Sunday, October 16, 2022

ভগ্নাংশের জীবন

 ভগ্নাংশের জীবন 

.. ঋষি 


প্রেমিক : হ্যালো ! কি করছো ?

প্রেমিকা : অপেক্ষা 

প্রেমিক : কিসের অপেক্ষা ? কার অপেক্ষা ?

প্রেমিকা : আ ঢং ,জানে না যেন ,কার অপেক্ষা ,আমার কে আছে তুমি ছাড়া। 

প্রেমিক : কেন তোমার স্বামী ,তোমার সন্তান ,তোমার গুছোনো সংসার। 

প্রেমিকা : সব যদি গুছোনো হতো এত রাত্রি অবধি আমি কেন তোমার জন্য অপেক্ষা করতাম। 

প্রেমিক : জানো তো অপেক্ষা শব্দটারও একটা শেষ আছে ,কিন্তু আমাদের এই সম্পর্কটার শেষ কোথায়। একটা সত্যি কথা বলবে ,তুমি আমাকে ভালোবাসো ?

প্রেমিকা : না বাসি না ,মন্দ বাসি। তবে আমি চাই তুমি যাতে ভালো থাকো ,সুস্থ ভাবে আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াও। 

প্রেমিক : তাহলে এ ভালোবাসা নয় ,সে তো বন্ধুরাও এমন চায়। 

প্রেমিকা : তুমি কি জানো না ভালোবাসার প্রথম শর্ত বন্ধুত্ব ,আর তোমায় আমি কতটা ভালোবাসি তা তুমি জানো না। 

প্রেমিক : আমাকে এত ভালোবাসো তো আমার থেকে দূরে থাকো কেন ? আমাকে এত দূরে রাখো কেন ?

প্রেমিকা :বাচ্চাদের মতো বলছে দেখো , তুমি কি জানতে না ভালোবাসার আগে আমার একটা সংসার আছে ,একটা সন্তান আছে। আমি একটা মেয়ে, আমাকে সমাজ ,লোকজন সবাইকে নিয়ে চলতে হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ আছে। তুমি দিতে পারবে আমার সন্তানকে যোগ্য সম্মান ,ওর বাবা গভরমেনন্ট সার্ভিস করে। আমার আর সন্তানের একটা ভবিষ্যত  আছে।  ও রিটায়ার হওয়ার পর পেনশন পাবে ,ও যদি চাকরি করতে করতেও মারা যায় আমি ওর পেনশন পাবো। তা ছাড়াও আমার স্বামীর সাথে কিছু নেই তুমি জানো ,যতটুকু ওই মেয়েটার দিকে চেয়ে একসাথে থাকা। 

প্রেমিক : তবে এই যে পুজোর সময় তোমার স্বামীর সাথে ঘুরলে এই যে ডিসেম্বরে তোমরা পুরি যাচ্ছো তোমার স্বামীর অফিস পিকনিকে এগুলো কি ?

প্রেমিকা : বাবু তুমি বোঝার চেষ্টা করো এই পৃথিবীটা আজও পুরুষতান্ত্রিক ,সংসারে কতগুলো নিয়ম আছে ,তাছাড়া আমার সন্তানকে সুস্থ জীবন দেবার জন্য এই যাওয়াগুলো দরকার ,তাছাড়া আমার সন্তান আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে ,ও সব বোঝে। 

প্রেমিক : তবে কে অপেক্ষা করছে ,তুমি না আমি ?আচ্ছা একটা কথা বোলো যদি তোমার স্বামী মারা যায় ,তখন না হয় আমাদের বয়স হয়ে যাবে ,তখন আমাকে বিয়ে করবে ?

প্রেমিকা : না তোমাকে আমি কোনোদিনই বিয়ে করবো না। সত্যি যদি এমন কিছু হয় আমরা একসাথে থাকতে পারি কিন্তু বিয়ে নয়। আমার মা ,আমার ভাই কেউ মেনে নেবে না ,আমাদের পরিবারে এমন হয় নি কোনোদিন ,তাছাড়াও ও মারা গেলে আমি পেনশন পাবো ,আমার আর মেয়ের জীবন সিকিওর। 

প্রেমিক : তবে কি সারাজীবন ধরে আমি কি অপেক্ষায় করবো ,কোনোদিন তোমাকে পাবো না ,তুমি তো জানো তোমার সন্তান মানে আমার সন্তান। 

প্রেমিকা : আচ্ছা তুমি বলো ভালোবাসলে কি তবে বিয়ে করা জরুরী। 

প্রেমিক ; জরুরী না ,তবে বিয়ে হলো একটা সামাজিক ধাৱা ,যেটা না থাকলে তোমার আমার সম্পর্কটা কেউ মেনে নেবে না। 

প্রেমিকা : কে কি মানলো তাতে কি এসে যায় ,আমরা একসাথে থাকবো সেটাই জরুরী। 

প্রেমিক : তুমি এই ভাবে আমার সাথে সারাজীবন থাকতে পারবে তো ? আমি অপেক্ষা করছি ,করবো। 

প্রেমিকা : শুধু এত টুকু বলি আমি আছি। অনেক রাত হলো এইবার ঘুমিয়ে পড়ো ,আকল অফিস যেতে হবে ,আমি ডেকে দেব। 

প্রেমিক : সে তো জানি তুমি আছো ? কিন্তু আমি বুঝি না আমি কোথায় আছি ?

কি আমাদের ভবিষ্যৎ। 

প্রেমিকা : এতো ভেবে লাভ নেই ,যা হবে দেখা যাবে ,সময় কে দেখেছে ?

প্রেমিক : কিন্তু আমি বাঁচবো তো এতদিন ?

প্রেমিকা : এমন বলে না বাবু ,আমাদের এইভাবেই বাঁচতে হবে ,ভগ্নাংশের জীবন। 

অনেক রাত হয়েছে এইবার ঘুমিয়ে পড়ো বাবু ,সুস্থ থাকতে হবে। কাল সকালে আমি ডেকে দেবো গুডনাইট। 

প্রেমিক : হ্যালো ! হ্যালো ! একটা চুমু দেবে। 

প্রেমিকা : সবটাই তোমার ,কিন্তু এইভাবে চুমু দেওয়া যায় ,ঘুমিয়ে পড়ো বাবু ,সব ঠিক হবে  একদিন।    

কবি ও কবির সন্ধ্যা

 কবি ও কবির  সন্ধ্যা 

,,,,ঋষি 

স্ত্রী : হ্যা গো শুনছো 

কবি : কি ?

স্ত্রী : কি করছো  বলোতো তখন থেকে ওই কম্পিউটারে মুখ গুঁজে ,তোমার কি অফিস থেকে বাড়ি ফিরে কোনো কিছু বলার থাকে না ,এক না হলে বই ,না হলে সারাক্ষন ওই কম্পিউটারে লিখছে ? কি যে লিখছে ছাতার মাথা এত ,বলি কি রবীন্দ্রনাথ হবে নাকি ,আমার সাথে তো একটু থাকতে পারো ? কথা বলতে পারো ?

কবি : কি কথা বলবো ? তোমার সাথে সময় কাটানো মানে তো ওই টিভির সিরিয়ালের পুঁটির মা নিরুদ্দেশ ,না হলে পাশের বাড়িতে কার কি হয়েছে ,না হলে সেই তোমার মায়ের কিংবা ভাইয়ের কথা। 

স্ত্রী : কি করতে সংসার পেতেছিলে ? আমি তো আমার বাবা ,মা কেও তো দেখলাম সারাক্ষন এই বয়সেও কি যে কথা বলে এত। এই তো ওরা ঘুরে এলো পুটুমাসির বাড়ি থেকে ,জানো তো পুটু মাসির মেয়ের  ........

কবি : আরে থামো তো ,লেখাটা বেরিয়ে যাবে মাথা থেকে ,একটু সময় দেও প্লিজ একটু লিখে নি। 

স্ত্রী : কি হবে বলতো এত লিখে ,কে পড়ছে তোমার লেখা ,এই যে গাঁটের কড়ি খরচ করে দুটো কবিতার বই করলে ,কি একটাও তো বিক্রি হলো না ,সব তো একে ওকে দেন করলে। তুমি এত বুদ্ধিমান এই সব লেখা পড়া করে বরং এইবার একটা ব্যবসা করো আমার ভাইয়ের সাথে। জানো তো আমার ভাই রিন্টু এবার দার্জিলিঙে ঘুরে এলো বৌকে নিয়ে ,এই তো ফেসবুকে কত ছবি পোস্ট করলো। 

কবি : উফ ,প্লিজ আমাকে একটু লিখতে দেও ,তুমি কোনোদিন বোঝো নি আমি কি লিখি ,কেন লিখি , বিশ্বাস করো মাথার ভিতর শব্দরা নাচানাচি করে ,কেমন পাগল পাগল লাগে ,যতক্ষণ না লিখছি শান্তি নেই। তুমি জানো আমি যখন লিখি আমার মাথার ভিতর শব্দ বৃষ্টি হয়। প্রতিটা অন্যায় সে সমাজের হোক ,নারীরই হোক ,সে মানুষের হোক আমাকে বড় বিব্রত করে ,,,,

স্ত্রী : তুমি থামবে ,তুমি তো পাগল হয়েছো ,আমাকেও করবে ,এ সব ছাড়ো বরং একটু মুদির দোকান থেকে ঘুরে এসো সাবান শেষ। চিনি আনতে হবে ১ কেজি মতো। যদি রাতে পরোটা খাও তাহলে ময়দা নিয়ে এসো।

কবি : প্লিজ দাঁড়াও লেখাটা শেষ করে নি ,একটু সময়। 

স্ত্রী : রাত কটা বাজে দেখেছো ,মুদির দোকান বন্ধ হয়ে যাবে তো।  

কবি :আচ্ছা তুমি আর কিছু বলতে পারো না (কম্পিউটার ষাট ডাউন করতে করতে ),আমাদের কি আর অন্যকোন কোনো কথা থাকতে নেই। 

 স্ত্রী :তোমার সাথে কথা ,সে তো পাগলের সাথে বলা। তুমি বিনয় ,শক্তি ,সুনীল করবে আর আমার মাথায় কিছু ঢুকবে না। সে তো বিয়ের রাত্রি থেকে শুনছি ,তোমার মনে পরে সেইবার হানিমুনে গিয়ে এমন কবিতা শোনাতে শুরু করলে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার কপাল আমার বাড়ির লোকেরা আর ছেলে পাই নি ,বিয়ের আগে শুয়েছিলাম ছেলে পড়াশুনায় ভালো ,ভালো চাকরি করে ,লেখালিখি করে কিন্তু যদি জানতাম তোমার লেখা নিয়ে এই পাগলামি তবে আর বিয়ে করতাম না। 

কবি :তুমি কি বলেছো সারাজীবন আমাকে মাসকাবারি ফর্দ আর অসুখ-বিসুখের ওষুধ ছাড়া। সংসার মানে কি শুধু আলু ,পেঁয়াজ আর চাল ,ইলেকট্রিক বিল। আর কিছু না। আমার দিকে ভালো করে কখনো ফিরে তাকিয়েছো আমি কি চাই ?

স্ত্রী : সংসার মানে এর বাইরে কি ,ভালো থাকবো ,ভালো খাবো ,তিন মাস অন্তর ঘুরতে যাবো ,স্বামীকে জড়িয়ে শোবো কিন্তু তুমি তো শোয়া বসা ও করো না আজ বহুদিন ,একটা বাচ্চা অবধি আমাকে দিতে পারলে না এতদিনে। তোমায় দিয়ে আর কিছু হবে না ওই কবিতা লেখা ছাড়া।

কবি : আমি কি তোমায় ভালোবাসি না ,তোমার জন্য কিছু করি না ,এই যে গত পুজোয় লোন নিয়ে গাড়ি কিনলাম। 

স্ত্রী : ওই গাড়ি কিনলে ,কিন্তু কোথায় ঘুরতে নিয়ে গেলে একাডেমি অফ আর্টসে ,নাটক দেখতে কিন্তু আমি কি বুঝি নাটকের ,সত্যি হলো তোমার সাথে থাকা যায় না ,আমি আছি জোর করে ,না হলে (ফোঁপাতে ফোঁপাতে )

কবি : তুমি কেঁদো না ,আমার কষ্ট হয় ,প্লিজ চুপ করো ,বলো তোমার কি চায় ?

স্ত্রী : তুমি লেখালিখি ছেড়ে দেও ,ও আমার শত্রু ,আমার সংসারটা গিলে খাচ্ছে ,তুমি লেখালিখি ছেড়ে দেও। 

কবি : কি আনতে বলছিলে বেশ ,বোলো লিখে নি ,মুদির দোকানটা বন্ধ হয়ে যাবে।