Sunday, February 22, 2015

জীবন সমুদ্র

জীবন সমুদ্র
............. ঋষি
========================================================
আসলে কিছুই থাকে না পরে। জীবন সে যে সমুদ্রের মত অসংখ্য মুহুর্তের  ঢেউ। আসে যায় অথচ স্থির থাকে না কিছুই। এই যে সামনে বারান্দায় শুয়ে থাকা শীতের রৌদ্র সেও স্থির নয় ,হারিয়ে যায় সন্ধ্যের স্পর্শে আসলে কিছুই থেমে থাকে না সময়ের ঘড়ির কাঁটায়।বদলায় মুহূর্ত প্রতিক্ষণে একমাত্র স্থির মানুষের হৃদয়ের স্পর্শগুলো যেগুলো স্মৃত্মির কুটিরে আমৃত্যু দোলা দেয়।
                                                                          এই সব ভাবছিল কাজরী দুপুরের বিছানায় এলিয়ে শুয়ে।এই সময়টা অনন্ত অবসর কাজরীর। টুপুর স্কুলে থাকে আর অমিত অফিসে। দুপুরের খাওয়ার পর কাজরী একটু গড়িয়ে নেয় ,এটা তার বহুদিনকার অভ্যাস। কাজরী মল্লিক বলে যে ভদ্রমহিলাকে এই বাড়িতে গৃহকত্রী তার হৃদয়ে যে আলাদা এক কাজরী বাস করে তা বোধহয় কেউ জানে না এই বাড়িতে। এমনকি অমিতও না। অমিত মল্লিক লোকটি কাজরী মল্লিকের আইনত স্বামী ,অন্য স্বামীর মত  তার পত্নীর মত সমস্ত ভালোলাগা ,খারাপ লাগা গুলো জড়িয়ে থাকেলেও কোথায় যেন আজ নয় বছর সংসার করার পরও কাজরী একা।  এই কথা কাজরী কখনো বুঝতে দেই নি। নিজের পক্ষে যতদূর সম্ভব পত্নীরূপে ,মাতারূপে ,বধুরূপে ,সর্বপরি কোনো সংসারী নারী রূপে সে প্রতিক্ষণে নিজেকে বিলিয়ে চলেছে। কিন্তু কখনো সে দেই নি তার মনের খবর কাউকে। আজ অনেক্ষণ ধরে হাতের খোলা পত্রিকার উপর কাজরীর চোখ ,অথচ চোখ ছুঁয়ে আছে দুয়ারের বাইরে বারান্দা পেড়িয়ে সুদূর আকাশে। আজ তার মনটা আনছান করছে,আজকাল মাঝের মধ্যে এমন হয় কাজরীর। মনটা কেন যে আকাশ ছুঁতে চায়। ঢং ঢং করে ঘড়িতে চারটে বাজলো।
                 এবার উঠতে হবে কাজরীকে ওপরের ছাদের শুকনো জামাকাপড়গুলো তুলতে হবে ,টুপুর স্কুল থেকে ফিরবে খেতে দিতে হবে, শাশুরিকে চা করে দিতে হবে, অনেক কাজ জমে ,এখন রাত্রি অবধি কাজরীর দম ফেলার সময় নেই। বাড়ির ল্যান্ড লাইনের টেলিফোনটা বাজছে, এ সময় সাধারনত কেউ ফোন করে না ,কে করলো ফোন। কাজরী উঠে বসলো শাশুরির গলা বৌমা অমিত ফোন করছে ফোনটা ধরো।
                   কাজরী সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলো। এই বাড়িটা একটু পুরনো আমলের দোতলা। অমিতের দাদুর আমলে তৈরী। কাজরী শুনেছে এই বাড়িতে একসময় প্রচুর লোক আসাযাওয়া করতো। অমিতের দাদু একজন নামকরা উকিল ছিলেন। ফোনটা ধরলো কাজরী ওপাশে অমিত ,এই শোনো আমার ফিরতে একটু দেই হবে ,একজন মক্কেলের বাড়ি যেতে হবে। অমিত এই শহরের একজন নামকরা উকিল। ওদের একমাত্র মেয়ে টুপুর ক্লাস সেভেনে পড়ে। এই ফিরলো বলে। কাজরী সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে উঠতে শাশুরিকে  বললো জামাকাপড়টা  তুলে মা আমি চা করে দিচ্ছি।
                 এখন রাত্রি নটা বাজে টুপুর পড়ছে ওই ঘরে ,ওর মাস্টার এসেছে।  কাজরী পাশের ঘরে টুপুরের ফ্রকটা সেলাই করছে। টুপুরটা খুব দুষ্টু হয়েছে ,এতো লাফালাফি করে ,মাঝে মাঝে মনে হয় ঈশ্বর ছেলে করে পাঠাতে পাঠাতে ছেলেটাকে মেয়ে করে দিয়েছে। মাস্টার বেড়িয়ে গেলো টুপুর ছুটে এলো মা টিভিটা একটু চালিয়ে দেও ,এই সময়টা টুপুরের টিভি দেখার সময়। ওর বাবা আসবে তারপর একসাথে খেয়ে ঘুমোবে। অমিত ফিরতে ফিরতে রাত ১০ টা হবে। কাজরী উঠে রান্না ঘরের দিকে গেল খাবার গরম করতে শাশুরিকে খেতে দিতে হবে ,সেকালের মানুষ বেশি রাত জগতে পারেন না। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে দূরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কাজরীর ছোটবেলার কথা মনে হলো। কাজরীও টুপুরের মত বাবার জন্য অপেক্ষা করতো রাত্রে। বাবা ফিরলে বাবাকে জড়িয়ে কত কথা ,সারাদিন সে কি করেছে। আসলে ওই সময়টা আজকাল কাজরীর স্বপ্ন মনে হয় ,কি সুন্দর ছিল দিনগুলো। কিন্তু সব আজ স্মৃতির পিছনের পাতায় জমে।
                    শাশুরির খাওয়া হয়ে গেছে শুয়ে পড়েছেন  ,টুপুর টিভি দেখছে ,কাজরী  গিয়ে পাশে বসলো মেয়ের। মেয়েটা মন দিয়ে টিভি দেখছে কার্টুন চ্যানেল। নিজের মনেই হাসছে ,গম্ভীর হচ্ছে ,একবার কাজরীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো মা বাবা বাড়ি ফিরলো না। কাজরী বললো এই তো ফিরবে মা ,তুই খেয়ে নে না ১০.৩০ বাজে। টুপুর বাবার সাথে খাবে বলে টিভি দেখতে লাগলো। ঘড়ির কাঁটা সরতে লাগলো ,অমিত এত রাত্রি করে না, কি যে হলো ,একটা ফোন করতে পারতো।কথাটা মনে করতে করতে ফোনটা বেজে উঠলো।
                     সারারাত্রি ভালো ঘুম হয় নি কাজরীর ,নার্সিংহোমের বাইরের  বেঞ্চে প্রায় জেগেই কাটিয়েছে। অমিতের কাল রাত্রে একটা এক্সিডেন্ট  হয়েছে গাড়ি চালাতে চালাতে। কাজরী স্থির হয়ে ভাবছিল অমিতের কথা। অমিত বেঁচে আছে ,পায়ে চোট সকালে ডাক্তার বলেছে ,ঠিক হয়ে যাবে তাড়াতাড়ি।নার্সিংহোমের জানলা দিয়ে আকাশ দেখা যায়। সকালের শুভ্র নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে কাজরী ভাবছিল যদি অমিত না বাঁচতো। পৃথিবীটা একমুহুর্তে ভেঙ্গে পড়লো কাজরীর। তার সংসার ,তার মেয়ে কি করতো সে? সমস্ত স্পর্শগুলো একমুহুর্তে একসাথে কাঁপিয়ে দিল অস্তিত্ব ,ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো কাজরী।আসলে এক মস্ত ভুল করেছে কাজরী ,ভুল ভেবেছে জীবন সমুদ্রের মত ঠিক। কিন্তু রঙিন জীবনের বেঁচে থাকায়। আসলে সবাই একা নিজের কাছে কিন্তু আবার কেউ একা নেই এই সমুদ্রে ,অসংখ্য ঢেউ ,অসংখ্য বেঁচে থাকায় জড়িয়ে সকলে বেঁচে একে অপরের সাথে, একে অপরের জন্য। আর স্মৃতিরা জীবনে চলে  যাওয়া ঢেউ  সমুদ্রের পাড়ে।কাজরী মনটা হঠাত খুশি হয়ে উঠলো। ডাক্তারের ডাকে যেন  জেগে উঠলো কাজরী মিসেস মল্লিক আপনি বাড়ি যেতে পারেন মিস্টার মল্লিক এখন অনেকটা সুস্থ। 

No comments:

Post a Comment