Sunday, October 16, 2022

ভগ্নাংশের জীবন

 ভগ্নাংশের জীবন 

.. ঋষি 


প্রেমিক : হ্যালো ! কি করছো ?

প্রেমিকা : অপেক্ষা 

প্রেমিক : কিসের অপেক্ষা ? কার অপেক্ষা ?

প্রেমিকা : আ ঢং ,জানে না যেন ,কার অপেক্ষা ,আমার কে আছে তুমি ছাড়া। 

প্রেমিক : কেন তোমার স্বামী ,তোমার সন্তান ,তোমার গুছোনো সংসার। 

প্রেমিকা : সব যদি গুছোনো হতো এত রাত্রি অবধি আমি কেন তোমার জন্য অপেক্ষা করতাম। 

প্রেমিক : জানো তো অপেক্ষা শব্দটারও একটা শেষ আছে ,কিন্তু আমাদের এই সম্পর্কটার শেষ কোথায়। একটা সত্যি কথা বলবে ,তুমি আমাকে ভালোবাসো ?

প্রেমিকা : না বাসি না ,মন্দ বাসি। তবে আমি চাই তুমি যাতে ভালো থাকো ,সুস্থ ভাবে আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াও। 

প্রেমিক : তাহলে এ ভালোবাসা নয় ,সে তো বন্ধুরাও এমন চায়। 

প্রেমিকা : তুমি কি জানো না ভালোবাসার প্রথম শর্ত বন্ধুত্ব ,আর তোমায় আমি কতটা ভালোবাসি তা তুমি জানো না। 

প্রেমিক : আমাকে এত ভালোবাসো তো আমার থেকে দূরে থাকো কেন ? আমাকে এত দূরে রাখো কেন ?

প্রেমিকা :বাচ্চাদের মতো বলছে দেখো , তুমি কি জানতে না ভালোবাসার আগে আমার একটা সংসার আছে ,একটা সন্তান আছে। আমি একটা মেয়ে, আমাকে সমাজ ,লোকজন সবাইকে নিয়ে চলতে হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ আছে। তুমি দিতে পারবে আমার সন্তানকে যোগ্য সম্মান ,ওর বাবা গভরমেনন্ট সার্ভিস করে। আমার আর সন্তানের একটা ভবিষ্যত  আছে।  ও রিটায়ার হওয়ার পর পেনশন পাবে ,ও যদি চাকরি করতে করতেও মারা যায় আমি ওর পেনশন পাবো। তা ছাড়াও আমার স্বামীর সাথে কিছু নেই তুমি জানো ,যতটুকু ওই মেয়েটার দিকে চেয়ে একসাথে থাকা। 

প্রেমিক : তবে এই যে পুজোর সময় তোমার স্বামীর সাথে ঘুরলে এই যে ডিসেম্বরে তোমরা পুরি যাচ্ছো তোমার স্বামীর অফিস পিকনিকে এগুলো কি ?

প্রেমিকা : বাবু তুমি বোঝার চেষ্টা করো এই পৃথিবীটা আজও পুরুষতান্ত্রিক ,সংসারে কতগুলো নিয়ম আছে ,তাছাড়া আমার সন্তানকে সুস্থ জীবন দেবার জন্য এই যাওয়াগুলো দরকার ,তাছাড়া আমার সন্তান আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে ,ও সব বোঝে। 

প্রেমিক : তবে কে অপেক্ষা করছে ,তুমি না আমি ?আচ্ছা একটা কথা বোলো যদি তোমার স্বামী মারা যায় ,তখন না হয় আমাদের বয়স হয়ে যাবে ,তখন আমাকে বিয়ে করবে ?

প্রেমিকা : না তোমাকে আমি কোনোদিনই বিয়ে করবো না। সত্যি যদি এমন কিছু হয় আমরা একসাথে থাকতে পারি কিন্তু বিয়ে নয়। আমার মা ,আমার ভাই কেউ মেনে নেবে না ,আমাদের পরিবারে এমন হয় নি কোনোদিন ,তাছাড়াও ও মারা গেলে আমি পেনশন পাবো ,আমার আর মেয়ের জীবন সিকিওর। 

প্রেমিক : তবে কি সারাজীবন ধরে আমি কি অপেক্ষায় করবো ,কোনোদিন তোমাকে পাবো না ,তুমি তো জানো তোমার সন্তান মানে আমার সন্তান। 

প্রেমিকা : আচ্ছা তুমি বলো ভালোবাসলে কি তবে বিয়ে করা জরুরী। 

প্রেমিক ; জরুরী না ,তবে বিয়ে হলো একটা সামাজিক ধাৱা ,যেটা না থাকলে তোমার আমার সম্পর্কটা কেউ মেনে নেবে না। 

প্রেমিকা : কে কি মানলো তাতে কি এসে যায় ,আমরা একসাথে থাকবো সেটাই জরুরী। 

প্রেমিক : তুমি এই ভাবে আমার সাথে সারাজীবন থাকতে পারবে তো ? আমি অপেক্ষা করছি ,করবো। 

প্রেমিকা : শুধু এত টুকু বলি আমি আছি। অনেক রাত হলো এইবার ঘুমিয়ে পড়ো ,আকল অফিস যেতে হবে ,আমি ডেকে দেব। 

প্রেমিক : সে তো জানি তুমি আছো ? কিন্তু আমি বুঝি না আমি কোথায় আছি ?

কি আমাদের ভবিষ্যৎ। 

প্রেমিকা : এতো ভেবে লাভ নেই ,যা হবে দেখা যাবে ,সময় কে দেখেছে ?

প্রেমিক : কিন্তু আমি বাঁচবো তো এতদিন ?

প্রেমিকা : এমন বলে না বাবু ,আমাদের এইভাবেই বাঁচতে হবে ,ভগ্নাংশের জীবন। 

অনেক রাত হয়েছে এইবার ঘুমিয়ে পড়ো বাবু ,সুস্থ থাকতে হবে। কাল সকালে আমি ডেকে দেবো গুডনাইট। 

প্রেমিক : হ্যালো ! হ্যালো ! একটা চুমু দেবে। 

প্রেমিকা : সবটাই তোমার ,কিন্তু এইভাবে চুমু দেওয়া যায় ,ঘুমিয়ে পড়ো বাবু ,সব ঠিক হবে  একদিন।    

কবি ও কবির সন্ধ্যা

 কবি ও কবির  সন্ধ্যা 

,,,,ঋষি 

স্ত্রী : হ্যা গো শুনছো 

কবি : কি ?

স্ত্রী : কি করছো  বলোতো তখন থেকে ওই কম্পিউটারে মুখ গুঁজে ,তোমার কি অফিস থেকে বাড়ি ফিরে কোনো কিছু বলার থাকে না ,এক না হলে বই ,না হলে সারাক্ষন ওই কম্পিউটারে লিখছে ? কি যে লিখছে ছাতার মাথা এত ,বলি কি রবীন্দ্রনাথ হবে নাকি ,আমার সাথে তো একটু থাকতে পারো ? কথা বলতে পারো ?

কবি : কি কথা বলবো ? তোমার সাথে সময় কাটানো মানে তো ওই টিভির সিরিয়ালের পুঁটির মা নিরুদ্দেশ ,না হলে পাশের বাড়িতে কার কি হয়েছে ,না হলে সেই তোমার মায়ের কিংবা ভাইয়ের কথা। 

স্ত্রী : কি করতে সংসার পেতেছিলে ? আমি তো আমার বাবা ,মা কেও তো দেখলাম সারাক্ষন এই বয়সেও কি যে কথা বলে এত। এই তো ওরা ঘুরে এলো পুটুমাসির বাড়ি থেকে ,জানো তো পুটু মাসির মেয়ের  ........

কবি : আরে থামো তো ,লেখাটা বেরিয়ে যাবে মাথা থেকে ,একটু সময় দেও প্লিজ একটু লিখে নি। 

স্ত্রী : কি হবে বলতো এত লিখে ,কে পড়ছে তোমার লেখা ,এই যে গাঁটের কড়ি খরচ করে দুটো কবিতার বই করলে ,কি একটাও তো বিক্রি হলো না ,সব তো একে ওকে দেন করলে। তুমি এত বুদ্ধিমান এই সব লেখা পড়া করে বরং এইবার একটা ব্যবসা করো আমার ভাইয়ের সাথে। জানো তো আমার ভাই রিন্টু এবার দার্জিলিঙে ঘুরে এলো বৌকে নিয়ে ,এই তো ফেসবুকে কত ছবি পোস্ট করলো। 

কবি : উফ ,প্লিজ আমাকে একটু লিখতে দেও ,তুমি কোনোদিন বোঝো নি আমি কি লিখি ,কেন লিখি , বিশ্বাস করো মাথার ভিতর শব্দরা নাচানাচি করে ,কেমন পাগল পাগল লাগে ,যতক্ষণ না লিখছি শান্তি নেই। তুমি জানো আমি যখন লিখি আমার মাথার ভিতর শব্দ বৃষ্টি হয়। প্রতিটা অন্যায় সে সমাজের হোক ,নারীরই হোক ,সে মানুষের হোক আমাকে বড় বিব্রত করে ,,,,

স্ত্রী : তুমি থামবে ,তুমি তো পাগল হয়েছো ,আমাকেও করবে ,এ সব ছাড়ো বরং একটু মুদির দোকান থেকে ঘুরে এসো সাবান শেষ। চিনি আনতে হবে ১ কেজি মতো। যদি রাতে পরোটা খাও তাহলে ময়দা নিয়ে এসো।

কবি : প্লিজ দাঁড়াও লেখাটা শেষ করে নি ,একটু সময়। 

স্ত্রী : রাত কটা বাজে দেখেছো ,মুদির দোকান বন্ধ হয়ে যাবে তো।  

কবি :আচ্ছা তুমি আর কিছু বলতে পারো না (কম্পিউটার ষাট ডাউন করতে করতে ),আমাদের কি আর অন্যকোন কোনো কথা থাকতে নেই। 

 স্ত্রী :তোমার সাথে কথা ,সে তো পাগলের সাথে বলা। তুমি বিনয় ,শক্তি ,সুনীল করবে আর আমার মাথায় কিছু ঢুকবে না। সে তো বিয়ের রাত্রি থেকে শুনছি ,তোমার মনে পরে সেইবার হানিমুনে গিয়ে এমন কবিতা শোনাতে শুরু করলে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার কপাল আমার বাড়ির লোকেরা আর ছেলে পাই নি ,বিয়ের আগে শুয়েছিলাম ছেলে পড়াশুনায় ভালো ,ভালো চাকরি করে ,লেখালিখি করে কিন্তু যদি জানতাম তোমার লেখা নিয়ে এই পাগলামি তবে আর বিয়ে করতাম না। 

কবি :তুমি কি বলেছো সারাজীবন আমাকে মাসকাবারি ফর্দ আর অসুখ-বিসুখের ওষুধ ছাড়া। সংসার মানে কি শুধু আলু ,পেঁয়াজ আর চাল ,ইলেকট্রিক বিল। আর কিছু না। আমার দিকে ভালো করে কখনো ফিরে তাকিয়েছো আমি কি চাই ?

স্ত্রী : সংসার মানে এর বাইরে কি ,ভালো থাকবো ,ভালো খাবো ,তিন মাস অন্তর ঘুরতে যাবো ,স্বামীকে জড়িয়ে শোবো কিন্তু তুমি তো শোয়া বসা ও করো না আজ বহুদিন ,একটা বাচ্চা অবধি আমাকে দিতে পারলে না এতদিনে। তোমায় দিয়ে আর কিছু হবে না ওই কবিতা লেখা ছাড়া।

কবি : আমি কি তোমায় ভালোবাসি না ,তোমার জন্য কিছু করি না ,এই যে গত পুজোয় লোন নিয়ে গাড়ি কিনলাম। 

স্ত্রী : ওই গাড়ি কিনলে ,কিন্তু কোথায় ঘুরতে নিয়ে গেলে একাডেমি অফ আর্টসে ,নাটক দেখতে কিন্তু আমি কি বুঝি নাটকের ,সত্যি হলো তোমার সাথে থাকা যায় না ,আমি আছি জোর করে ,না হলে (ফোঁপাতে ফোঁপাতে )

কবি : তুমি কেঁদো না ,আমার কষ্ট হয় ,প্লিজ চুপ করো ,বলো তোমার কি চায় ?

স্ত্রী : তুমি লেখালিখি ছেড়ে দেও ,ও আমার শত্রু ,আমার সংসারটা গিলে খাচ্ছে ,তুমি লেখালিখি ছেড়ে দেও। 

কবি : কি আনতে বলছিলে বেশ ,বোলো লিখে নি ,মুদির দোকানটা বন্ধ হয়ে যাবে। 

 


  

Tuesday, September 27, 2022

এ পারফেক্ট মার্ডার

 এ পারফেক্ট মার্ডার 

... ঋষি 


কেস নো ২০২২ ,বাদী ও বিবাদী উভয়পক্ষকে আদালতে হাজির হবার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। 

বাদী পক্ষের উকিল : ধর্মাবতার আমার মক্কেল প্রদীপকুমার জানার উপর অভিযোগ উনি ওনার স্ত্রীকে ষড়যন্ত্র করে খুন করেছেন। যা সম্পূর্ণ মিথ্যে ,যা সম্পূর্ণ কল্পিত এবং এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। 

বিবাদী পক্ষের উকিল : ধর্মাবতার পুলিশ অনুসন্ধান করে দেখেছে পেশায় ওসি প্রদীপকুমার জানার সাথে ওনার স্ত্রীর সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ওনাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া ,শুধু ঝগড়া নয় প্রদীপকুমার জানা প্রায়শই নেশা করে বাড়ি ফিরে ওনার স্ত্রীকে মারধর করতেন। ধর্মাবতার আমি প্রদীপকুমার জানাকে একবার উইটনেস বক্সে কিছু জিজ্ঞাসা করার জন্য আপনার কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি। 

প্রদীপকুমার জানা : আমি যাহা বলিব সত্যি বলিব ,সত্যি ছাড়া মিথ্যা বলবো না। 

বিবাদীপক্ষের উকিল : প্রদীপ বাবু ২০ ই সেপ্টেম্বর অর্থাৎ যেদিন আপনার স্ত্রী মারা যান সেদিন কি হয়েছিল একটু আদালতকে বলবেন। 

প্রদীপকুমার জানা : ধর্মাবতার আমি পেশায় একজন পুলিশ ,সুতরাং আমাকে চোর ,ডাকাত ,পকেটমারদের নিয়ে কাজ করতে হয়।আমি ,আমার স্ত্রী এবং আমার একমাত্র ছ বছরের সন্তান প্রীতম আমরা ভীষণ সুখী পরিবার। আর ঝগড়া কোন পরিবারে হয় না ,সে তো সবখানে হয়।  ঐদিন সকাল ১০ টা নাগাদ আমার মোবাইল ফোন সাব ইন্সপেক্টর মোহন বাবু ফোন করেন যে ঠিক মতো না পাওয়ায় জিটি রোড অবরোধ করা হয়েছে ,আপনি এক্ষুনি আসুন। ধর্মাবতার তখন আমি ওই সকালে ছুটি ওই স্পটে ,সেখানে গিয়ে দেখি উত্তপ্ত জনতা পুলিশকে টিপ্ করে ঢিল ছুঁড়ছে ,আমি ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করার জন্য পিস্তলে খাপে হাত দি দেখি পিস্তলের খাপটা খালি। আমার হঠাৎ মনে পরে তার আগের রাতে আমি আমার পিস্তলটা সার্ভিসিং করে ,ফুল লোডেড করে আমি আমার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে এসেছি। আমি তখন সাব ওসিকে বলি সর্বনাশ আমি আমার সার্ভিস রিভলবার বাড়িতে ফেলে এসেছি ,আমি অফিসের জিপি নিয়ে বাড়ে থেকে ওটা নিয়ে আসছি ,আপনি সামলান ততক্ষন ,কিন্তু বাড়িতে এসে দেখি সব শেষ ,বলে প্রদীপকুমার ফুপিয়ে কেঁদে ওঠেন। 

 বিবাদীপক্ষের উকিল : বাড়ি গিয়ে আপনি কি দেখলেন ?

প্রদীপকুমার জানা : আমার স্ত্রীর বুলেটবিদ্ধ রক্তাক্ত মৃতদেহ রান্নাঘরের সামনে পরে ,আর আমার ছেলের হাতে সার্ভিস পিস্তল ,সে এককোনে ভয়ে কাঁপছে। 

বিবাদীপক্ষের উকিল : ধর্মাবতার আমরা অনুসন্ধান করে দেখেছি প্রদীপবাবু ছোটবেলা থেকে তার সন্তান প্রীতমকে তার প্রতিটা অনুষ্ঠানে শুধু বন্দুক ,পিস্তল এই সব উপহার দিতেন এবং বাড়িতে প্রায়শই প্রীতম ওই বন্দুক নিয়ে সকলকে গুলি করতো ,প্রদীপ বাবু আপনাকেও তো করতো ? 

প্রদীপকুমার জানা : ধর্মাবতার প্রতিটা বাবা চায় তার সন্তান তার মতো হোক ,হ্যা আমি প্রীতমকে খেলনা বন্দুক কিনে দিতাম ,এবং আমি বাড়ি থাকলে ও ওই সব বন্দুক দিয়ে আমাকে গুলি করতো ,আমি মরে যাবার ভান করতাম ,ও হাসতো ,খুব হাসতো। 

বাদীপক্ষের উকিল : কিন্তু এর থেকে কি প্রমাণিত হয় ধর্মাবতার ,এর থেকে তো প্রমাণিত হয় না প্রদীপবাবু তার স্ত্রীকে খুন করেছেন কিংবা ষড়যন্ত্র করে হত্যা করেছেন। 

বিবাদীপক্ষের উকিল :এ তো জলের মতো পরিষ্কার ,প্রদীপবাবু আর স্ত্রীর বনিবনা কিছু ছিল না ,তাই উনি পথের কাঁটা সরাতে ওনার ফুল লোডেড সার্ভিস রিভলবার ইচ্ছাকৃত ওনার সন্তান প্রীতমের হাতের নাগালে ওনার পড়ার ড্রয়ারে  বাড়ি রেখে গেছেন ,কারণ উনি জানতেন ওই রিভলবার দিয়ে প্রীতম তার মাকে ফায়ার করবে ,বাকিটা তো পরিষ্কার। 

বাদীপক্ষের উকিল : এর থেকে কিছুই প্রমাণিত হয় না ,উনি খামোকা ওনার স্ত্রীকে মারতে যাবেন কেন ,ঝগড়া তো সব সংসারে হয়। ধর্মাবতার এইভাবে আদালতের সময় নষ্ট করার কোনো মানে কি আছে ?আমার মক্কেল প্রদীপকুমার জানা সম্পূর্ণ নির্দোষ ,ওনার উপর মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। 

জজসাহেব : বাদী ও বিবাদীপক্ষের সমস্ত বক্তব্য শোনার পর এটা পরিষ্কার ওসি প্রদীপকুমার জানা সম্পূর্ণ নির্দোষ কারণ ওনার বিরুদ্ধে কোনো প্রমান আদালতে প্রমান করা যায় না। আদালত প্রমানে বিশ্বাস করে কিন্তু কোনো ভাবনা বা গল্পে না। 


কিছুক্ষন পর 

প্রদীপকুমার জানা : হ্যালো হ্যালো ! মায়া আমি কেস জিতে গেছি। আবার আমি ,তুমি আর প্রীতম একসাথে থাকা থেকে কেউ আটকাতে পারবে না গো।  

Monday, May 30, 2022

নক্ষত্র কথন

 


নক্ষত্র কথন 

.. ঋষি 

..


পৃথিবীর প্রতিটি নক্ষত্রের জ্ঞান মানুষের আছে 

কিন্তু নেই মনের 

তাই আঘাত করা সহজ ,তাই জড়িয়ে ধরা সহজ 

শধু মনকে বোঝাতে হবে 

তুমিও একজন ব্যবসায়ী। 

.

তোমার হিংসা তোমার বুকের ভাঁজে নক্ষত্র নেই 

তোমার হিংসা তাই সম্পকের লড়াই 

তোমার হিংসার বলি প্রাদেশিক জাতীয়তাবাদ 

ওই যে কথায় বলে 

আকাশের গায়ে কত্ত বড় পূর্ণিমার চাঁদ। 

.

পৃথিবীর প্রতিটা নক্ষত্রের আলো পৃথিবীর গায়ে 

নক্ষত্ররা প্রশ্ন করে কে তুমি ? তুমি কার ?

নক্ষত্ররা ঝগড়া করে না 

শুধু মাঝে মাঝে রেগে গেলে ছুটে আসে পৃথিবীর বুকে 

মানুষ বলে তারা খসা 

সময় বলে মিথ্যে কথা 

আসলে মানুষের খালি ঘরে আজকাল মিথ্যের বাস। 

অনুযোগ

 অনুযোগ 

... ঋষি 

অনুযোগ খুব শান্ত ভাবে তাকিয়ে আছে   মৃত্তিকার দিকে ,ভোরের শেষ আলো যেন আলগা বেশে গড়িয়ে নামছে মৃত্তিকার সারা শরীর বেয়ে ,মুগ্ধ অনুযোগের হোটেলের এই রুমটাকে কেন যেন স্বর্গ মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। অনুযোগ সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে সমুদ্রের ধারে জানালাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ,ডুবে যায় ভাবনায়। 

                     অনুযোগ ব্যানার্জি পেশায় সফটওয়ার ইঞ্জিয়ার ,ভালো চাকরি ,নিউটাউনের নিজের ফ্ল্যাট ,বিবাহিত ,শ্রীপর্ণা অনুযোগের স্ত্রী ,বড়োলোকের মেয়ে। তার স্ত্রী চাকরি করে কোনো এক কর্পোরেটে এইচ আরের ভূমিকায়। অনুযোগ আর শ্রীপর্ণার সুখে থাকার কথা ছিল ,অনুযোগ বাড়ির কথার বিরুদ্ধে ভালোবেসে শ্রীপর্ণাকে বিয়ে করে,বিয়ের শুরুর দিকে পাঁচ বছর বেশ ভালোই ছিল তারা। তারপর পর্ণা হলো ,কেমন যেন অনুযোগের পৃথিবীটা আটকে গেলো দশটা পাঁচটার চাকরি আর সংসার এই দুয়ের ফাঁকে। শ্রীপর্ণা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ছিল তাদের মেয়ে আর তার নিজের চাকরি নিয়ে। কখন অনুযোগের মনে হতে শুরু হয়েছিল পৃথিবীটা বোধহয় এইভাবেই চলছে সবকিছু মেনে নিতে হয়। ক্রমশ কথা বলা কমছিল স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ,শুরু হয়ে গেছিল ভুল বোঝাবুঝি।  মেয়ের স্কুল ,বাজার হাট ,গাড়ির ,ফ্লাটের ই এম আই ,অনুযোগ হাঁপিয়ে উঠছিল ,হাঁপিয়ে উঠছিল জীবন থেকে ,ঠিক সেই সময় মৃত্তিকা যেন দেবীর মতো অনুযোগের সামনে এসে দাঁড়ায়। 

মৃত্তিকা গ্রামের মেয়ে ,তার স্বামী মারা গেছে বহুদিন হলো ,নিজের বলতে তার এক ছেলে থ্রিতে পড়ে আর তার মা। কোনো এক অদ্ভুত সকালে মৃত্তিকার সাথে জীবন থেকে  হেরে যাওয়া অনুযোগের দেখা হয় যেখানে অনুযোগ সকালে জগিং করতো। প্রথম মৃত্তিকাকে  দেখেই কেন যে অনুযোগের ভীষণ কাছের মনে হয়েছিল ,মেয়েটা খুব সুন্দর হাসে আর সুন্দর কথা বলে। ক্রমশ প্রতিদিন দেখা হতে হতে অনুযোগ  প্রায় ভালো লাগা থেকে একদিন বিকেলে মৃত্তিকার সাথে দেখা করতে চায় ,সেই বিকেলের দেখা প্রথম বন্ধুত্বের ছিল তারপর কখন যেন গভীর থেকে গভীর হতে হতে হৃদয়ের হয়ে গেলো। এখন নিয়ম করে অনুযোগ সংসারের ফাঁকে ,সময়ের ফাঁকে দেখা করে মৃত্তিকার সাথে। মৃত্তিকা মেয়েটা ভালো সে কখনও কিছু চাই অনুযোগের থেকে ,শুধু গভীর মুহূর্তে অনুযোগকে বলে আমার কিছু চায় না ,শুধু সাথে থেকো। অনুযোগ  আজকাল কেন জানি মুক্তি খোঁজে সংসার থেকে কিন্তু প্রতিবারই আটকে যায় তার মেয়ের পর্ণার জন্য। 

                      বেশ কিছু দিন হলো অনুযোগ হাঁপিয়ে উঠছে ,ক্রমশ সে যে মৃত্তিকার খুব কাছের কেউ হয়ে গেছে। কিছুতেই তার মন বসে না মৃত্তিকা ছাড়া ,অফিসের কাজের ভুল হয় ,কথা বলতে ভুলে যায় কি বলবে ,ক্লাইন্ট মিটিং এ প্রায়ই তাকে অপ্রস্তুত হতে হচ্ছে এর জন্য। বাড়িতে তার মন টেকে না কিছুতেই ,কিছুতেই নিজের আয়নার মুখোমুখি হতে পারে না অনুযোগ ,শ্রীপর্ণার সাথে প্রায়শই কথাকাটাকাটি হয় ,বিবাহিত এই সম্পর্কটা যেন তলানিতে এসে থেকেছে তার। অনুযোগ মৃত্তিকা সব বলে ,মৃত্তিকা বলে আমি আছি তো ,পালাচ্ছি না আর শোনো অনুযোগ আমরা তো আর কলেজে পড়ি না ,ধৈর্য ধরো সময় একটা রাস্তা বের করবে ঠিক। 

            দেখতে দেখতে সময় কাটে ,অনুযোগ আর মৃত্তিকা রাস্তা হারিয়ে রাস্তা খুঁজতে থাকে ,খুঁজতে থাকে নিশ্বাস একসাথে বাঁচবে বলে। আজ দু বছর হলো মৃত্তিকার মাও মারা গেছে এরমধ্যে ,মৃত্তিকার ছেলে আকাশ এখন চাকরি করে ব্যাংকে  ,অনুযোগের মেয়ে পর্ণার এবছর শেষ সেমিস্টার। অনুযোগের স্ত্রী শ্রীপর্ণা এখন নিজের অফিসের বস প্রায়ই তাকে দেশের বাইরে যেতে হয়। অনুযোগের চারিপাশে সবাই বেশ ভালো আছে একমাত্র অনুযোগ আর মৃত্তিকা ছাড়া। অনুযোগ  সেদিন মৃত্তিকাকে বলছিল এইবার সময় হলো কি বলো আমাদের একসাথে থাকার আর একসাথে বাঁচার ,মৃত্তিকা হেসেছিল একইরকম বলেছিল আমি তো আছি তাড়াহুড়ো তো কিছু নেই। 

          অনুযোগ সাঁতার জানে না তবুও সে এগিয়ে চলেছে সমুদ্রের দিকে ,সে এগিয়ে চলছে বাঁচার জন্য ,নিঃশ্বাসের জন্য  । গত দুদিন অনুযোগ ভালো ছিল দিঘার এই হোটেলে মৃত্তিকার সাথে ,সময় হয়তো ভাবছে শুধু শরীর আসলে তা না ,অনুযোগ তার মানুষটাকে নিয়ে ভালো ছিল। অনুযোগ তার স্ত্রীকে সবকথা সত্যি বলেছিল ,মৃত্তিকাও বলেছিল তার ছেলেকে ,আকাশ অনেকটা অবাক হয়ে তার মার দিকে দেখেছিল কারণ মৃত্তিকা ধরেছিল একজন পঞ্চাশ উর্ধ মানুষের হাত। আসলে এইবার অনুযোগের সব স্বপ্ন গুলো সত্যি হওয়ার ছিল কিন্তু বাদ সাধলেন বিধাতা ,মৃত্তিকার গতকাল রাতে হার্ট এট্যাক হয় ,ডাক্তার এসে ঘোষণা করে সব শেষ। তবু সারারাত্রি অনুযোগ বুকের কাছে আগলে ধরে শুয়ে ছিল মৃত্তিকার ঠান্ডা শরীরটা ,একটুও কাঁদে নি সে শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সে মৃত্তিকার মুখ ,জীবনের ,মুখ। ভোররাতে কলকাতা থেকে ছুটে এসেছিল আকাশ ,অনেক কথা শুনিয়েছিল সে  অনুযোগকে কিন্তু সে কিছুই উত্তর দেয়  নি ,শুধু বোকার মতো চেয়ে ছিল আকাশের মুখে।  সমস্ত কাজ শেষ হওয়ার পর অনুযোগ ডুকরে কেঁদে ওঠে ,আকাশ অনুযোগের কাঁধে হাত রেখে বলে এইবার কি করবে কাকু ?

-কলকাতা ফিরবে ,আমার সাথে গাড়ি আছে ?

-অনুযোগ হাসে , আকাশকে বলে এইবার বাঁচবো ,তুমি ভালো থেকো বাবা। 


এই মুহূর্তে অনুযোগ প্রায় সমুদ্রের অনেকটা গভীরে আরেকটা পা বারবার আছে তার বাঁচবার জন্য। অনুযোগ এখন জলের তলায় বুঝতে পারছে তার কষ্ট হচ্ছে ,সে তবু বালিতে পা দিয়ে এগোচ্ছে ,যেন সে এগোচ্ছে মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা শেষ মুহূর্তে বলেছিল ভয় পেয়ো না আমি তো আছে ,হ্যা মৃত্তিকা আছে ,অনুযোগের শরীরটা জলে ভাসছে যেন মৃত্তিকার নরম বুকে ,অনুযোগ চোখ বুজছে।   

Thursday, January 27, 2022

গোমড়া

গোমড়া 

... ঋষি  

আজীবন দৃশ্যের কল্পনায় যে লোকটা ছবি এঁকে গেছে তাকে যদি প্রশ্ন করো ছবি কাকে বলে ? সে হাসবে খানিক পাগলের মতো তারপর খুব অনায়াসে জীবন আর ছবির মাঝে তফাৎ কি ? আসলে মানুষের ঈশ্বরগুলো মানুষের গভীরে একটা  ছবি এঁকে রাখে ,তাকে কেউ জীবন বলে ,কেউ বলে ভালো লাগা ,কেউ বলে স্পন্দন। অনুরণন বহুক্ষন ধরে তাকিয়ে আছে দূরে মাঠের ওপারে সেই ছবিটার দিকে ,যে ছবিটা হয়তো তার ঈশ্বর এঁকে দিয়েছিল সেই ছোট্টবেলায় তার গভীরে ,

মা বলতো তুই যত গম্ভীররে নিশ্চয় স্কুল টিচার হবি ,বাবা বলতো এখনকার যুগের বাচ্চা এমনি হয় ,পড়শিরা যত বড়ো হলো অনুরণনকে  তার একটা নতুন  নাম দিয়ে দিলো " গোমড়া"। অবশ্য অনুরণন এই বিষয়ে আপত্তি ছিল না ,কারণ তার গোমড়া ডাকনামটা তাকে সুযোগ করে দিতে একটু আলাদা ভাবে নিজের ভিতর থাকতে। 

অনুরণন বন্দোপাধ্যায়কে আপনি গুগলে সার্চ মেরে পাবেন না ,সে এই শহরের কোনো এক স্কুলে বাংলার টিচার ,অতি সাধারণ ছাপোষা বাঙালি যে বাবার পদবীকে আশ্রয় করে তার পৈতৃক বাড়িতে একলাই থাকে। বাবা ,মা গত হয়েছে আজ প্রায় পাঁচ বছর ,চাকরিটাও বাবার সূত্র ধরে পাওয়া তার । সুতরাং এমন একটা মানুষ যার  আজকের যুগে কোনো ইমেইলআইডি নেই ,ফেসবুক একাউন্ট নেই ,কোনো বন্ধু নেই তাকে গুগুলে কেন ,এই পৃথিবীতেই একটু বেশি বলে মনে হবে। কেউ যদি ভুল করে তার ঠিকানা পাড়ার লোকেদের জিজ্ঞসা করে পাড়ার লোকেরা বলে কে ওই মাস্টারমশাইয়ের গোমড়া ছেলেটা তো ,যে বাবার স্কুলে মাস্টারি করে তাকে খুঁজছেন ?

অনুরণনেই আত্মীয় বলতে এক মাসি আছে যে অনুরণের মাঝে মাঝে খোঁজ করে ,ফোন করে খবর নেয় ,তাকে বলে এইবার বাবা একটা বিয়ে কর বিয়ের বয়স তো পার হয়ে যাবে ,বাস্তবিক অনুরণন এখন চল্লিশের কোঠায় ,কিন্তু সে মাসিকে বলে জানো তো আমি কেমন কে করবে আমাকে বিয়ে। অনুরণন মাঝে মাঝে বাবার  পুরনো টিভিটা চালায় ,শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে অবাক হয় ভাবে ছেলেগুলো কি করে মেয়েগুলোর সাথে এমন ন্যাকামি করতে পারে ,বিরক্ত হয়ে টিভি বন্ধ করে দেয়। তবে এমনতর অনুরণন একটা অদ্ভুত শখ আছে বিভৎস্য সব মুখোশ তৈরী করা ,যা ভারতবর্ষের কোথাও আপনি দেখতে পাবেন না।

 ২

                        মিস্টার তাপস পোদ্দার কলকাতার ইন্টালিজিয়েন্ট পুলিশ দপ্তরের একজন বড়ো অফিসার ,বেশ কিছুদিন ধরে নাজেহাল হয়ে এক খুনিকে খুঁজছেন ,কিন্তু কিছুতেই খুঁজে বের করতে পারছেন না খুনির  খুনের মোটিভ। শেষ তিন বছর ধরে এই শহরে বেশ কিছু মানুষ অথাৎ নারী ও পুরুষের খুন  হয়েছে কিন্তু তাদের  ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে  মৃত্যুর কারণ  মারাত্নক আতংক যার ফলে হার্টএটাক অথচ প্রত্যেকের শরীর থেকে ভীষণ প্রচ্ছন্ন ভাবে হার্টটাকে খুলে বের করে নেওয়া হয়েছে । অনেকেরই ধারণা খুনিরা  বোধহয় শরীরের অঙ্গ পাচারকারী কোনো দল  কিন্তু তাপস বাবুর মনে হয় খুনিএকজন কারণ প্রত্যেকটা খুন একইভাবে করা হয়েছে খুব নির্মম ভাবে এবং খুনের পর মৃতদেহ ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে গঙ্গার ধারে একই গাছের তলায়।  তাপসবাবুর মতে খুনি কোনো মানসিক রোগের স্বীকার কারণ প্রত্যেটি মৃতদেহের মুখে মৃত্যুর সময় লেগে ছিল মারাত্নক আতংক,প্রত্যেককে ভীষণ কষ্ট দিয়ে মারা হয়েছে ।                     


                       অনুরণন দোতলা বাড়ির উপরের তলাটা পুরো খালি করে ষ্টুডিও বানিয়েছে নিজের মতো করে ,সেই ঘরে গেলে আপনি দেখতে পাবেন স্তূপাকৃত মাটি ,ঘাস ,বিভিন্ন প্রাণীর লোম আর অসংখ্য মুখোশ। মুখোশগুলো বেশিরভাগই কোনো মানুষ কিংবা প্রাণীর অথচ মিলটা হলো প্রত্যেকটা মুখোশে মারাত্নক এক আতংক ,কেমন যেন অপমৃত্যুর আগের জীবের যে বাঁচার আকুতি তার প্রতিচ্ছবি।

অনুরণন এখন দাঁড়িয়ে ছিল দেওয়ালের গায়ে টাঙানো তার বাবা আর মায়ের মুখের আকৃতির মুখোশটার দিকে ,হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠলো গোমড়া আমি গোমড়া ,তারপর ছুটে গেলো পাশের ঘরে একটা আলমারির সামনে।এক টানে খুলে ফেললো আলমারি। সারা আলমারি ময় কাঁচের বয়াম আর বয়ামে কিছু একটা তরলে রাখা মানুষের হৃদয়। অনুরণন  বের করে টেবিলে রাখলো  তার  বাবা ,মার নাম  লেখা বয়ামদুটো ,তারপর সেগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে প্রায় চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল " আমি গোমড়া ,আমি গোমড়া ,আর কোনোদিন বলতে পারবে না " । 


অনুরণন বহুদিন হোস্টেলে ছিল ,সেখানে তাকে প্রায় সকলেই খ্যাপাতো গোমড়া গোমড়া বলে। হোস্টেলে তার কোনো বন্ধু ছিল না ,তার একমাত্র এক বান্ধবী ছিল অন্তরা ,যে পাশের গার্লস হোস্টেলে থেকে ডাক্তারি পড়তো।অন্তরার স্বভাব অনেকটা তার মতো ছিল ,অন্তরা অধিকাংশ সময় একলা থাকতো আর একদম হাসতো  না ভীষণ গম্ভীর ছিল সে। অনুরণনের সাথে তার বন্ধুত্ব কলেজের ফেস্টে ,অনুরণন দেখেছিল মেয়েটা একটা দাঁড়িয়ে আছে এক কোনে ,তার সকল বন্ধু তাকে বারংবার তাদের সাথে আনন্দ করতে বলছে কিন্তু সে যাচ্ছে না। সেদিন প্রথম কথা বলে অনুরণন অন্তরার সঙ্গে তারপর স্বভাবের মিলের কারণে ক্রমশ তারা ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে। অন্তরার কাছ দিয়ে শুনে শুনে অনুভব সেই সময় অনেক কিছু জানতে পেরেছিল মানুষের শরীর সম্বন্ধে ,শরীরে রাখা হৃদয় সম্বন্ধে। এমনকি অন্তরার সাথে সে চুরি করে একবার এক মৃতদেহের শরীরের কাঁটা ছেঁড়া করেছিল ,তারপর সেলাই করেছিল সেই শরীরটা। 

                   অন্তরার সাথে বন্ধুত্বটা কখন যে সময়ের সাথে অনুরণের জন্য ভালোবাসা হয়ে গেছিল অনুরণন বুঝতে পারে নি। সেটা ছিল কলেজের শেষ বছর  অন্তরা একদিন অনুরণকে ডেকে  পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল অমলের সাথে ,যার সাথে অন্তরার বহুদিনকার সম্পর্ক এবং তাদের বাড়ি থেকে অমলের সাথে অন্তরার বিয়ে অবধি ঠিক হয়ে ছিল।  অনুরণন সেদিন খুব ভেঙে পড়েছিল ,পরের দিন তাই ছুটি নিয়ে সে ছুটে এসেছিল বাড়িতে বাবা মায়ের কাছে।  অনুরণের বাবা ,মা  জানতেন ছেলে তাদের একটু অন্যরকম ,একালসের। সেদিন সন্ধ্যেতে মা হঠাৎ অনুরণকে বলেন তুই যতদিন যাচ্ছে তত গোমড়া হচ্ছিস ,হঠাৎ অনুরণন কি যেন হয়ে যায় ,পাশের পিতলের ফ্লাওয়ার ভাসটা তুলে মায়ের মাথায় মারে ,মা অবাক হন তার থেকে চমকে ওঠেন ছেলের কান্ড দেখে। ছেলে মায়ের গলায় পা দিয়ে নিজের মোবাইলে ছবি তুলছে আর চিৎকার করছে জন্তুর মতো আমি গোমড়া ,আমি গোমড়া। মা মারা যান সেদিন ,মায়ের মৃত্যুকে ঢাকতে সেদিন অনুরণন একইভাবে  আরেকটা খুন করে তার বাবার এবং তারপর তাদের শরীর থেকে আলাদা করে বের করে অনুরণন মা ,বাবার হৃদয়। খুব সুপরিকল্পিত ভাবে অন্তরার এক বন্ধুর  সাহায্যে সে বের করে বাবা মায়ের মৃত্যুর সার্টিফিকেট  এবং একটা খুনকে প্রমান করে হার্ট এটাক হিসাবে।   যেদিন শ্মশানে সে তার বাবা মায়ের মুখে আগুন দিচ্ছিল তখন অনুরণনের মনে পড়ছিল গঙ্গার ধারে সেই গাছটার পাশের সপরিবারের  ছবিটা যেটা আজও টাঙানো তাদের দালান ঘরে। সেই ছবিটা তোলার আগে অনুরণন মা তার বাবাকে বলেছিল ছেলেকে সবসময় গোমড়া বলে ডেকো না তো এমন করে ,দেখো ও বদলে যাবে। সত্যি অনুরণন তখন ভাবছিল সে কতটা বদলেছে।   

পুলিশঅফিসার তাপস বাবু এই মাত্র একটা সূত্র খুঁজে বের করলেন খুনি আর খুনের মাঝে। প্রতিটা খুন মাসের ২৪ তারিখ হয়েছে  আর খুনের সময় ওই দিন ৩ টের আসে পাশে ,আর বডি পাওয়া গেছে পরের দিন সকালে গঙ্গার ধারে একই গাছের ধারে। এই সূত্র থেকে পরিষ্কার খুনির সাথে ২৪ তারিখ এবং গাছের সাথে। তাপসবাবু একটু ধাতস্থ হলেন যে মাসের ২৪ তারিখগুলো সতর্ক থাকতে হবে এবং কাকতালীয় ভাবে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন আজ মাসের ২৪ তারিখ। 

রাত তখন ১২ টা খানিকটা   হবে ,তাপসবাবু এবং তার টিম গঙ্গার ধারে একটা গাছের  পাশে একটা ঝোঁপে  ওৎ পেতে বসে আছেন খুনিকের ধরবেন বলে। ঝোপের মধ্যে মশা এক একটা ডাইনোসোরস সাইজের ,উফ করে একটা মারলেন ,সিগারেটটা ধরালেন ,দেখলেন দূর থেকে একটা গাড়ির হেডলাইট এগিয়ে আসছে ,গাছের ধারে এসে গাড়িটা থেমে গেলো। কিছুক্ষন পরে কেউ একজন আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে  নামলো গাড়ির থেকে,এগিয়ে গেলো গাড়ির ডিকির দিকে। তাপসবাবু এই সময় বাঁশি বাজালেন ,চারিদিকে জ্বলে উঠলো টর্চ ,এতদিনে খুনি ধরা  পড়লো খুনের প্রমান সমেত। 

                    অনুরণন তখন চিৎকার করছিল আমি গোমড়া না ,আমি গোমড়া না বিশ্বাস করুন ,বাবা প্রতিদিন রাতে মাকে নেশা করে এসে মারতো ,জানেন তো আমার খুব রাগ হতো ,আমি কাউকে কিছু বলতে পারতাম না,খুন করতে ইচ্ছে করতো বাবাকে কিন্তু পারতাম না ,চুপ করে থাকতাম ,লোকে আমাকে গোমড়া বলতো ,বাবা ,মা দুজনেই বলতো ,আমার রাগ হতো। তাপসবাবু বললেন তাই বলে নিজের বাবা ,মাকে খুন ,এমনকি প্রেমিকা কে ,কি যে বেশ নাম অন্তরা,অন্তরা কি দোষ করেছিল ? অন্তরা আমাকে ঢুকিয়েছে আমি ওকে ভালোবাসতাম কিন্তু ও অমরকে আর আমি ওকে খুন করি নি বিশ্বাস করুন আজকেও আমার আলমারিতে ওর হৃদয়টা খুব যত্নে আছে। তাপসবাবু প্রশ্ন করলেন বুঝলাম তুই রাগ থেকে সকলকে খুন করতিস কিন্তু ওদের হার্টগুলো কেটে   নিতিশ কেন ? অনুরণন বললো সবসময় রাগ থেকে খুন করেছি তা সত্যি নয় আসলে আমি আমার চারপাশের মানুষগুলো হৃদয়গুলো জমা করতাম কখনো রাগে ,কখনো ভালোবেসে ,আসলে চিৎকার করে ওদের বারংবার বলতে চাইতাম আমি গোমড়া নই ,কিন্তু যারা বুঝতো না আমাকে ভালোবেসে কিংবা এমনি আমাকে গোমড়া বলে ডাকতো আমি প্রত্যেককে খুন করতে চাইতাম। যাদের খুন কোনো পারতাম তাদের খুন করার   পর  বডিগুলো ফেলে আসতাম আমার ঈশ্বরের দরজায়,জানেন তো ওখানে ওই গাছটার তলায় ঈশ্বরের বাস।  আমি  ওদের হৃদয়গুলোর সাথে নিজের অবসরে কথা বলতাম ,বোঝাতে চেষ্টা করতাম আমি গোমড়া নই। তাপসবাবু বুঝলেন অনুরণন মানসিক রোগী ,তিনি তাই একজন মানসিক ডাক্তার ডেকে পাঠালেন। 

                              সমস্ত গল্পটা পরে সিনেমার ডিরেক্টার আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন তারপর বললেন সাবাস ,এটা দিয়ে একটা দারুন ওয়েবসিরিজ হবে। আমি উঠে দাঁড়ালাম বেরিয়ে আসার সময় একবার নিজের মনে হাসলাম কারণ আমি জানি জীবন আর ছবির মাঝখানে তফাৎ কি ? সত্যি এই ডিরেক্টরও জানতে চাইলেন না ওই মুখোশগুলোর মানে কি।