চিন্তামণি চোখ খুললো ,শান্তিলাল বললো 

- বড় ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দে রে, আর হবে না ,আর কষ্ট দেব না তোকে 

আর চিন্তামণি শান্তিলালকে বললো 

ভালোবাসিস আমায় ?  

     

সাইলেন্ট অফ ডেথ

সাইলেন্ট অফ ডেথ 

... ঋষি 

.

রাত্রের একটা নিজস্ব শব্দ আছে ,কান পাতলে আপনি শুনতে পাবেন নিজের গভীরে অজস্র টানেল ,অজস্র অজস্র আরো সরু টানেল দিয়ে আপনি হেঁটে চলেছেন। আসলে সেই সময় আপনার মন ভীষণ অস্থির ,কিংবা আরো গভীর করে বললে আপনার জীবনের অতৃপ্তিগুলো আপনাকে ব্যাকুল করছে ,মাথার নিউরনগুলো অস্থির আর ফলস্বরূপ ঘুম না আসা রোগ। বাঁচতে হলে ঘুমোতেই হবে! ঘুমই হচ্ছে সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। ঘুম আপনার মস্তিষ্ক ও শরীরকে দেয় পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম। যার কারণে আপনি কর্মক্ষম থাকতে পারেন।আপনার মতো অনেক আছে যারা রাতের পর রাত শুয়ে জেগে থাকে, ঘুমানোর চেষ্টা করলেও তাদের ঘুম আসে না। আবার ঘুমানোর পর মধ্যরাতে জেগে যায়। চেষ্টার পরও আর ঘুমাতে পারে না। অনেকে এটাকে খুব সাধারণ ব্যাপার মনে করে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু, সারা দিনের কাজকর্ম শেষে শরীর ও ব্রেনের বিশ্রাম দরকার হয়। ঘুমের সমস্যা নিয়মিত চলতে থাকলে ক্রনিক (chronic) হয়ে পরে অসুখে পরিণত হয়। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে ইনসমনিয়া (insomnia)। 

                           কিন্তু ম্যাডাম আপনি জানেন তো আমি পেশায় একজন কামার ,লোকে আমাকে আর্টিস্ট বলে ঠিক ,আসলে আমি তো লোহা দিয়েই তৈরী করি ভাবনাদের। আগে আমার রাতে ঘুম হতো না ,ভাবনায় চলতো বিভিন্ন স্কাল্পচার কিন্তু এখন আমি ঘুমোলেই শুনতে পাই অন্ধকারের শব্দ ,ঘুম ভেঙে যায় বারংবার ,আসতে চাই না কোনো ভাবনা। শেষ দুমাস আমি তেমন কিছুই তৈরী করতে পারি নি ,শরীরের অবস্থা অবনতির জন্য শেষ মাসে আমার একটা প্রদর্শনীতে আমি নিজেই উপস্থিত থাকতে পারি নি। মনে হয় রাতের বিছানায় অন্ধকার যেন পা টিপে টিপে নিস্তব্ধে হাঁটে আমার ভিতর। 

- মিস প্রিয়াঙ্কা এই শহরের নাম করা মনোস্তত্ববিদ অম্লান কে প্রশ্ন করেন ,আপনি তো প্রায় মধ্যবয়স্ক বিয়ে করছেন ? বাড়িতে আর কে কে আছে ?

- অম্লানবেশ লজ্জিত ভাবে বলে কে নিয়ে করবে লোহা পোড়ানো মানুষটাকে ? এক প্রেমিকা ছিল কলেজ জীবনে ,সে চলে গেলো কারণ আমি তখনি এই অম্লান সাঁতরা হই নি। বাবা মারা গেছেন ক্লাস থ্রিতে  ,মা কলেজে থাকতে মারা গেছেন ,বাড়ি একলা আমি থাকি আর আজকাল রাত্রি হলে মনে হয় নিস্তব্ধ অন্ধকারের একটা ভাষা থাকে আমার সাথে। 

- মিস প্রিয়াঙ্কা প্রশ্ন করলেন আপনার বাবা কি করতেন ? বলুন না আপনার ছোটবেলা সম্পর্কে। 

- অম্লান বলতে শুরু করলো ,মায়ের কাছে শোনা বাবা দুর্গাপুর স্টিল ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন ,তেমন কোন স্মৃতি মনে নেই বাবার সাথে আমার শুধু একটা ছবি ছাড়া। মা অনেক কষ্ট করে বাবার অল্প পেনশনে আমাকে মানুষ করেন ,একটু বড়ো হওয়ার পর  যখন আমি স্কাল্পচার নিয়ে কলেজে পড়ি ,আমার লোহার ভাবনাগুলো অল্প অল্প নাম হচ্ছে তখন ,মাকে নিয়ে যায় আমার এক প্রদর্শনীতে ,কিন্তু অবাক কি জানেন আমার একটা স্কাল্পচারের সামনে দাঁড়িয়ে ,মা হঠাৎ বলেন লোহা তোকেও গিলে খাবে তোর বাবার মতো এবং পরমুহূর্তে হার্টফেল করে মারা যান।  

- মিস প্রিয়াঙ্কা এইবার অম্লান বাবুর কাছে সেই স্কাল্পচারটা সম্পর্কে জানতে চান এবং উত্তরে অম্লান বলে আছে এখনো ,আপনি চাইলে আপনাকে ওয়াটসাপে ছবি তুলে তুলে পাঠিয়ে দেব। 

- মিস প্রিয়ঙ্কা এইবার আবার বলেন আমার মনে হয় আপনার ঘুমের খুব দরকার। আমি কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি রাত্রে ঘুমের চেষ্টা করবেন আর শোয়ার আগে একবার চান করবেন। 


অম্লান সময় মতো ওষুধ খেয়েছে ,খাওয়া দাওয়া ঠিক করছে ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে আসার পর  থেকে সে কেমন ঝিমিয়ে থাকে আজকাল। বহুদিন কোন কাজ করা হয় নি ,মাথায় আজকাল ভাবনা আসে না। সামনে কানপুরে একটা অম্লানের প্রদর্শনী তার লিফলেট টা টেবিলের উপর পরে। অম্লান তুলে নিলো হাতে লেখা আছে  " লৌহ মানুষ " স্বীকৃতপ্রাপ্ত অম্লান সাঁতরা। অম্লানে হাসি পেল ,সে ঠিক করলো আজ সন্ধ্যেয় সে কিছু তৈরী করবে ,কিন্তু সে ভাবনা শুন্য বহুদিন। কি তৈরী করবে অম্লান ?ভাবতে ভাবতে মাথায় এলো সাইলেন্ট অফ ডেথ ,ঠিক এটাই তাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না তাই তৈরী করবে সে। 

   এগিয়ে গেলো স্টুডিওতে ,পাশে বার্ণারে সে কিছু লোহার গলা গলাতে দিলো। এসে বসলো সেই স্কাল্পচার তৈরী করার টেবিলটার পাশে রাখা  ,যেখানে সে তৈরী করেছে ইতিমধ্যে তার সব বিখ্যার সৃষ্টি। তুলে নিলো হাতে অম্লান অনেকটা মাটির তাল ,ভাবনাকে রূপ দিতে হবে তারপর ঢেলে দিতে হবে তারমধ্যে লাল রক্তের মতো লোহা। অম্লানের কাছে লোহা গলানো তরলটা আসলে ভাবনার লাভা ,যা মাঝে মাঝে ভাবনার বিস্ফোরণে ধ্বংস করে পৃথিবী ,নতুন সৃষ্টি হবে বলে। সে আনমনে মাটি নিয়ে খেলা করে ,কেমন ঝিম ঝিম করছে মাথাটা। আজকাল প্রায় সারাদিন কেমন ঘুম ঘুম পায় তার। অম্লান এগিয়ে যায় সামনে রাখা আয়নাটার দিকে ,আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিনতে পারে না নিজেকে। দানবের মতো চেহারা অম্লানের ,চোখের তলায় কালি,গালে বড় বড় দাঁড়ি ,অযত্নের একমাথা চুল ,এই কি সেই অম্লান ,যাকে প্রায় সাংস্কৃতিক মঞ্চে অভ্যর্থনা নিতে দেখা যায় খবরের পাতায়। অম্লান ঠিক করে আজ সে চান করবে ভালো করে,পরিষ্কার করবে নিজেকে  ,বহুদিন চান করা হয় নি ভালোকরে। এগিয়ে যায় বাথরুমের দিকে ,সাওয়ার চালিয়ে দেয়। কিন্তু এতো ধোঁয়া কেন ? অমলনা অবাক হয় তার সারা শরীরে কেমন শীত করছে ,ধোঁয়া বেরোচ্ছে শরীর থেকে। সওয়ার বন্ধ করে আবার চালায় ,না একই রকম ,কি হচ্ছে এটা ,তার শরীর থেকে এত ধোঁয়া বেরোচ্ছে কেন ?পাগলের মতো বেরিয়ে আসে বাথরুম থেকে ,টাওয়েল দিয়ে গা মুছতে গিয়ে টের পায় তার তালুতে ছেঁকা লাগছে ,সারা শরীর যেন আগুনের মতো জ্বলছে ,সে পাত্তা দেয় না এইসব। শুনতে পায় লোহা গলানোর মেশিনটা আওয়াজ করছে স্টুডিওর ভেতর থেকে ,এগিয়ে যায় সে টলোমলো পায়ে  স্টুডিওর দিকে। 

                       অম্লান অপেক্ষা করছিল তার সৃষ্টিটার  জন্য সাইলেন্ট অফ ডেথ। সে গলানো লোহা ঢেলে দিয়েছে অনেক্ষন তার মাটির ভাস্কর্যের ভিতর। এতক্ষন অপেক্ষা এযেন ছোটবেলায় দেখা সেই মুরগির ডিম্ ফুটে বাচ্ছা বেরোনোর মতো। প্রায় কতক্ষন চেয়ে আছে অম্লান তার সৃষ্টির দিকে খেয়াল নেই।শুধু তার গা ,হাত পা ,ভীষণ জ্বালা করছে ,মাথার চুল পুড়ছে ,চামড়া পোড়ার গন্ধ ,আর সহ্য করতে পারছে না সে ,চোখ বন্ধ করলো অম্লান।  

৩ 

খবরের কাগজে আজ একটা খবর পড়লো মনস্তত্ববিদ এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ  মিস প্রিয়াঙ্কা প্রখ্যাত লৌহ শিল্পী যিনি লৌহ মানুষ শিরোপায় ভূষিত অম্লান সাঁতরা কাল মধ্যরাতে নিজের স্টুডিওতে মারা গেছেন। পুলিশের অনুমান তিনি বহুদিন ধরে মনোরোগে ভুগছিলেন ,পুলিশ যখন উদ্ধার করে তার শরীরের অধিকাংশ  আগুনে প্রায় পুড়ে গেছে। খবরটা পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেলো প্রিয়ঙ্কার  ,আবার কোথাও মন ভালো হয়ে গেলো। অম্লান সেদিন তাকে চিনতে পারলো না ,মিথ্যে কথা বললো প্রেমিকা ছেড়ে গেছে। প্রিয়াঙ্কা পাগলের মতো ভালোবাসতো অম্লানকে ,আজও বসে তাই সেও অবিবাহিতা আজও। কিন্তু অম্লান নিজের স্বার্থের জন্য তাকে একলা ছেড়ে চলে গেলো মাদ্রাস ক্রিশ্চান আর্ট কলেজে ,ধীরে ধীরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলো ,ভাবলো না প্রিয়াঙ্কার কথা। কিন্তু প্রিয়াঙ্কা হেরে যায় নি সে হারতে পারে না ,অম্লানের সেটি পাওয়ার ছিল ,সেজন্য লাস্ট ভিসিটে সে অম্লানকে হয় ডোসেজ মাথা খারাপের ওষুধ দিয়েছিল। পাশে টেবিলে ফোনটা বেজে উঠলো ,২৪ x ৭ খবরের কাগজ থেকে রিপোর্টার প্রশ্ন করলো মিস প্রিয়ঙ্কাকে 

- আচ্ছা আপনি তো অম্লান বাবুর চিকিৎসা করছেলিন। মৃত্যুর আগে কি ওনার মধ্যে কিছু পাগলামী লক্ষ্য করেছিলেন ?



Thursday, January 28, 2021

আলাপ

 আলাপ 

... ঋষি 


অবিরত কিছুটা পথ হেঁটে চলা ,বুকের মাঝখানে একটা অধিকার থাকে সকলের। সম্পর্কের সাথে অধিকারের হিসেবনিকেশ শুধু একচেটিয়া ,যেখানে প্রশ্ন একটাই থাকে আর উত্তর হ্যা কি না। শীতের আমেজে যখন শহর বেশ  আদুরে অনুভূতি নিয়ে বসে ,যখন শহরের সব লোকেরা সদ্য কেটে যাওয়া ক্রিসমাস আর বড়দিনের কেকের আলোচনা  করছে ,তখন আলাপ তাকিয়ে আছে খুব দূরে ,হয়তো অপেক্ষা ,হয়তো তাও না ,জীবন একটা চলন্ত নিয়মের ছায়াছবি ,উত্থানপতন কিংবা পতন। 

এক্ষেত্রে শব্দটা একটা খালি ঘরে চমকে ওঠা বাসনের মাটিতে পরে যাওয়া। 

                       আলাপ নামটা রেখেছিল তার বাবা  খুব ভালোবেসে। আলাপের বাবা সার্জেন্ট বিপুল নস্কর শহরের নামকরা হার্টের ডাক্তার ,মা ছিলেন  স্কুলটিচার। আলাপের বাবার  মতে সম্পর্ক ,সংসার আর সন্তান সবটাই এক একটা আলাপ। 

নামটা ভালোবেসে রেখেছেলন এককালীন বিখ্যাত ডাক্তার আজকের বার্ধক্যের কাছে পরাজিত বিপুল বাবু। বিপুলবাবুর বাবু স্ত্রী নিরুপমা  হঠাৎ এই ব্যস্ত পাগল মানুষটাকে ছেড়ে তার বন্ধু অনিকেতের হাত ধরে। বিপুলবাবুকে যেদিন শেষবারের মতো নিরুপমা বলেন তোমার সাথে আর সংসার করা যাচ্ছে না বুঝলে ,পুরুষ হিসেবে মুরোদ তো তোমার কিছুই নেই ,আমি তো ফুরিয়ে যায় নি এখনো ,আমি চললাম ,বিপুলবাবু সেদিন বলেছিলেন নিরুপমা আলাপ শেষ হলো তবে ,নিরুপমা উত্তরে বলেছিল তা শেষ কি করে হবে ,আলাপ রইলো তোমার কাছে। 

                 সেই আলাপ আজ দুবছর হলো কলকাতায় হার্টের সার্জেন্ট ,ডাক্তারের সুবাদে তার নাম ডাক খুব। যারা আলাপকে খুব কাছ থেকে চেনে তারা জানে আলাপ ভীষণ একগুঁয়ে ,একালসেরে। তার বান্ধবী কিংবা প্রেমিকা সরগম বলে আলাপ এমন করলে কি তোর মা ফিরবে ,আমি তো আছি ,আমি তোর সবকিছু ,বাবা আছে আমাদের কথা ভাব ,হাস আলাপ ,দেখ পৃথিবী তোর জন্য অপেক্ষা করছে। আলাপ বলে সরগম তুই বুঝবি না ,এই দুঃখ শুধু আমার ,কেউ বুঝবে না। তোর মা যখন তোকে বুকে জড়িয়ে ধরে আমার হিংসে হয় ,তোর মা যখন তোকে বলে ভীষণ রোগা লাগছে তোকে কিংবা বুকে জড়িয়ে রাখে অসুখ হলে ,আমার হিংসে হয়। কেন ? কেন ? কেন আমার সাথে ? আমি কি এটি অযোগ্য যে মা আমায় ছেড়ে চলে গেলেন,আমার মায়ের মুখটাও মনে নেই ।

বাড়িতে বাবা কোন ছবি অবধি রাখেন নি মার।  

- সরগম বলে বাবা তো আছে 

- আলাপ বলে বাবা তো আমাকে ভালোবাসে ,সারাজীবন ধরে আমাকে বুকে আগলে মানুষ করেছেন ,কিন্তু বাবা কখনো মা হয় না ,ওই জায়গাটা আমার চিরকাল ফাঁকা থেকেছে। আমি বাবাকে দোষ দি না ,বাবার মতো মানুষ কম আছে 

উনি জানতেন আমি ওনার সন্তান না ,তবুও সব জেনেও আমাকে কখনো বুঝতে দেন নি। আমি সব জানি সরগম ,তবু চিৎকার করে বলতে পারি কষ্টগুলো বুক ফেটে যায়। 

আজ সকাল সকাল হাসপাতাল থেকে ফোন ,আলাপ কোনরকম নাকে মুখে গুঁজে হাসপাতালে বেরোচ্ছে ,নার্স এসে বললো বাবা ডাকছে। আলাপ বাবার কাছে এসে দাঁড়ালো ,প্রশ্ন করলো কেমন আছেন আজ  বাবা ? বাবা বললেন  আর কেমন ,এখন তো শুধু মৃত্যুর অপেক্ষা আলাপ ,তুই খেয়েছিস বাবা। আলাপ বললো ভাব্বেন না আপনি আমি ঠিক আছি। 

                          আলাপ এখন অপেরেশন থিয়েটারে ,সামনে মিসেস  মল্লিক ,তার হার্ট আজ অপারেশন করবে আলাপ ,পেসমেকার বসানো হবে। বাইরে প্রতিবারকার মতো মিসেস মল্লিকের পরিবার দাঁড়িয়ে। ঢোকার সময় মিস্টার মল্লিক বললেন বাবা উনি তোমার মায়ের বয়সী ,ঠিক করে দেবে তো। আলাপের আজ বহুদিন মা শব্দটা শুনলেই বুক পুড়ে যায় ,কান্না পায় ,আলাপ গম্ভীর ভাবে বললো আমি ডাক্তার ,ঈশ্বর নই ,যতটা হবে ঠিক করবো। 

                             মিসেস মল্লিকের অপেরেশন হয়ে গেছে আজ বারো দিন। আলাপ রেগুলার ভিসিটে মিসেস মল্লিকের ঘরে এসেছে। তার হাতে মিসেস মল্লিকের ট্রিটমেন্টের ফাইল ,সে খুঁটিয়ে দেখছে সবকিছু। মিসেস মল্লিক চেয়ে আছেন তার দিকে ,হঠাৎ তিনি বললেন তোমার নাম আলাপ না ,আমারও তোমার বয়সী একটা ছেলে ছিল। আলাপ শুনছিল কিছু উত্তর  দিচ্ছিল। আবার মিসেস মল্লিক বললো আমার ছেলের নামও আলাপ ছিল,বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। আলাপ এগিয়ে গেলো বললো ম্যাডাম প্লিজ কাঁদবেন না শরীর খারাপ করবে ,মিসেস মল্লিক আলাপের হাতটা ধরে বললেন বাবা কেমন আছে আলাপ ?

                           এইমাত্র বিপুল নস্কর মারা গেলেন। তার মৃত দেহের পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিসেস মল্লিক মানে অনিকেত মল্লিকের স্ত্রী আর আলাপ। আলাপ ছুটে এসেছিল বাবার কাছে সোজা হাসপাতাল থেকে ,বলেছিল মিসেস মুখার্জির কথা ,বিপুল নস্কর তার বালিশের নিচ থেকে একটা ছবি বের করে আলাপের হাতে দিয়েছিযেন  ,তারপর বললেন  আলাপ চিনতে পেরেছিস তবে মাকে ,আলাপ হলো আবার মায়ের সাথে। সেটাই বিপুল নস্করের শেষ কথা। মিসেস মল্লিক বললেন উনি বলতেন আলাপ শব্দটা আসলে সম্পর্কের অন্য নাম ,কেঁদে উঠলেন মিসেস মল্লিক।   আলাপ তাকিয়ে আছে খুব দূরে জানলার বাইরে ,হয়তো অপেক্ষা ,হয়তো তাও না ,জীবন একটা চলন্ত নিয়মের ছায়াছবি ,উত্থানপতন কিংবা পতন। 

মৃত্যু সুখ

 মৃত্যু সুখ 

... ঋষি 


হাতের নখে রক্ত লেগে গেলে মানুষ বন্য হয়ে যায়। সবুজ প্রকৃতির সাথে মানুষের এক ব্যাপক মিল আছে। প্রকৃতি ততক্ষন সুন্দর যতক্ষণ দূষণ মাত্রা না পেরোয় ,মানুষ ততক্ষন স্থির থাকে ,সুন্দর হাসে কিন্তু যখনি সময়ের স্রোতগুলো দূষিত হয়ে যায় ,মানুষের ফুটে ওঠে হিংস্রতা। সভ্যতার শব্দ যদি কেউ ভালোভাবে শোনে শুনতে পারবে চিৎকার সময়ে ,সময় অর্থাৎ কাল যা মানুষকে কখনো কখনো ঈশ্বর থেকে শয়তান করে দেয় ,অথচ সমাজের মুখোশে ঢাকা সেই মানুষ তখন ভীষণ স্বাভাবিক ,ভীষণ জটিল ,হয়তো খতরনাক। 

মিলন এক মনে তৈরী করার চেষ্টা করছে একটা মাটির ভাস্কর্য ,সামনে বসে আছে তার মডেল অনুসূয়া। মিলন সরকার প্রখ্যাত আর্টিস্ট যার ভাস্কর্য আজ সারা পৃথিবীতে সারা ফেলে দিয়েছে। তার ভাস্কর্যের সমালোচনা যারা করেন তারা বলেন 

মিলনের ভাস্কর্যে থাকে নগ্নতা ,হিংস্রতা ,একটা সমাজের রূপ যা অতি অন্ধকার থেকে উঠে আসা। মিলন একমনে এই সময় একটা ভাস্কর্যকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে যা তার স্বপ্নে প্রায় আসে। এক রমণীর খোলা উত্তাল স্তন আর ঠিক মাঝখানে রক্তাক্ত কিছু আঁচড় অথচ সেই রমণীর মুখে হাসি বলে দিচ্ছে সে খুশি। 

বিভীষিকা যেন আগুনেররূপ নিয়ে রমণীর চোখের হিংস্রতায় ,ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে সমস্ত শিকল ,রমণী জিভ দিয়ে নিজের বুকের রক্ত চেটে নিচ্ছে নিজের আঙ্গুল থেকে। 

অনুসূয়া হঠাৎ বলে স্যার ওয়াশরুম ,

- মিলন খেঁচিয়ে ওঠে তোর কি আর মোতার সময় হয় না ,যা আর কি। 

অনুসূয়া উঠে পা বাড়ায় ওয়াশরুমের দিকে। অনুসূয়া আজ প্রায় তিনবছর কাজ করছে মিলনের সাথে। সে জানে লোকটা পাগোল আছে ,কেমন একটা ফর্সা মুখের,ঝাকড়া মেয়েদের মতো  গম্ভীর মিলন।  তবে মানুষটা ভালো,মাস পরার আগেই টাকা দিয়ে দেয়। দু চারবার অনুসূয়া অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করেছে ,স্বার্থ ছিল অনুসূয়ার অবিবাহিত তার উপর প্রচুর টাকা আর অনুসূয়া খুব সাধারণ একটা মেয়ে যে শরীর বেচে খায়। এই যে মডেল হয়ে বসে থাকা সেটা একধরণের শরীর বেচাই তো। কি আছে তার শরীরে যা মিলন দেখে না ,হাত দিয়েও দেখে কিন্তু অদ্ভুত হলে মিলন যখন কাজের জন্য  তার শরীরে হাত দেয় ,সেই স্পর্শে কোনো কাম থাকে না ,কেমন একটা শীতল হাত মিলনের। অধিকাংশ সময় কাজের অছিলায় মিলন অনুসূয়ার স্তনে হাত বোলায়  কিংবা যখন মিলন তার কোনো  স্ক্যাল্পচারে মাটি বোলায় তখন অনুসূয়া লক্ষ্য করেছে মিলনের চোখগুলো কোন হিংস্র জানোয়ারের মতো জ্বলতে থাকে। অনুসূয়া বহুবার জানতে চেষ্টা করেছে মিলনের সম্পর্কে ,তার পরিবার সম্পর্কে ,মিলন কিছু বলে নি ,শুধু ঝাঁঝিয়ে উঠেছে। কোনো এক ম্যাগাজিন পরে অনুসূয়া জানতে পেরেছে শুধু মিলন নদিয়ার ছেলে ,আর তার শুরুর সময় প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে। কানাঘুষায় শোনা মিলনের নাকি বিয়ে হয়েছিল কিন্তু সেই স্ত্রী আত্মহত্যা করে। অনুসূয়া এগিয়ে যায়  ওয়াশরুমে সেখানে রোজকার মতো বেসিনে দেখতে পায় তাজা রক্তের কিছু ফোঁটা। 

আজ অনেক রাত  হয়ে গেছে অনুসূয়ার ,প্রায় দুটো তিনটে। মিলন আজ তার অদ্ভুত ভাস্কর্যটা শেষ করেছে। কি বিভৎস্য সেই ভাস্কর্য ,মানুষের মতো দেখতে কোনো রমণী ,অথচ মোটেও মানুষ না।অনুসূয়া ভীষণ ক্লান্ত সে খুব আবদারের সুরে মিলনকে বললো স্যার আজ বাড়ি যাবো না এখানেই থাকবো ,মিলন প্রথমে খেঁচিয়ে উঠলো তারপর কি মনে করে বললো ফ্রীজে খাবার আছে খেয়ে নিয়ে নিচের সিঁড়ির পাশের ঘরটায় ঘুমিয়ে পর গিয়ে। আমার এখনো কাজ শেষ হয় নি ,যা। 

অনুসূয়ার ঘুম ভেঙে গেলো কেমন একটা মেয়েদের কান্না সে শুনতে পেলো  উপরের ষ্টুডিও থেকে। মাথার উপর ঘড়িটায় তাকিয়ে সে দেখলো রাত তিনটে। 

আবারো শুনলো শব্দটা ,শব্দটার মধ্যে কেমন একটা গা ছমছমে ব্যাপার আছে ,লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে অনুসূয়ার। কি করবে বুঝতে পারছিল না সে। যাবে উপরে ?ডাকবে স্যারকে ,স্যার কি করছে এখন। আবারো শুনলো আওয়াজটা ,আর স্থির থাকতে পারলো না অনুসূয়া। এগিয়ে গেলো সে সিঁড়ি বেয়ে স্টুডিওর দিকে। 

নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিল না। স্যার ! সম্পূর্ণ নগ্ন একটা মানুষ ,ব্লেড দিয়ে চিঁড়ে দিচ্ছে বুকের মাঝখানটা আর সেখান থেকে রক্ত নিয়ে লেপে চলেছে সদ্য তৈরী করা মাটির ভাস্কর্যের বুকে। চিৎকার করছে মাঝে মাঝে মেয়েদের মতো ,

একি স্যারের যে নিম্নাংশে পুরুষের চিন্হ নেই। কেমন একটা হিংস্র রমণীর মতো মিলন তাকালো অনুসূয়ার দিকে ,তুই ? অজ্ঞান হয়ে গেলো অনুসূয়া। 

                        সকালে অনুসূয়ার  জ্ঞান ফিরলো মিলন স্যারের কাজের মেয়েটার জলের ছেটানোর স্পর্শে। সারা বাড়ি পুলিশ ,মিলন স্যার মারা গেছেন কাল রাতে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের জন্য। সাথে পাওয়া গেছে একটা সুইসাইট নোট। পুলিশ প্রশ্ন করেছিল অনুসূয়াকে আপনি তো কাজ করতেন  এতদিন মিলনবাবুর  সাথে আপনি কিছু অপ্রকৃতস্থ কিছু নজর করেছেন ? অনুসূয়া কিছু বলে নি। তবে সে পড়েছিল মিলন স্যারের শেষ মৃত্যু নোট ,যাতে লেখা ছিল 


প্রিয় জীবন ,


   আসলে ইতিহাস বলে কিছু হয় না আর এই সমাজের কাছে সাধারণ থাকাটা নিয়মে আর নিয়মের বাইরে সবটাই অনিয়ম। আমি সাধারণ নই ,অসাধারণ একজন নারী ,যাকে ছোটবেলায় বের করে দিয়েছে মা ,বাবা। যে হতে হতে চেয়েছিল মিনতি ,সে হয়ে গেছে সমাজের জন্য  মিলন।  কিন্তু তার ভিতরের নারী মোর নি এক মুহূর্তের জন্য , যে বন্ধুত্বের খোঁজে বিয়ে করেছিল এক বান্ধবীকে সেও ছেড়ে চলে গেছে অভিমানী  মৃত্যুতে। তবে বেশ চলছিল লুকিয়ে লুকিয়ে এই অদ্ভুত জীবন কিন্তু আর সম্ভব হলো না ,আর সম্ভব হবে না ,তাই আমি চললাম।আমার তৈরী  শেষ ভাস্কর্য যার নাম দিলাম " মৃত্যু সুখ ",সে হয়তো বদল আনতে পারবে আজকের সমাজের কিংবা সময়ের ,হয়তো ইতিহাস লিখবে সে। আমি চললাম ,


ইতি 

মিলন 

    

অনুসূয়া এগিয়ে গেলো স্যারের শেষ ভাস্কর্যের দিকে ,লাল রক্তে মাখা একজন মহিলা হিস্র চোখে তাকিয়ে এই সভ্যতার দিকে , স্যারের " মৃত্যু সুখ "  । 

     

কুমুদিনী

 কুমুদিনী 

............. ঋষি 


এক পরিচয় হাজার মানুষ ,বুকের আকাশে মানুষগুলো সব ক্রমাগত স্থবির হয়ে হৃদয়ের আদেশে। আজ আপনি যাকে দেখছেন নিজের আয়নায় ,সে আদৌ আপনি নন ,এমনটা মনে হয় যাদের তাদেরই একজন সুবীর হালদার। নামটা আপনি চেনেন আজকের দিনে ,খুব পরিচিত কারণ এই জামানার একজন ডাকসাইটে রাজনৈতিক নেতা। যার নামে এককালীন গোটা বিশ মার্ডারের চার্জ আছে তবে নেই কোন ধর্ষণের অভিযোগ। আপাতদৃষ্টিতে বেঁটে ,কালো সুবীরবাবু আজও অবিবাহিত ,থাকার মধ্যে এক আধা পাগল বোন সুবর্ণলতা অর্থাৎ সুবীরবাবুর আদুরে সুবর্ণা। শোনা যায় সুবর্ণা  আদৌ সুবীরবাবুর মায়ের পেটের বোন না। 

আজ সকাল থেকে সুবীরবাবুর মনটা ভালো নেই ,গতকাল রাতে আগুন লেগেছে বস্তিপাড়ায় ,সেখানেই থাকে কুমুদিনী সেই বৃদ্ধা ,যাকে সুবীর মা বলে ডাকে।কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি ,অনেকটা পুড়ে গেছে।  বহুবার কুমুদিনীকে সুবীরবাবুঅনুরোধ করেছে সুবীরবাবুর সাথে থাকতে কিন্তু  কুমুদিনীর একই কথা আমি অলক্ষী তোর সাথে থাকবো তোর ক্ষতি হবে ,আমি চাই না এমন বাবা ,তুই আরও বড় হ। কুমুদিনীর সাথে সুবীরবাবুর বাবুর পরিচয় সেইসব দিনে যখন সুবীর পার্টির জন্য লোককে ধমকাতো ,দরকার হলে সরিয়ে দিতো পৃথিবী থেকে। 

                             যার হাত ধরে সুবীরবাবু রাজনীতিরে আসা ,সেই প্রবীরদা  সুবীরকে ডেকে বললেন বস্তিপাড়ার মহিরুলকে একবার রগড়াতে হবে ,শালা বস্তির লোকগুলোকে ওস্কাচ্ছে  যাতে তারা জমি না দেয় ,দরকার হলে সরিয়ে দিস ,বাকিটা আমি বুঝে নেবো। সেই রাতে রাস্তায় সুবীর আর তার লোকজন বোঝাতে চেষ্টা করে মহিরুলকে কিন্তু মহিরুলের এক গো ,শুনলো না। রাতে বোমা মারলো সুবীর উড়ে গেলো মহিরুলের বস্তির ঘরটা ,শুধু বেঁচে গেলো মহিরুলের পালিয়ে নিয়ে আসা বৌটা কুমুদিনী আর সুবর্ণা। পুলিশ এলো কেস সাজালো আগুন লেগে দুর্ঘটনা ,খবরের পাতায় এলো মহিরুল বলে কেউ মারা গেছে বস্তিতে আগুন লেগে। পুলিশের সাথে গেছি সুবীর ,দেখেছিলো মধ্যবয়স্ক কুমুদিনীর কান্না তার মেয়েকে কোলে জড়িয়ে ,কেঁদে উঠেছিল বুক সুবীরের ,সেএ কি করলো ?

                            প্রবীরদা সুন্দর করে সাজিয়ে সেই বস্তির ডেফলপমেন্ট প্ল্যান্ট বড়ো কমিশনের বদলে দিলেন এক কালো প্রোমোটারকে ,সামনে ভোট ছিল ,খুব দরকার ছিল পার্টি ফান্ডের টাকার। কিন্তু সুবীর ভিতর ভিতর দগ্ধ হচ্ছিল ,ছুটে গেছিল সে কুমুদিনীর কাছে ,দোষ স্বীকার করেছিল। কুমুদিনী বলেছিল তোর দোষ নেই রে বাবা ,আমার কপাল পোড়া। সুখের মুখ দেখতে ঘর ছেড়েছিলাম ওর হাত ধরে ,কিন্তু ওই যে ধর্মে সইলো না ,সবার সব পেপার শাস্তি এই পৃথিবীতে পেতে হয়। কিন্তু ভাবনা হলো এই পাগলী মেয়েটাকে নিয়ে ,কে দেখবে ওকে ? কি করে মানুষ করবো ? সেদিন থেকে সুদীপ সুবর্ণার সব দায়িত্ব নিয়েছিল। 

                      সুবীর সেদিন আড্ডা মারছিল বেদিপাড়ার নর্দমার উপর বসে। দেখলো সুবর্ণা কাঁদতে কাঁদতে  ছুটে ছুটে আসছে ,বলছে দাদা দাদা ওরা মাকে মারছে। সুদীপ ছুটে গেছিল দলবল নিয়ে ,দেখলো মিউনিস্যিপালটির বিশাল এক ট্রলার বস্তি ভাঙতে এসেছে ,কুমুদিনী সামনে দাঁড়িয়ে আটকাবার চেষ্টা করছে ,তাই তাকে মারা হচ্ছে। সুবীর রুখে দাঁড়িয়েছিল সেদিন আর সেই রাতেই সে খুন করে প্রবীরদাকে। সামনের ভোটে পার্টি থেকে তাকে দাঁড় করানো হয় ,সুবীর জিতে যায় বস্তিপাড়ার লোকজনের ভোটে। তারপর সে সুবর্ণাকে নিয়ে এসে রাখে বটে নিজের কাছে কিন্তু কুমুদিনী আসে নি। 

                হাসপাতালে যাবার আগে চান করে   আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুবীর তাকিয়ে ছিল নিজের দিকে ,আধপাকা চুল ওয়ালা মধ্যবয়স্ক লোক। তার চোখে কেমন যেন এক যন্ত্রনা। এই সেই সুবীর হালদার যে সেদিন সুবীর মস্তান। নিজের দিকে তাকিয়ে সুবীর নিজেকে চিনতে পারছিলো না নিজেকে। 

দাদা দাদা ডাক শুনে ফিরে থাকলো সুবীর ,তার আধ পাগল বোনটা কাঁদছে। 

-কি হয়েছে কাঁদছিস কেন সুবর্ণা  ?এগিয়ে গেলো বোনের দিকে সুবীর। 

- মা ,ফোন শুধু এতটুকু বুঝলো 

ছুটে গেলো সে টেলিফোনের দিকে। হ্যালো হ্যালো ,ওপার থেকে তার এক পার্টির ছেলের গলা 

- স্যার কুমুদিনী ম্যাডাম আর নেই।