Thursday, January 27, 2022

গোমড়া

গোমড়া 

... ঋষি  

আজীবন দৃশ্যের কল্পনায় যে লোকটা ছবি এঁকে গেছে তাকে যদি প্রশ্ন করো ছবি কাকে বলে ? সে হাসবে খানিক পাগলের মতো তারপর খুব অনায়াসে জীবন আর ছবির মাঝে তফাৎ কি ? আসলে মানুষের ঈশ্বরগুলো মানুষের গভীরে একটা  ছবি এঁকে রাখে ,তাকে কেউ জীবন বলে ,কেউ বলে ভালো লাগা ,কেউ বলে স্পন্দন। অনুরণন বহুক্ষন ধরে তাকিয়ে আছে দূরে মাঠের ওপারে সেই ছবিটার দিকে ,যে ছবিটা হয়তো তার ঈশ্বর এঁকে দিয়েছিল সেই ছোট্টবেলায় তার গভীরে ,

মা বলতো তুই যত গম্ভীররে নিশ্চয় স্কুল টিচার হবি ,বাবা বলতো এখনকার যুগের বাচ্চা এমনি হয় ,পড়শিরা যত বড়ো হলো অনুরণনকে  তার একটা নতুন  নাম দিয়ে দিলো " গোমড়া"। অবশ্য অনুরণন এই বিষয়ে আপত্তি ছিল না ,কারণ তার গোমড়া ডাকনামটা তাকে সুযোগ করে দিতে একটু আলাদা ভাবে নিজের ভিতর থাকতে। 

অনুরণন বন্দোপাধ্যায়কে আপনি গুগলে সার্চ মেরে পাবেন না ,সে এই শহরের কোনো এক স্কুলে বাংলার টিচার ,অতি সাধারণ ছাপোষা বাঙালি যে বাবার পদবীকে আশ্রয় করে তার পৈতৃক বাড়িতে একলাই থাকে। বাবা ,মা গত হয়েছে আজ প্রায় পাঁচ বছর ,চাকরিটাও বাবার সূত্র ধরে পাওয়া তার । সুতরাং এমন একটা মানুষ যার  আজকের যুগে কোনো ইমেইলআইডি নেই ,ফেসবুক একাউন্ট নেই ,কোনো বন্ধু নেই তাকে গুগুলে কেন ,এই পৃথিবীতেই একটু বেশি বলে মনে হবে। কেউ যদি ভুল করে তার ঠিকানা পাড়ার লোকেদের জিজ্ঞসা করে পাড়ার লোকেরা বলে কে ওই মাস্টারমশাইয়ের গোমড়া ছেলেটা তো ,যে বাবার স্কুলে মাস্টারি করে তাকে খুঁজছেন ?

অনুরণনেই আত্মীয় বলতে এক মাসি আছে যে অনুরণের মাঝে মাঝে খোঁজ করে ,ফোন করে খবর নেয় ,তাকে বলে এইবার বাবা একটা বিয়ে কর বিয়ের বয়স তো পার হয়ে যাবে ,বাস্তবিক অনুরণন এখন চল্লিশের কোঠায় ,কিন্তু সে মাসিকে বলে জানো তো আমি কেমন কে করবে আমাকে বিয়ে। অনুরণন মাঝে মাঝে বাবার  পুরনো টিভিটা চালায় ,শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে অবাক হয় ভাবে ছেলেগুলো কি করে মেয়েগুলোর সাথে এমন ন্যাকামি করতে পারে ,বিরক্ত হয়ে টিভি বন্ধ করে দেয়। তবে এমনতর অনুরণন একটা অদ্ভুত শখ আছে বিভৎস্য সব মুখোশ তৈরী করা ,যা ভারতবর্ষের কোথাও আপনি দেখতে পাবেন না।

 ২

                        মিস্টার তাপস পোদ্দার কলকাতার ইন্টালিজিয়েন্ট পুলিশ দপ্তরের একজন বড়ো অফিসার ,বেশ কিছুদিন ধরে নাজেহাল হয়ে এক খুনিকে খুঁজছেন ,কিন্তু কিছুতেই খুঁজে বের করতে পারছেন না খুনির  খুনের মোটিভ। শেষ তিন বছর ধরে এই শহরে বেশ কিছু মানুষ অথাৎ নারী ও পুরুষের খুন  হয়েছে কিন্তু তাদের  ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে  মৃত্যুর কারণ  মারাত্নক আতংক যার ফলে হার্টএটাক অথচ প্রত্যেকের শরীর থেকে ভীষণ প্রচ্ছন্ন ভাবে হার্টটাকে খুলে বের করে নেওয়া হয়েছে । অনেকেরই ধারণা খুনিরা  বোধহয় শরীরের অঙ্গ পাচারকারী কোনো দল  কিন্তু তাপস বাবুর মনে হয় খুনিএকজন কারণ প্রত্যেকটা খুন একইভাবে করা হয়েছে খুব নির্মম ভাবে এবং খুনের পর মৃতদেহ ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে গঙ্গার ধারে একই গাছের তলায়।  তাপসবাবুর মতে খুনি কোনো মানসিক রোগের স্বীকার কারণ প্রত্যেটি মৃতদেহের মুখে মৃত্যুর সময় লেগে ছিল মারাত্নক আতংক,প্রত্যেককে ভীষণ কষ্ট দিয়ে মারা হয়েছে ।                     


                       অনুরণন দোতলা বাড়ির উপরের তলাটা পুরো খালি করে ষ্টুডিও বানিয়েছে নিজের মতো করে ,সেই ঘরে গেলে আপনি দেখতে পাবেন স্তূপাকৃত মাটি ,ঘাস ,বিভিন্ন প্রাণীর লোম আর অসংখ্য মুখোশ। মুখোশগুলো বেশিরভাগই কোনো মানুষ কিংবা প্রাণীর অথচ মিলটা হলো প্রত্যেকটা মুখোশে মারাত্নক এক আতংক ,কেমন যেন অপমৃত্যুর আগের জীবের যে বাঁচার আকুতি তার প্রতিচ্ছবি।

অনুরণন এখন দাঁড়িয়ে ছিল দেওয়ালের গায়ে টাঙানো তার বাবা আর মায়ের মুখের আকৃতির মুখোশটার দিকে ,হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠলো গোমড়া আমি গোমড়া ,তারপর ছুটে গেলো পাশের ঘরে একটা আলমারির সামনে।এক টানে খুলে ফেললো আলমারি। সারা আলমারি ময় কাঁচের বয়াম আর বয়ামে কিছু একটা তরলে রাখা মানুষের হৃদয়। অনুরণন  বের করে টেবিলে রাখলো  তার  বাবা ,মার নাম  লেখা বয়ামদুটো ,তারপর সেগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে প্রায় চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল " আমি গোমড়া ,আমি গোমড়া ,আর কোনোদিন বলতে পারবে না " । 


অনুরণন বহুদিন হোস্টেলে ছিল ,সেখানে তাকে প্রায় সকলেই খ্যাপাতো গোমড়া গোমড়া বলে। হোস্টেলে তার কোনো বন্ধু ছিল না ,তার একমাত্র এক বান্ধবী ছিল অন্তরা ,যে পাশের গার্লস হোস্টেলে থেকে ডাক্তারি পড়তো।অন্তরার স্বভাব অনেকটা তার মতো ছিল ,অন্তরা অধিকাংশ সময় একলা থাকতো আর একদম হাসতো  না ভীষণ গম্ভীর ছিল সে। অনুরণনের সাথে তার বন্ধুত্ব কলেজের ফেস্টে ,অনুরণন দেখেছিল মেয়েটা একটা দাঁড়িয়ে আছে এক কোনে ,তার সকল বন্ধু তাকে বারংবার তাদের সাথে আনন্দ করতে বলছে কিন্তু সে যাচ্ছে না। সেদিন প্রথম কথা বলে অনুরণন অন্তরার সঙ্গে তারপর স্বভাবের মিলের কারণে ক্রমশ তারা ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে। অন্তরার কাছ দিয়ে শুনে শুনে অনুভব সেই সময় অনেক কিছু জানতে পেরেছিল মানুষের শরীর সম্বন্ধে ,শরীরে রাখা হৃদয় সম্বন্ধে। এমনকি অন্তরার সাথে সে চুরি করে একবার এক মৃতদেহের শরীরের কাঁটা ছেঁড়া করেছিল ,তারপর সেলাই করেছিল সেই শরীরটা। 

                   অন্তরার সাথে বন্ধুত্বটা কখন যে সময়ের সাথে অনুরণের জন্য ভালোবাসা হয়ে গেছিল অনুরণন বুঝতে পারে নি। সেটা ছিল কলেজের শেষ বছর  অন্তরা একদিন অনুরণকে ডেকে  পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল অমলের সাথে ,যার সাথে অন্তরার বহুদিনকার সম্পর্ক এবং তাদের বাড়ি থেকে অমলের সাথে অন্তরার বিয়ে অবধি ঠিক হয়ে ছিল।  অনুরণন সেদিন খুব ভেঙে পড়েছিল ,পরের দিন তাই ছুটি নিয়ে সে ছুটে এসেছিল বাড়িতে বাবা মায়ের কাছে।  অনুরণের বাবা ,মা  জানতেন ছেলে তাদের একটু অন্যরকম ,একালসের। সেদিন সন্ধ্যেতে মা হঠাৎ অনুরণকে বলেন তুই যতদিন যাচ্ছে তত গোমড়া হচ্ছিস ,হঠাৎ অনুরণন কি যেন হয়ে যায় ,পাশের পিতলের ফ্লাওয়ার ভাসটা তুলে মায়ের মাথায় মারে ,মা অবাক হন তার থেকে চমকে ওঠেন ছেলের কান্ড দেখে। ছেলে মায়ের গলায় পা দিয়ে নিজের মোবাইলে ছবি তুলছে আর চিৎকার করছে জন্তুর মতো আমি গোমড়া ,আমি গোমড়া। মা মারা যান সেদিন ,মায়ের মৃত্যুকে ঢাকতে সেদিন অনুরণন একইভাবে  আরেকটা খুন করে তার বাবার এবং তারপর তাদের শরীর থেকে আলাদা করে বের করে অনুরণন মা ,বাবার হৃদয়। খুব সুপরিকল্পিত ভাবে অন্তরার এক বন্ধুর  সাহায্যে সে বের করে বাবা মায়ের মৃত্যুর সার্টিফিকেট  এবং একটা খুনকে প্রমান করে হার্ট এটাক হিসাবে।   যেদিন শ্মশানে সে তার বাবা মায়ের মুখে আগুন দিচ্ছিল তখন অনুরণনের মনে পড়ছিল গঙ্গার ধারে সেই গাছটার পাশের সপরিবারের  ছবিটা যেটা আজও টাঙানো তাদের দালান ঘরে। সেই ছবিটা তোলার আগে অনুরণন মা তার বাবাকে বলেছিল ছেলেকে সবসময় গোমড়া বলে ডেকো না তো এমন করে ,দেখো ও বদলে যাবে। সত্যি অনুরণন তখন ভাবছিল সে কতটা বদলেছে।   

পুলিশঅফিসার তাপস বাবু এই মাত্র একটা সূত্র খুঁজে বের করলেন খুনি আর খুনের মাঝে। প্রতিটা খুন মাসের ২৪ তারিখ হয়েছে  আর খুনের সময় ওই দিন ৩ টের আসে পাশে ,আর বডি পাওয়া গেছে পরের দিন সকালে গঙ্গার ধারে একই গাছের ধারে। এই সূত্র থেকে পরিষ্কার খুনির সাথে ২৪ তারিখ এবং গাছের সাথে। তাপসবাবু একটু ধাতস্থ হলেন যে মাসের ২৪ তারিখগুলো সতর্ক থাকতে হবে এবং কাকতালীয় ভাবে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন আজ মাসের ২৪ তারিখ। 

রাত তখন ১২ টা খানিকটা   হবে ,তাপসবাবু এবং তার টিম গঙ্গার ধারে একটা গাছের  পাশে একটা ঝোঁপে  ওৎ পেতে বসে আছেন খুনিকের ধরবেন বলে। ঝোপের মধ্যে মশা এক একটা ডাইনোসোরস সাইজের ,উফ করে একটা মারলেন ,সিগারেটটা ধরালেন ,দেখলেন দূর থেকে একটা গাড়ির হেডলাইট এগিয়ে আসছে ,গাছের ধারে এসে গাড়িটা থেমে গেলো। কিছুক্ষন পরে কেউ একজন আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে  নামলো গাড়ির থেকে,এগিয়ে গেলো গাড়ির ডিকির দিকে। তাপসবাবু এই সময় বাঁশি বাজালেন ,চারিদিকে জ্বলে উঠলো টর্চ ,এতদিনে খুনি ধরা  পড়লো খুনের প্রমান সমেত। 

                    অনুরণন তখন চিৎকার করছিল আমি গোমড়া না ,আমি গোমড়া না বিশ্বাস করুন ,বাবা প্রতিদিন রাতে মাকে নেশা করে এসে মারতো ,জানেন তো আমার খুব রাগ হতো ,আমি কাউকে কিছু বলতে পারতাম না,খুন করতে ইচ্ছে করতো বাবাকে কিন্তু পারতাম না ,চুপ করে থাকতাম ,লোকে আমাকে গোমড়া বলতো ,বাবা ,মা দুজনেই বলতো ,আমার রাগ হতো। তাপসবাবু বললেন তাই বলে নিজের বাবা ,মাকে খুন ,এমনকি প্রেমিকা কে ,কি যে বেশ নাম অন্তরা,অন্তরা কি দোষ করেছিল ? অন্তরা আমাকে ঢুকিয়েছে আমি ওকে ভালোবাসতাম কিন্তু ও অমরকে আর আমি ওকে খুন করি নি বিশ্বাস করুন আজকেও আমার আলমারিতে ওর হৃদয়টা খুব যত্নে আছে। তাপসবাবু প্রশ্ন করলেন বুঝলাম তুই রাগ থেকে সকলকে খুন করতিস কিন্তু ওদের হার্টগুলো কেটে   নিতিশ কেন ? অনুরণন বললো সবসময় রাগ থেকে খুন করেছি তা সত্যি নয় আসলে আমি আমার চারপাশের মানুষগুলো হৃদয়গুলো জমা করতাম কখনো রাগে ,কখনো ভালোবেসে ,আসলে চিৎকার করে ওদের বারংবার বলতে চাইতাম আমি গোমড়া নই ,কিন্তু যারা বুঝতো না আমাকে ভালোবেসে কিংবা এমনি আমাকে গোমড়া বলে ডাকতো আমি প্রত্যেককে খুন করতে চাইতাম। যাদের খুন কোনো পারতাম তাদের খুন করার   পর  বডিগুলো ফেলে আসতাম আমার ঈশ্বরের দরজায়,জানেন তো ওখানে ওই গাছটার তলায় ঈশ্বরের বাস।  আমি  ওদের হৃদয়গুলোর সাথে নিজের অবসরে কথা বলতাম ,বোঝাতে চেষ্টা করতাম আমি গোমড়া নই। তাপসবাবু বুঝলেন অনুরণন মানসিক রোগী ,তিনি তাই একজন মানসিক ডাক্তার ডেকে পাঠালেন। 

                              সমস্ত গল্পটা পরে সিনেমার ডিরেক্টার আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন তারপর বললেন সাবাস ,এটা দিয়ে একটা দারুন ওয়েবসিরিজ হবে। আমি উঠে দাঁড়ালাম বেরিয়ে আসার সময় একবার নিজের মনে হাসলাম কারণ আমি জানি জীবন আর ছবির মাঝখানে তফাৎ কি ? সত্যি এই ডিরেক্টরও জানতে চাইলেন না ওই মুখোশগুলোর মানে কি।