Saturday, November 7, 2015

আলোর কাছে

আলোর কাছে
................ ঋষি
=====================================================
                                        মহাবিশ্বের অসংখ্য গোলকের যাতায়াতে একটা নিয়ম বর্তমান সৃষ্টিতেকেউ কাউকে বিরক্ত করে না ,কেউ কাউকে আঘাত করে ,মহা আনন্দে একে অপরের সাথে বসবাসভূগোলের এই মহান তথ্যটা জানতে পেরে খুব অবাক হলো আলোআলো মজুমদার ক্লাস ফাইভের স্টুডেন্ট ,বাবা ,মায়ের একমাত্র কন্যাবাবা আনন্দ মজুমদার এক ব্যাঙ্কেরকর্মী  , মা চেনা মজুমদার কোনো বেসরকারী কোম্পানিতে কাজ করেনসুতরাং অভাব কিছুই নেই আলোর ,একমাত্র বাবা মায়ের সহচর্য ছাড়াসকালে ঘুম থেকে উঠে আলো দেখে মা রেডি বেরোবার জন্য ,আলোর কপালে চুমু খেয়ে বলেন কাজের দিদিকে বিরক্ত করবে না ,পড়াশুনা করবে, আমি আসবার সময় তোমার রঙের খাতা নিয়ে আসবো।  বাবা জিম থেকে ফিরতে ফিরতে আলো স্কুলের জন্য রেডি ,বাবা তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে যেতে যেতে বলেন  এই রবিবার আমরা ঘুরতে যাব হ্যা মাঅদ্ভূত একটা ব্যস্ততা এই বাড়িতে লেগে থাকে সবসময়শুধু আলোর কোনো ব্যস্ততা নেই ,তবে একটা ভয় আছে মনে স্কুলে যাবার
               কাজের দিদি আলোকে স্কুল বসে তুলে দিয়ে আসেআলোর যেন সময়টা
খারাপ শুরু হয়একটা আলাদা অনুভব যেটা মনের মধ্যে বাসা বাঁধে "ভয় " ছোটবেলা যখন আলো অন্ধকারকে ভয় পেতো একদিন বাবা বলেছিলেন তোর নাম
আলো কেন বলতো মা কারণ অন্ধকার আলোকে ভয় পায়তারপর থেকে যখনি ভয় পেয়েছে আলো অন্ধকারকে মনে মনে বলেছে আমার নাম আলো ,অন্ধকার কেটে গেছে ,সমস্ত ভয় পালিয়েছে
                      স্কুল বাসের যে গনেশ কাকু যে হেলপার ,যে সকলকে বসে উঠতে সাহায্য করে সে অদ্ভূত ভাবে হাসে আলোকে দেখলেঘুমের মধ্যেও আলো মাঝে মাঝে চমকে ওঠে ওই পান মশলা খাওয়া লাল দাঁত দেখে ,ঘুম ভেঙ্গে যায় বারংবার মনের মধ্যে বলে আমি আলো ,আমি আলো কিন্তু ভয় যায় না কিছুতেইআলো কাউকে বলতে পারে না গনেশ কাকু অসভ্যতা করে আলোর সাথেবাসে ওঠার সময় ,অন্য যে কোনো অছিলায় আলোর শরীরে হাত দেয়একবার বাসে ওঠার পর সে যে সিটে বসে সেই সিটে ওর ক্লাস ফ্রেন্ড অক্ষয় বসে থাকায় আলোকে একটু পিছনে বসতে হয়েছিলসেই সিটে কেউ ছিল না ,ও একলা ,স্কুল ফেরৎ
বাসটা খালি হচ্ছিল ,আলো জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলকখন যেন
হালকা ঘুম ধরে  গেছিল চোখেঘুম ভাঙ্গলো আচমকা একটা যন্ত্রণা বুকে টের পেল আলো ,একটা হাত আলোর বুকেআলো চোখে খুলে দেখে গনেশ কাকু
আলো কিছু বলতে পারে নি ,যন্ত্রনায় চোখে জলগনেশ কাকু অদ্ভূত ভাবে হাসলো
পিশাচের মতন ,বললো কেমন লাগলো মামুনিভাগ্যিস আলোর স্টপেজ এসে গেছিল ,আলো নামলো বাস থেকেদেখে কাজের মাসি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো আলো
কি হয়েছে তোমারআলো বলতে পারে নি ,তখন থেকে আলোর অন্ধকার দেখলে ভয় পায়তবে একটা আলাদা বোধ আলোর মধ্যে কাজ করে ,ও বোধ হয় বড় হয়ে 
যাচ্ছে যেটা অন্যায় এই পৃথিবী নামক গোলকে
              চেনা কদিন ধরে মেয়েকে দেখেছে কেমন আনমনাখাওয়া দাওয়া করছে না ঠিকঠাক মনে হয় ,একটু রোগা লাগছেকি করবে চেনা বেসরকারী কোম্পানিতে হরেক জ্বালা ,ছুটিছাটা একদম নেইএকদিন সপ্তাহে ছুটি থাকে নিজের কাজ করতে করতে সময় কেটে যায়মেয়েটাকে সময় দেওয়া হয় না ,কি করে যে মেয়েটা বড় হয়ে গেলো জন্মের পর টেরি পেলো না চেনাপরশু ছুটির দিন  ,পরশু সে মেয়ের সাথে থাকবে বলে ঠিক করলো
                              আনন্দর আজ ব্যাঙ্কে প্রচুর কাজকিছু আগের কাজও পেন্ডিং যা তুলতে হবে আজই ,কাল মসের শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় নেই আনন্দের
ঠিক এই সময় ফোনটা বাজলো ,একটা আননোন নাম্বারসাধারণ এমন ফোন ধরে না আনন্দ আজ ধরলোহ্যালো আনন্দ মজুমদার থানার থেকে বলছি ,আপনার মেয়ে এখানে আছেএকবার আসতে হবে আপনাকেআকাশ ভেঙ্গে পড়লো আনন্দের মাথায়গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে মেয়েটার মুখ চোখের সামনেকি জানি খুব ছোটো লাগছিল আনন্দের নিজেকে মেয়েটাকে ঠিক মতন সময় দিতে পারে নি সে ,কি করে যে মামুনি বড় হয়ে যাচ্ছে
                              "  আজ সময় " নামক খবরের কাগজে প্রথম পৃষ্ঠায় আলোর ছবিআলো মজুমদার ক্লাস ফাইভের ছাত্রী কিভাবে নিজেকে রক্ষা করেছে ,কোনো এক গনেশ নামে সমাজের এক অন্ধকারকে কি ভাবে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে
তাকে সরকার থেকে সাহসের জন্য নমিনেট করা হয়েছে আলো নামক পুরস্কারেরআলো বলে কোনো এক সংস্থা আলোকে তার সাহসিকতার জন্য অনেক শুভেচ্ছা জানিয়েছেআলো নামে সেই ক্লাস ফাইভের ছাত্রী এখন স্যাটেলাইট মিডিয়াতে পপুলার ফেস ,হাজার লাইক আর কমেন্টস তার নামে।  

                        আলো  এখন ভূগোল পরছেপৃথিবীতে কি ভাবে রাত্রি হয় ,কিভাবে দিন হয় সেটা জানছেআলো ভেবে অবাক হচ্ছে বাবা ঠিক বলেছিল অন্ধকারকে আলো হারিয়ে দেয়আলো যখন আসে সে সর্বত্র নিজের উপস্থিতি জাহির করেঅন্ধকার যতই শক্তিশালী হোক না কেন ,আলোর কাছে বাচ্চাআলো আনমনে মুচকি হেসে ওঠে

Friday, November 6, 2015

মানুষ নামক ছেলেটি

মানুষ নামক ছেলেটি
.................... ঋষি
=======================================================
যুতসই খিস্তি খুঁজে পাচ্ছিল না মানুষ নামক ছেলেটি। আসলের এই বস্তি পাড়ায় বেজন্মারা জন্ম নেয় এমনি বিশ্বাস মানুষের, আর বাইরের উচ্চবৃত্তরা যে এই বেজন্মাদের অন্য চোখে দেখে মানে মানুষ ভাবে না এটাই স্বাবাভিক। এই রেল বস্তির অধিকাংশ সকলের জীবিকা হলো খেটে খাওয়া অর্থ দিন মজুরি ,আইসক্রিম বিক্রি ,ফুচকা বিক্রি ,মিস্ত্রী ,লেবার এই আর কি। সরকার বাবুর একটা নোটিস এসেছে এই মহল্লাতে ,পাড়া খালি করতে হবে ,রেল লাইনের শুভাকাঙ্খী সরকার বাবু পাঁচ দিন সময় পাঠিয়েছে। সকলের মাথায় হাত।
                            মানুষ নামক ছেলেটি একটু ঘাবড়ে গেছিল প্রথমে ,কিন্তু পিতৃ মাতৃহীন এই ছেলেটির মেরুদন্ডে একটা রোগ আছে সোজা হাঁটার ,মাথা নিচু না করার। প্রচুর শিকড় বাকড় ,ডাক্তার ,হেকিম এমনকি থানা পুলিশ সবই করেছে কিন্তু রোগটা সারে নি ,এই তো কদিন আগে জেলের ভাত খেয়ে এলো  বেমক্কা পাঁচ দিন। কে এক উঁচু ঘরের সোনার ছেলে পথ চলতি এক মেয়েকে টিটকিরি দিচ্ছিল ,রাস্তার পাশে মানুষ বলে ছেলেটা সাইকেলের চেইন পরে যাওয়ায় ,আটকাতে চেষ্টা করছিল ,পরবি পর ওরই চোখে পড়লো। আর কি তারপর মার সেই ছেলে আর তার বন্ধুদের ধরে। মানুষ ও মার খেলো  প্রচুর কিন্তু সোনার ছেলে আর বন্ধুরা জখম হলো বেশি যাই হোক এ যে মানুষের খেটে খাওয়া হাত ,পাথরের মতন শক্ত। পুলিশ এলো ,রাস্তায় সাইকেল পরে থাকলো মানুষের  ,তুলে নিয়ে গেলো কিন্তু সরকার বাবুর কোন আইনে যে সোনার ছেলে ছাড়া পেয়ে গেলো আর মানুষ নামক ছেলেটি জমা পড়লো জেলে সেটা বোধগম্য হয় নি মানুষের।
      এমনি এক ঘটনা ঘটেছিল সেদিন হাসপাতালে। বস্তির কোনো এক মরনাপন্ন বয়স্ক ভদ্র মহিলার শরীর খারাপ হয়েছিল সেদিন রাত্রে। কোনরকম ভ্যানে করে মানুষ নামক ছেলেটি আর তার বন্ধুরা নিয়ে গেলো সেই ভদ্রমহিলাকে জেলা হাসপাতালে। তখন রাত্রি উচ্চবিত্তের ডাক্তারবাবু ব্যস্ত মসকরাতে  বন্ধুদের সাথে ,ওই আর কি খোশ মেজাজে সদ্য মাত্র মদের বোতল খুলেছেন । সেই সময় মানুষের প্রবেশ ,ডাক্তার কে অনুরোধ করা হলো একটু বয়স্ক ভদ্রমহিলার দেখার জন্য। কিন্তু ডাক্তার বাবু মানতে নারাজ বললেন পরের দিন আসতে। ডাক্তারকে বোঝাতে চেষ্টা করা হলো যে আজ যদি চিকিত্সা না হয় তবে রোগী মারা যাবে। কিন্তু কে কার কথা শোনে ডাক্তার মানতে নারাজ। ঠিক এই সময় মানুষ নামক ছেলেটার মেরুদন্ড খাড়া হলো ,সোজা একটা সাদা কাগজ আর একটা পেন এগিয়ে দিল ডাক্তারের কাছে বললো লিখে দিতে কাল যদি ভদ্রমহিলা মারা যান তবে সমস্ত দায়িত্ব ডাক্তারের থাকবে ,ডাক্তার মানলেন না। তারপর যা হবার হলো সোজা চেপে ধরলো ডাক্তারের গলা মুঠিতে মানুষ। চিকিত্সা হলো বটে এই কারণে  সেই ভদ্র মহিলার,বয়স্ক ভদ্র মহিলা বেঁচে গেলেন সেই যাত্রায়। কিন্তু মানুষ বাঁচলো না ,পরের দিন পাড়া থেকে তুলে নিয়ে গেলো সরকার বাবুর পুলিশ।বেধরক মার কপালে জুটলো মানুষের। মানুষ বুঝলো না এই মারের মানে। মানুষ এটা জানে তাকে মার খেতে হয় প্রতিটা প্রতিবাদে ,তার গলার নলি চেপে ধরে অন্য কোনো উচ্চবৃত্ত প্রতিটা বেঁচে ফেরায় ,প্রতিদিন বাঁচায়। তাই আর গায়ে মাখে না এই মারকে কোনভাবে ,ভয় ও পায় না মানুষ নামক ছেলেটি।
                                  মানুষের জীবনের প্রতি পদে অসংখ্য প্রশ্ন ,অসংখ্য বিপদ মানুষ জানে। মানুষ জানে বাঁচতে গেলে লড়তে হবে নিজের সাথে ,স্বত্বার অধিকারের জন্য। কালকের বেঁচে থাকার জন্য ,কালকের নতুন জন্মকে উত্তর তো দিতে হবে যতই বেজন্মা হোক এই মানুষ নামক ছেলেটি কিন্তু তার ভিতরে কোথাও লুকোনো মানুষ আছে। কিন্তু এবার প্রশ্ন মানুষের বাঁচার অধিকারের ,বাসস্থান নিয়ে বিপদ ,কি করবে মানুষ নামক ছেলেটি। যুতসই খিস্তি খুঁজে পাচ্ছিল না সে সরকার বাবুকে দেওয়ার।
                      প্রত্যেক মানুষের ভিতর জানোয়ার থাকে। কেউ কেউ তাকে অশুভ কাজে ব্যবহার করে ,কেউ কেউ শুভ কাজে। আমরা সকলে জানি রক্ত একমাত্র বেরোয় না খুন হলে ,মারামারি করলে ,, প্রতিবাদ করলেও রক্ত পাত হয়। প্রাণ হানি একমাত্র ঘটে না বন্দুকের বুলেটের আঘাতে ,প্রতিবাদ করলেও প্রাণহানি ঘটে। আজ অবধি মানুষের কোনো প্রতিবাদ রক্ত ছাড়া হয় নি ,ফল যে সবসময় মানুষের পক্ষে গেছে তাও নয় ,তবু মানুষ প্রতিবাদ ভোলে নি। যখনি মানুষের পিঠ ঠেকে  গেছে দেওয়ালে ইতিহাস সাক্ষী মানুষ ফিরে দাঁড়িয়েছে ,প্রতিবাদ করেছে  বাঁচবার জন্য । মানুষ নামক ছেলেটি সেই প্রতিবাদের পথ বেছে নিল। সে ঠিক করলো প্রতিবাদ করবে আজকের সরকার বাবুর বিরুদ্ধে। তাকে ঘেরাও করবে ,বড় বড় বোর্ডের  ফেস্টুন নিয়ে। তাতে লেখা থাকবে মানছি না ,মানবো না তোমাদের দুর্নীতি ,মানুষের  অধিকার আমরা কখনো ছাড়বো  না। সে যতই ছুটে আসুক না কেন সরকার বাবুর পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ,বুলেট ,কিছুতেই পিছু হটবে না তারা।
তাদের প্রাপ্য তারা বুঝে ছাড়বে ,তার জন্য মরতে হলে মরবে। এই ভাবনায় মানুষ নামক ছেলেটি অপেক্ষা করছিল পরের দিন সকালের ,নতুন আলোর ,একটা নতুন দিনের।