আলোর কাছে
................ ঋষি
=====================================================
মহাবিশ্বের
অসংখ্য গোলকের যাতায়াতে একটা নিয়ম বর্তমান সৃষ্টিতে। কেউ কাউকে বিরক্ত করে না ,কেউ কাউকে আঘাত করে
,মহা আনন্দে একে অপরের সাথে বসবাস। ভূগোলের এই মহান তথ্যটা জানতে পেরে খুব অবাক হলো আলো।আলো মজুমদার ক্লাস ফাইভের স্টুডেন্ট ,বাবা ,মায়ের একমাত্র কন্যা। বাবা আনন্দ মজুমদার
এক ব্যাঙ্কেরকর্মী , মা চেনা মজুমদার কোনো বেসরকারী কোম্পানিতে কাজ করেন। সুতরাং অভাব কিছুই নেই আলোর ,একমাত্র বাবা মায়ের
সহচর্য ছাড়া। সকালে ঘুম থেকে উঠে আলো দেখে মা রেডি বেরোবার
জন্য ,আলোর কপালে চুমু খেয়ে বলেন কাজের দিদিকে বিরক্ত
করবে না ,পড়াশুনা করবে, আমি আসবার সময় তোমার রঙের খাতা নিয়ে আসবো। বাবা জিম থেকে ফিরতে
ফিরতে আলো স্কুলের জন্য রেডি ,বাবা তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে
যেতে যেতে বলেন এই রবিবার আমরা ঘুরতে যাব হ্যা
মা। অদ্ভূত একটা ব্যস্ততা এই বাড়িতে লেগে থাকে সবসময়। শুধু আলোর কোনো ব্যস্ততা নেই ,তবে একটা ভয় আছে মনে
স্কুলে যাবার।
কাজের দিদি আলোকে স্কুল বসে তুলে দিয়ে
আসে। আলোর যেন সময়টা
খারাপ শুরু হয়। একটা আলাদা অনুভব যেটা মনের মধ্যে বাসা বাঁধে "ভয় " ।ছোটবেলা যখন আলো অন্ধকারকে ভয় পেতো একদিন বাবা বলেছিলেন তোর নাম
আলো কেন বলতো মা কারণ অন্ধকার আলোকে ভয় পায়। তারপর থেকে যখনি ভয় পেয়েছে আলো অন্ধকারকে মনে মনে বলেছে আমার নাম আলো ,অন্ধকার কেটে গেছে ,সমস্ত ভয় পালিয়েছে।
স্কুল বাসের যে গনেশ কাকু যে
হেলপার ,যে সকলকে বসে উঠতে সাহায্য করে সে অদ্ভূত
ভাবে হাসে আলোকে দেখলে। ঘুমের মধ্যেও আলো মাঝে মাঝে চমকে ওঠে ওই পান
মশলা খাওয়া লাল দাঁত দেখে ,ঘুম ভেঙ্গে যায় বারংবার
মনের মধ্যে বলে আমি আলো ,আমি আলো কিন্তু ভয়
যায় না কিছুতেই। আলো কাউকে বলতে পারে না গনেশ কাকু অসভ্যতা
করে আলোর সাথে। বাসে ওঠার সময় ,অন্য যে কোনো অছিলায় আলোর শরীরে হাত দেয়। একবার বাসে ওঠার পর সে যে সিটে বসে সেই সিটে ওর ক্লাস ফ্রেন্ড অক্ষয় বসে থাকায়
আলোকে একটু পিছনে বসতে হয়েছিল। সেই সিটে কেউ ছিল না
,ও একলা ,স্কুল ফেরৎ
বাসটা খালি হচ্ছিল ,আলো জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। কখন যেন
হালকা ঘুম ধরে গেছিল চোখে। ঘুম ভাঙ্গলো আচমকা একটা যন্ত্রণা বুকে টের পেল আলো ,একটা হাত আলোর বুকে। আলো চোখে খুলে দেখে
গনেশ কাকু।
আলো কিছু বলতে পারে নি ,যন্ত্রনায় চোখে জল। গনেশ কাকু অদ্ভূত ভাবে
হাসলো
পিশাচের মতন ,বললো কেমন লাগলো মামুনি। ভাগ্যিস আলোর স্টপেজ
এসে গেছিল ,আলো নামলো বাস থেকে। দেখে কাজের মাসি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো আলো
কি হয়েছে তোমার। আলো বলতে পারে নি ,তখন থেকে আলোর অন্ধকার
দেখলে ভয় পায়। তবে একটা আলাদা বোধ আলোর মধ্যে কাজ করে ,ও বোধ হয় বড় হয়ে
যাচ্ছে যেটা অন্যায় এই পৃথিবী নামক গোলকে।
চেনা কদিন ধরে মেয়েকে দেখেছে কেমন আনমনা। খাওয়া দাওয়া করছে না ঠিকঠাক মনে হয় ,একটু রোগা লাগছে। কি করবে চেনা বেসরকারী কোম্পানিতে হরেক জ্বালা ,ছুটিছাটা একদম নেই। একদিন সপ্তাহে ছুটি থাকে নিজের কাজ করতে করতে
সময় কেটে যায়। মেয়েটাকে সময় দেওয়া হয় না ,কি করে যে মেয়েটা বড় হয়ে গেলো জন্মের পর টেরি পেলো না চেনা। পরশু ছুটির দিন ,পরশু সে মেয়ের সাথে থাকবে বলে ঠিক করলো।
আনন্দর আজ ব্যাঙ্কে
প্রচুর কাজ। কিছু আগের কাজও পেন্ডিং যা তুলতে হবে আজই
,কাল মসের শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় নেই আনন্দের।
ঠিক এই সময় ফোনটা বাজলো ,একটা আননোন নাম্বার। সাধারণ এমন ফোন ধরে
না আনন্দ আজ ধরলো। হ্যালো আনন্দ মজুমদার থানার থেকে বলছি ,আপনার মেয়ে এখানে আছে। একবার আসতে হবে আপনাকে। আকাশ ভেঙ্গে পড়লো আনন্দের
মাথায়। গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে মেয়েটার মুখ চোখের সামনে। কি জানি খুব ছোটো লাগছিল আনন্দের নিজেকে মেয়েটাকে ঠিক মতন সময় দিতে পারে নি সে
,কি করে যে মামুনি বড় হয়ে যাচ্ছে।
" আজ সময় " নামক খবরের কাগজে প্রথম পৃষ্ঠায় আলোর ছবি। আলো মজুমদার ক্লাস ফাইভের ছাত্রী কিভাবে নিজেকে রক্ষা করেছে ,কোনো এক গনেশ নামে সমাজের এক অন্ধকারকে কি ভাবে পুলিশের হাতে
তুলে দিয়েছে।
তাকে সরকার থেকে সাহসের জন্য নমিনেট করা হয়েছে
আলো নামক পুরস্কারের। আলো বলে কোনো এক সংস্থা আলোকে তার সাহসিকতার
জন্য অনেক শুভেচ্ছা জানিয়েছে। আলো নামে সেই ক্লাস
ফাইভের ছাত্রী এখন স্যাটেলাইট মিডিয়াতে পপুলার ফেস ,হাজার লাইক আর কমেন্টস তার নামে।
আলো এখন ভূগোল পরছে।পৃথিবীতে কি ভাবে রাত্রি হয় ,কিভাবে দিন হয় সেটা
জানছে। আলো ভেবে অবাক হচ্ছে বাবা ঠিক বলেছিল অন্ধকারকে আলো হারিয়ে দেয়। আলো যখন আসে সে সর্বত্র নিজের উপস্থিতি জাহির করে। অন্ধকার যতই শক্তিশালী হোক না কেন ,আলোর কাছে বাচ্চা। আলো আনমনে মুচকি হেসে ওঠে।

