Wednesday, February 25, 2015

বাইকে স্টার্ট

 বাইকে স্টার্ট
............... ঋষি
========================================================
                                               আমার পৃথিবীতে ছড়ানো  দৈনন্দিন সারেঙ্গীর বাইরে আলাদা পৃথিবী ,যেখানে স্পর্শ করে না কোনো খবরের পাতা ,দৈনন্দিন বেকার থাকার গঞ্জনা,সেখানে প্রচুর আলো আর স্বপ্নের ভিড় । সেখানে পৃথিবীর আলোতে আরেকবার যদি জন্ম নেওয়া যায় কি হওয়া যায় শচীন তেন্ডুলকার ,প্লিস যেন আরেকবার শঙ্কর না হয়ে জন্মায়। এমনতর চিন্তা শঙ্করের আজকাল মাথাচাড়া দেয়।
মা হারা   শঙ্কর সান্ন্যাল ,বাড়ি নদীয়ায় ,আজ সাত মাস  হলো শঙ্করের বর্তমান বাস কলকাতা একটি চায়ের দোকান। দুচোখে স্বপ্ন বড় মানুষ হওয়ার। বাবার মৃত্যু শয্যায় শঙ্করের পৃথিবী ভেঙ্গে পরে। বাবা সাধারণ অফিসের কেরানী ছিলেন ,শঙ্কর তখন সদ্য এইচ এস পাস কলেজে ভর্তি হয়েছে । নিজের জ্ঞাতি গুষ্ঠির  কেউ পাশে দাঁড়ায়  নি  শঙ্করের বাবার মৃত্যুর দিন। বাড়ির সামনে ক্লাবে শঙ্কর কেরাম পিটছিল ,বাবা অসুস্থ ছিল জানতো শঙ্কর।দুপুরে ভাত খেতে এসে বাবার শরীরটা  পরে ছিল দরজার কাছে। শঙ্কর কাঁদে নি বাবার মৃতদেহে আগুন দিয়ে শুধু বুঝেছিল শেষ বাঁধনটা ছিঁড়ে গেল। পাড়ার জ্যেঠুরা স্বান্তনা দিয়েছিল বাবা তো চিরকালের নয় কিন্তু কিছুদিন থাকার পর  খিদের জ্বালায় বুঝেছিল এখানে আর নয়। আর কোনো পিছুটান ছিল না শঙ্করের একমাত্র মালতী বাদে। মালতী পাশে বাড়ির হারান কাকুর মেয়ে। ছোটবেলা থেকে একসাথে মানুষ হয়েছে। শঙ্কর মা বেঁচে থাকতে মালতীর মা বন্ধু ছিল ,আর সেই সুত্রে তাদের ছেলে মেয়েদের সম্পর্ককে তারা বাঁধতে চেয়েছিল। মা নেই,বাবা ও মারা গেছেন শঙ্কর একদিন দুপুরে লক্ষীর ঘট ভেঙ্গে শেষ সম্বল ২৪২ তা ৬০ পয়সা নিয়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল তখন দেখেছিল মালতীর চোখে জল।
            কলকাতা এসে শঙ্কর তাজ্জব হয়ে গেল। এমন শহর পৃথিবীতে আছে ,শহরটা ছুটছে দিনরাত। কখনো শান্ত হয় না এ শহর ,কোনো কারণেই থামতে চায় না এই শহর। বড় ভয় পেয়েছিল সে কিন্তু বুঝেছিল বাঁচতে গেলে ছুটতে হবে এই শহরে ,না হলে মৃত্যু নিশ্চিত। কিছুদিন মুটেগিরি করলো হাওড়া স্টেসনে বুঝলো একাজ তার নয়। তারপর আজ পাঁচ মাস এই সল্টলেকে অফিস ঘেঁষা চায়ের দোকানে। তার কাজের সময় সকাল ছটা থেকে রাত্রি সাতটা ,তারপর ছুটি ,মাইনে বারোশো টাকা। আজ পাঁচমাসে শঙ্কর হাজার তিনেক টাকা জমিয়েছে কিন্তু মনে শান্তি নেই তার ,কারণ সে জানে এই কাজ তার নয়। পাশের অফিসের ব্রতীন বাবুকে শঙ্কর বলেছে অফিসে একটা চাকরির জন্য। ব্রতীন দা বেশ ভালো ,মাঝে মাঝে তার খবর নেয়,অফিসে চা দিতে গেলে দু -পাঁচ টাকা বকশিশ দেয়।
                       আজ শঙ্করের বেশ আনন্দের দিন ব্রতীনদার অফিসে তার অফিস বয়ের চাকরিটা তার হয়ে গেছে।মাইনে তিন হাজার টাকা ,ব্রতীন দাকে কি বলে ধন্যবাদ দেবে বুঝে পায় না শঙ্কর। এই অফিসে কাজ কিছু নেই ,একটু বোতলে জল ভরে দেওয়া,ফাইল এই টেবিল থেকে ওই টেবিলে দেওয়া ,বেশির ভাগ অফিসের একটা বেঞ্চে বসে থাকে শঙ্কর।বসে বসে জীবন্ত স্বপ্ন দেখে ব্রতীনদার
গার্ল ফ্রেইন্ড বৃষ্টিদির  মত সেও মালতীকে নিয়ে বাইকে স্টার্ট দিচ্ছে তারপর দূর বহু দূর। মনটা মুরচে ওঠে শঙ্করের মালতীর জন্য। মনে পরে যায় দেশের বাড়ির কথা। মালতীকে নিয়ে শঙ্কর লুকিয়ে চুরিয়ে সাইকেলে করে নদীর পারে ঘুরছে। মালতীর চুলের গন্ধ ,মিষ্টি হাসি সব কিছু মনে পরে যায় শঙ্করের। পুজোর সময় অফিস বন্ধ থাকে পাঁচদিন। তখন শঙ্কর দেশের বাড়ি যাবে একবার।
                         আজ পঞ্চমী, অফিসের ছুটি শুরু আজ থেকে। ভারী মজা শঙ্করের ,বেশ কিছু টাকা জমিয়ে ফেলেছে সে। ব্রতীন দা তাকে একটা ব্যাঙ্ক এক্যাউন্ট খুলে দিয়েছে। অনেক টাকা বকশিশ পেয়েছে সে অফিসের সবার কাছে। তার হাসিখুশি স্বভাবের জন্য সে অফিসে বেশ প্রিয়। ট্রেনে চড়ে বসলো শঙ্কর,সে ভীষণ খুশি তার সাথে মালতীর দেখা হবে প্রায় একবছর পর। ট্রেন ছুটছে ,শঙ্কর মালতীর জন্য কেনা শাড়ি,কাঁচের চুড়ি সব বুকে আগলে ছুটে চলেছে ট্রেনের আগে স্বপ্নের দেশে। শঙ্কর বাইকে স্টার্ট দিল ,বৃষ্টিদির মালতী বাইকের পিছনে উঠে বসলো। স্বপ্ন দেখতে দেখতে শঙ্কর ঘুমিয়ে পড়লো কখন যেন।
                           শঙ্কর ফিরে এসে অফিসে যোগ দিয়েছে আজ এক সপ্তাহ হলো। মনটা তার ভালো নেই। যখন কোনো স্বপ্ন যখন কাঁচের মত টুকরো টুকরো হয়ে যায় ,তখনও মানুষ বাঁচে কিন্তু বাঁচাটুকু মরে যায়। শঙ্কর তো মরে গেছিল তখনি যখন মালতীর মা শঙ্করকে বলেছিল মালতীর বিয়ে হয়ে গেছে। শঙ্করের হাত ধরে ক্ষমা চেয়েছিল মালতীর মা ,তিনি সব জানতেন তবু মালতীর বাবার বিরুদ্ধে যেতে পারেন নি। শঙ্কর কিছু বলতে পারে নি তবে হৃদয়ের বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলো সব কেমন যেন তেতো হয়ে গেছে জীবনের।
               আজ শনিবার হাফডে অফিসের। কিন্তু ইয়ার এন্ডিং তাই মোটামুটি সবাই আছে ব্রতীন দা সকাল থেকে খুব ব্যস্ত ,লাঞ্চ করার সময় পাই নি। এখন রাত্রি নটা বাজে। বৃষ্টিদি অপেক্ষা করছে ব্রতীনদার কাজ শেষ হবার। ব্রতীন দা বারংবার বলছে বৃষ্টি তুমি চলে যাও ,শঙ্কর তোমার ছেড়ে আসছে ,ও বাইক চালাতে পারে তোমায় ছেড়ে আসুক। বৃষ্টি দি যেতে নারাজ বলছে তুমি শেষ করো না আমি আছি। এখন  রাত্রি দশটা ব্রতীন দার কাজ শেষ হয় নি ,শংকর বাইকে স্টার্ট দিচ্ছে ,ব্রতীন দা হাত নাড়ছে বৃষ্টিদিকে বিদায় জানাবার জন্য। বৃষ্টি দি উঠে বসলো শঙ্করের পিছনে ,বললো এই ছোকরা দেখে চালাস। শঙ্করের বুক কাঁপছে দুরুদুরু,মালতীকে বাইকে করে স্বপ্নটা ভাসছে চোখের সামনে। সামনে মহিষবাথান        
রাস্তা পুরো ফাঁকা। শঙ্করের বাইকের স্পিড ৬০ এর কাছাকাছি। দূরে অন্ধকার রাস্তার পিচটাকে  বাইকের স্পট লাইট চিরে এগোচ্ছে। শঙ্করের মনে স্বপ্নের অন্ধকার চিরে মালতী কানের কাছে বলছে আসতে চালা। একটা শব্দ হলো পিছনের চাকা চ্যাপ্টা হয়ে গাড়িটা পাশের ল্যাম্প পোস্টে ধাক্কা। ধাক্কা খেল শঙ্করের শরীর অব্যক্ত যন্ত্রণা পায়ে ,শঙ্কর বাইক চালাচ্ছে তবু পিছনে মালতী। চোখ বন্ধ করার আগে দেখলো অনেকগুলো মুখ তার উপর ,কেউ বলছে মেয়েটার বিশেষ লাগে নি। শঙ্কর চোখ বুঝলো বাইকে স্টার্ট পিছনে মালতী।

Sunday, February 22, 2015

জীবন সমুদ্র

জীবন সমুদ্র
............. ঋষি
========================================================
আসলে কিছুই থাকে না পরে। জীবন সে যে সমুদ্রের মত অসংখ্য মুহুর্তের  ঢেউ। আসে যায় অথচ স্থির থাকে না কিছুই। এই যে সামনে বারান্দায় শুয়ে থাকা শীতের রৌদ্র সেও স্থির নয় ,হারিয়ে যায় সন্ধ্যের স্পর্শে আসলে কিছুই থেমে থাকে না সময়ের ঘড়ির কাঁটায়।বদলায় মুহূর্ত প্রতিক্ষণে একমাত্র স্থির মানুষের হৃদয়ের স্পর্শগুলো যেগুলো স্মৃত্মির কুটিরে আমৃত্যু দোলা দেয়।
                                                                          এই সব ভাবছিল কাজরী দুপুরের বিছানায় এলিয়ে শুয়ে।এই সময়টা অনন্ত অবসর কাজরীর। টুপুর স্কুলে থাকে আর অমিত অফিসে। দুপুরের খাওয়ার পর কাজরী একটু গড়িয়ে নেয় ,এটা তার বহুদিনকার অভ্যাস। কাজরী মল্লিক বলে যে ভদ্রমহিলাকে এই বাড়িতে গৃহকত্রী তার হৃদয়ে যে আলাদা এক কাজরী বাস করে তা বোধহয় কেউ জানে না এই বাড়িতে। এমনকি অমিতও না। অমিত মল্লিক লোকটি কাজরী মল্লিকের আইনত স্বামী ,অন্য স্বামীর মত  তার পত্নীর মত সমস্ত ভালোলাগা ,খারাপ লাগা গুলো জড়িয়ে থাকেলেও কোথায় যেন আজ নয় বছর সংসার করার পরও কাজরী একা।  এই কথা কাজরী কখনো বুঝতে দেই নি। নিজের পক্ষে যতদূর সম্ভব পত্নীরূপে ,মাতারূপে ,বধুরূপে ,সর্বপরি কোনো সংসারী নারী রূপে সে প্রতিক্ষণে নিজেকে বিলিয়ে চলেছে। কিন্তু কখনো সে দেই নি তার মনের খবর কাউকে। আজ অনেক্ষণ ধরে হাতের খোলা পত্রিকার উপর কাজরীর চোখ ,অথচ চোখ ছুঁয়ে আছে দুয়ারের বাইরে বারান্দা পেড়িয়ে সুদূর আকাশে। আজ তার মনটা আনছান করছে,আজকাল মাঝের মধ্যে এমন হয় কাজরীর। মনটা কেন যে আকাশ ছুঁতে চায়। ঢং ঢং করে ঘড়িতে চারটে বাজলো।
                 এবার উঠতে হবে কাজরীকে ওপরের ছাদের শুকনো জামাকাপড়গুলো তুলতে হবে ,টুপুর স্কুল থেকে ফিরবে খেতে দিতে হবে, শাশুরিকে চা করে দিতে হবে, অনেক কাজ জমে ,এখন রাত্রি অবধি কাজরীর দম ফেলার সময় নেই। বাড়ির ল্যান্ড লাইনের টেলিফোনটা বাজছে, এ সময় সাধারনত কেউ ফোন করে না ,কে করলো ফোন। কাজরী উঠে বসলো শাশুরির গলা বৌমা অমিত ফোন করছে ফোনটা ধরো।
                   কাজরী সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলো। এই বাড়িটা একটু পুরনো আমলের দোতলা। অমিতের দাদুর আমলে তৈরী। কাজরী শুনেছে এই বাড়িতে একসময় প্রচুর লোক আসাযাওয়া করতো। অমিতের দাদু একজন নামকরা উকিল ছিলেন। ফোনটা ধরলো কাজরী ওপাশে অমিত ,এই শোনো আমার ফিরতে একটু দেই হবে ,একজন মক্কেলের বাড়ি যেতে হবে। অমিত এই শহরের একজন নামকরা উকিল। ওদের একমাত্র মেয়ে টুপুর ক্লাস সেভেনে পড়ে। এই ফিরলো বলে। কাজরী সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে উঠতে শাশুরিকে  বললো জামাকাপড়টা  তুলে মা আমি চা করে দিচ্ছি।
                 এখন রাত্রি নটা বাজে টুপুর পড়ছে ওই ঘরে ,ওর মাস্টার এসেছে।  কাজরী পাশের ঘরে টুপুরের ফ্রকটা সেলাই করছে। টুপুরটা খুব দুষ্টু হয়েছে ,এতো লাফালাফি করে ,মাঝে মাঝে মনে হয় ঈশ্বর ছেলে করে পাঠাতে পাঠাতে ছেলেটাকে মেয়ে করে দিয়েছে। মাস্টার বেড়িয়ে গেলো টুপুর ছুটে এলো মা টিভিটা একটু চালিয়ে দেও ,এই সময়টা টুপুরের টিভি দেখার সময়। ওর বাবা আসবে তারপর একসাথে খেয়ে ঘুমোবে। অমিত ফিরতে ফিরতে রাত ১০ টা হবে। কাজরী উঠে রান্না ঘরের দিকে গেল খাবার গরম করতে শাশুরিকে খেতে দিতে হবে ,সেকালের মানুষ বেশি রাত জগতে পারেন না। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে দূরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কাজরীর ছোটবেলার কথা মনে হলো। কাজরীও টুপুরের মত বাবার জন্য অপেক্ষা করতো রাত্রে। বাবা ফিরলে বাবাকে জড়িয়ে কত কথা ,সারাদিন সে কি করেছে। আসলে ওই সময়টা আজকাল কাজরীর স্বপ্ন মনে হয় ,কি সুন্দর ছিল দিনগুলো। কিন্তু সব আজ স্মৃতির পিছনের পাতায় জমে।
                    শাশুরির খাওয়া হয়ে গেছে শুয়ে পড়েছেন  ,টুপুর টিভি দেখছে ,কাজরী  গিয়ে পাশে বসলো মেয়ের। মেয়েটা মন দিয়ে টিভি দেখছে কার্টুন চ্যানেল। নিজের মনেই হাসছে ,গম্ভীর হচ্ছে ,একবার কাজরীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো মা বাবা বাড়ি ফিরলো না। কাজরী বললো এই তো ফিরবে মা ,তুই খেয়ে নে না ১০.৩০ বাজে। টুপুর বাবার সাথে খাবে বলে টিভি দেখতে লাগলো। ঘড়ির কাঁটা সরতে লাগলো ,অমিত এত রাত্রি করে না, কি যে হলো ,একটা ফোন করতে পারতো।কথাটা মনে করতে করতে ফোনটা বেজে উঠলো।
                     সারারাত্রি ভালো ঘুম হয় নি কাজরীর ,নার্সিংহোমের বাইরের  বেঞ্চে প্রায় জেগেই কাটিয়েছে। অমিতের কাল রাত্রে একটা এক্সিডেন্ট  হয়েছে গাড়ি চালাতে চালাতে। কাজরী স্থির হয়ে ভাবছিল অমিতের কথা। অমিত বেঁচে আছে ,পায়ে চোট সকালে ডাক্তার বলেছে ,ঠিক হয়ে যাবে তাড়াতাড়ি।নার্সিংহোমের জানলা দিয়ে আকাশ দেখা যায়। সকালের শুভ্র নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে কাজরী ভাবছিল যদি অমিত না বাঁচতো। পৃথিবীটা একমুহুর্তে ভেঙ্গে পড়লো কাজরীর। তার সংসার ,তার মেয়ে কি করতো সে? সমস্ত স্পর্শগুলো একমুহুর্তে একসাথে কাঁপিয়ে দিল অস্তিত্ব ,ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো কাজরী।আসলে এক মস্ত ভুল করেছে কাজরী ,ভুল ভেবেছে জীবন সমুদ্রের মত ঠিক। কিন্তু রঙিন জীবনের বেঁচে থাকায়। আসলে সবাই একা নিজের কাছে কিন্তু আবার কেউ একা নেই এই সমুদ্রে ,অসংখ্য ঢেউ ,অসংখ্য বেঁচে থাকায় জড়িয়ে সকলে বেঁচে একে অপরের সাথে, একে অপরের জন্য। আর স্মৃতিরা জীবনে চলে  যাওয়া ঢেউ  সমুদ্রের পাড়ে।কাজরী মনটা হঠাত খুশি হয়ে উঠলো। ডাক্তারের ডাকে যেন  জেগে উঠলো কাজরী মিসেস মল্লিক আপনি বাড়ি যেতে পারেন মিস্টার মল্লিক এখন অনেকটা সুস্থ। 

Friday, February 20, 2015

অপেক্ষা তৃষ্ণা


অপেক্ষা তৃষ্ণা
..............ঋষি
========================================================
সকাল থেকে সন্ধ্যা যে অপেক্ষার অভ্যাস গা সওয়া সোহমের ,যে অপেক্ষায় আজ কেটে গেছে আট বছর ,তার পরিবর্তন কিছু হয় নি। আজ বিয়াল্লিশে দাঁড়িয়ে সোহম দাঁড়িয়ে থাকে তৃষ্ণার অপেক্ষায় বারান্দার দরজার দিকে তাকিয়ে । দমদমের এই বাড়িটা সোহমের পিতৃদত্ত। ভাই বোন বলে কেউ নেই। গত বছর মা মারা গেলেন সুতরাং মাথার উপর কোনো ভার নেই। সরকারী চাকরি রোজকার যা করেন তাতে বেশ আরাম সে চলে যায়। এখন ব্যাচলর সোহম ,বিয়ে হয় নি বলা ঠিক নয় তবে বিয়ের মত কিছু একটা ছিল তৃষ্ণার সাথে যৌবনের বেশ কিছু বছর।
                        রোজকার পরিবর্তনের সাথে তাল রেখে আজ সোহম অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। প্রায় শোনেন পার্টির রোজকার আলাপচারিতা ,খবরের কাগজে প্রকাশ্যে নগ্নতা ,টিভি তো রয়েছেই ,সোহমের এই সব ভালো লাগে না। তাই খবর কাগজ আর টিভি নিউসকে একটু এড়িয়ে চলেন। বিরক্ত লাগে সোহমের মানুষের মুখোশে লুকোনো মুখগুলোকে। আজ  রোববার ,শনি ,রবি সোহমের ছুটি থাকে। তাই একটু গা ছাড়া ভাব সকাল থেকে। করার কিছু নেই বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে সোহম ডাক দিল কানু এক কাপ চা দিবি। কানু ছেলেটা ছোকরা ,বছর তেইশের হবে। মা মারা যাবার সময় কানুকে সোহমকে দেখার ভার দিয়েছিলেন।যেদিন মা মারা যায় ,সেদিন বুধবার ছিল। অফিসে একটা ফোন এসেছিল ,সোহম বাড়ি ফিরতে ফিরতে সব শেষ। কাঁদতে পারে নি সেদিন সোহম হয়তোবা কিছুতেই মানতে পারছিল না। সেদিন সোহম তৃষ্ণাকে ফোন করে  খবরটা দেই সেদিন তৃষ্ণা ফোনে কেঁদেছিল খুব কিন্তু  আসেনি হয়তো আসা সম্ভব ছিল না ফিরে ।
কানু চা দিয়ে গেল ,সোহম কানুকে কিছু টাকা দিয়ে বাজারে পাঠালো। কানু ছোকরাটা রান্না বান্না ভালই করে। মা যোগার করেছিলের কোথা থেকে।মা বলেছিলেন বিয়ে তো তুই করলি না ,আমার বয়স হচ্ছে আর পারি না ,এই ছেলেটা রাখলাম ,ও আমাকে সাহায্য করবে। মা  ,বাবা মরা ছেলে কানু তবে থেকে রয়ে গেছে এই বাড়িতে।
              সেই কলেজজীবনে প্রথম দেখেছিল তৃষ্ণাকে । হাসিখুসি ,চঞ্চল প্রকৃতির প্রজাপতি।সোহমের তখন ফাইনাল ইয়ার,কলেজের কালচারাল সেক্রেটারি ছিল সে।তৃষ্ণা সদ্য তখন কলেজে এসেছে বাংলা বিভাগে।   সেই বছর কলেজ পত্রিকায় একটা গল্প দিয়েছিল তৃষ্ণা। কত  পরিনত লেখা ,মুক্ত চিনতে সেদিন ভুল হয় নি সোহমের।সোহমের লেখালিখির অভ্যাস ছিল ছোটবেলা থেকে। এদিক ওদিক পত্রিকায় বেশ কিছু লেখা ছাপা হতো নিয়মিত কিন্তু তৃষ্ণার লেখার ধরন যে একদিন বেশ পরিচিত হয়ে উঠবে তা সোহম টের পেয়েছিল তখনি। তারপর স্বরস্বতী পুজোর সেই বিকেলটা যেদিন তৃষ্ণা বাসন্তী রঙের শাড়ি পড়ে কলেজে এলো,সোহম আর পারে নি ,প্রপোস করলো। দু সপ্তাহ টালবাহানার পরে প্রপোস এক্সসেপ্টেড হলো। এদিকওদিক ঘোরাঘুরি,ধর্মতলা ,ফুটপাথ কত সময় একসাথে। গঙ্গার ধারে প্রথম চুমুটা সোহমে আজও মনে আছে। সেদিন কলেজ কেটে বেড়িয়ে এসেছিল ওরা। তৃষ্ণা বললো আজ গঙ্গায় যাব চল। গঙ্গার ধারে এসে সহমকে জোর করে নৌকায় তোলে তৃষ্ণা। টিপটুপ বৃষ্টি পরছিল ,নৌকার ছাইয়ের তলায় ওরা বসে। তৃষ্ণা বললো সোহম আজকের মুহূর্তটাকে কি করে ধরে রাখা যায়। সোহমের হাতে সিগারেট বাড়িয়ে দিল সোহম,নিও সিগারেট খাও ,আজ প্রথম হবে তোমার ,স্মরনীয় থাকবে। তৃষ্ণা কিছু উত্তর না দিয়ে সোহমের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এমন চুমু সোহমের কাছে নতুন ছিল ,এক নতুন আমন্ত্রণ আশার আলো সোহমের চোখে। সেই দিনটা আজও মনে পড়লে বুকটা মুচড়ে ওঠে।
সেই বছর সোহম বেড়িয়ে এলো কলেজ থেকে। মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্যান্য একমাত্র সন্তানের মত সরকারী চাকুরীর পরীক্ষায় বসতে লাগলো নিয়মিত। আর নিয়মিত দেখা করতো তৃষ্ণার সাথে। চাকুরীর পড়াশুনা ,হাতখরচার টিউশুনির মাঝে একমাত্র নিঃশ্বাস ছিল তৃষ্ণার সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো।সারাদিন সোহম তাকিয়ে থাকতো অপেক্ষায় কখন দেখা হবে তৃষ্ণার সাথে। যে বছর তৃষ্ণা কলেজ শেষ করে বেড়োলো ,সে বছর চাকরি পেল সোহম। আর তৃষ্ণা জার্নালিসমের স্পেসাল কোর্সে ভর্তি হলো। দুবছর কোর্সের শেষে চাকরি পালো তৃষ্ণা একটা দেশের নামকরা পত্রিকায়। সেই দিনগুলোতে সোহমের মনে হত বোধহয় ভাগ্যদেবী বেশ সন্তুষ্ট তার উপর। হিসেব মাফিক জীবন চলছিল সোহমের । এতদিনে লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছে সোহম কিন্তু তৃষ্ণা লেখালিখি শুরু করেছে। নিয়মিত পত্রিকার কলামে তৃষ্ণার  রিপোর্টিং নিউসগুলো পড়ে ,গর্বে বুক ফুলে যেত সোহমের।তখনি বাড়িতে কেউ জানে না তাদের এই প্রেমকাহিনী। কিছুটা আন্দাজ করতো সোহমের মা। দু বছর চাকরি করার পর বেশ কিছু টাকা জমিয়ে ফেলেছিল
সোহম তৃষ্ণা আর তার আগামী জীবনের জন্য। তৃষ্ণা আর মধ্যে বেশ কিছু গল্প লিখে নাম করে ফেলেছে লেখিকা হিসেবে। তৃষ্ণার প্রথম উপন্যাস "তৃষ্ণা" লিখে তৃষ্ণা যখন উপন্যাসের পান্ডুলিপি সহোমকে পড়তে দিল তখন তৃষ্ণা বলেছিল পড়ে দেখো এই লেখা ফাটিয়ে চলবে। এটা তৃষ্ণার অভ্যাস ছিল প্রথম কিছু লিখেই সোহমকে পড়তে দিত ,সেই তার রিপোর্টিং নিউস হোক কিংবা গল্প। সেদিন সারারাত জেগে উপন্যাসটা শেষ করেছিল সোহম,বুঝেছিল তার প্রেমিকা সাধারণ নয়। " তৃষ্ণা " উপন্যাসটা লেখার জন্য তৃষ্ণা বেশ কিছু পুরস্কার পেল। ওর অফিস থেকে একটা অফার দিল আরো পড়াশুনার জন্য তাকে বিদেশে যাওয়ার। তৃষ্ণা প্রথমে রাজি হয় নি কিন্তু সোহম বুঝিয়ে রাজি করেছিল। এতদিনে দুই বাড়িতে জেনে গেছে ওদের সম্পর্কের কথা ,কোনো সমস্যা নেই। ওরা ঠিক করলো দু বছর পড়াশুনা শেষ করে তৃষ্ণা ফিরলেই ওদের বিয়ে হবে। তৃষ্ণা চলে গেল দুবছরের জন্য।
সোহমের দিন আর কাটে না। ফোন কথা হয় কিন্তু কলরেট এত বেশি সোহমের পকেট পারমিট করে না। সময় চলতে থাকে নদীর মত ,আকাশের রং বদলায় নিজের স্বভাবে তেমনি মানুষ বেঁচে থাকতে পারে বাঁচার তাগিদে মৃত্যুর মাঝে। সেই দিনগুলো সোহমের কাছে মৃত্যুসম ছিল। একবার মাঝখানে ফিরেছিল দেশে তৃষ্ণা দিন দশেকের জন্য কিন্তু তাতে বোধহয় সোহমের কষ্ট আরো বাড়িয়ে গিয়েছিল । পাগলের মত সোহম প্রতিদিন খুঁজতো তৃষ্ণার লেখা ,খবরের কাগজে, গোগ্রাসে গিলতো তার তৃষ্ণার লেখাগুলো।অফিস আর বাড়ির মাঝে সোহমকে পাওয়া যেত সর্বদা কোনো নির্জন জায়গায়। সোহম অপেক্ষায় ছিল তৃষ্ণার ,জীবনের ভালো থাকার।
            এরপর সেই অভিশপ্ত দিনটা এলো অফিস শেষে পাড়ার ফোনের দোকান থেকে তৃষ্ণাকে ফোন করলো সোহম। হ্যালো হ্যালো শুনতে পাচ্ছো। ওপাশে বহুদিনকার চেনা গলা হ্যা বলো কেমন আছ তুমি। স্বাবাভিক শুভেচ্ছা বার্তার পর তৃষ্ণার গলাটা হঠাত  বড় অচেনা লাগলো সোহমের।ফোনটা রেখে দিল সোহম,নিজেকে ভীষণ শীতল লাগছিল সোহমের।সময়টা যেন থেমে গেছিল সোহমের।রাস্তার গাড়িঘোড়া ,মানুষ জনের কোনো শব্দ কানে ঢুকছিল না , একি বললো তৃষ্ণা তুমি এতো সিরিয়াস হচ্ছো কেন। আমরা তো ভালো বন্ধু আছি ,আমরা তো পাশাপাশি আছি ,কিসের অভাব। ঠিক ঠিক কিসের অভাব ,তৃষ্ণা আর দেশে ফেরে নি। মাঝে মাঝে আসে ঠিক ,দেখা করে প্রতিবারে সোহমে সাথে। এখন ওর ভীষণ নাম,দেশের অন্যতম নামকরা লেখিকা ,বেশ কিছু সাহিত্য পুরষ্কার ওর ঝুলিতে।  আগের মত চঞ্চল প্রজাপতির আছে তৃষ্ণা ,বয়স ওকে ছুঁতে পারে নি  যখনি আসে ছুঁয়ে যায় সোহমকে। কিছুদিন আগে তৃষ্ণা সোহমকে প্রশ্ন করেছিল কিগো বিয়ে করবে না চুল তো পেকে গেল। সোহম উত্তর দিয়েছিল সময় আসে নি আমার বিয়ের আমি অপেক্ষায় আছি। উত্তরে তৃষ্ণা মুচকে হেসে ছিল শুধু।